Thursday, May 23, 2024

Temple: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১২৫     চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল—১২৫                                                                        চিন্ময় দাশ

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

রাধামোহনজীউ মন্দির, আদলাবাদ (এগরা পৌরসভা)

বস্তিনারায়ণ দাস—এক উদ্যমী পুরুষকারের নাম। শ’ দেড়েক বছর আগের কথা। একটি প্রাচীন পথের উপর এগরা তখন জনবহুল গঞ্জ হিসাবে গড়ে উঠছে। এগরাচৌর পরগণার প্রত্যন্ত রূক্মিণীপুর গ্রাম থেকে ধনবান বস্তিনারায়ণ এগরায় উঠে এসেছিলেন, নিজস্ব একটি জমিদারী প্রতিষ্ঠার বাসনা নিয়ে।
ইংরেজ শাসনের শেষ পর্বের সূচনা হচ্ছে তখন। কিন্তু বড়লাট কর্ণওয়ালিশ প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা’ প্রচলিত আছে পূর্ণ মহিমায়। সেই আইনের সুবাদে, বেশ কিছু সম্পত্তির বন্দোবস্ত নিয়ে, নিজের একটি জমিদারী গড়ে তুলেছিলেন বস্তিনারায়ণ। স্বপ্নপূরণ হয়েছিল উদ্যমী মানুষটির। এগরা, জাহালদা, বামনাসাই, ষড়রঙ ইত্যাদি এলাকায় ছিল তাঁর জমিদারী মহাল।

জমিদারের নতুন বসতবাটি গড়ে উঠল কশবা এগরা মৌজায়, দশ বিঘা বাস্তুর উপর। ভোমলিয়া, দক্ষিণ পুকুর ইত্যাদি বড় বড় জলাশয়, বাগান, জমি ইত্যাদি নিয়ে, তার পরিমান দাঁড়াল প্রায় সত্তর-পঁচাত্তর বিঘা। ধীরে ধীরে জমিদারবাড়িকে কেন্দ্র করে সুন্দরপুর নামে একটি গ্রামও গড়ে উঠেছিল সেই জমির উপর। পরে সেটি সরকারিভাবে আদলাবাদ মৌজার অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছে।
বস্তিনারায়ণ যখন জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন, বিখ্যাত হটনাগর শিবের খ্যাতি এবং প্রভাবে, এগরা তখনই শৈবভূমি হিসাবে খ্যাত হয়ে উঠেছে। কিন্তু চৈতন্যদেবের প্রচারিত প্রেমধর্মের প্রভাবে, সমগ্র দক্ষিণবঙ্গ তখন প্রবলভাবে প্লাবিত। বৈষ্ণবীয় রীতিকেই আশ্রয় করেছিলেন বস্তিনারায়ণ। বসতবাড়ির লাগোয়া একটি মন্দির নির্মাণ করে, রাধামোহন নামে শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা এবং সেবাপূজার প্রচলন করেছিলেন তিনি।
তালুকদারি হয়ত খুব বড় ছিল না। কিন্তু বড় ছিল এই পরিবারের দেবভক্তি। কেবল নিজের পরিবারের জন্যই নয়, প্রজাবর্গের দেবারাধনার জন্য, মহালের বিভিন্ন জায়গায় অনেকগুলি দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বস্তিনারায়ণ। বামনাসাই গ্রামে শিবমন্দির। পুরীগামী পথের উপর জাহালদা গ্রাম। সেখানে শীতলা, কালী এবং জগন্নাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জায়গীর সম্পত্তি দিয়েছিলেন মন্দিরের কর্মীগণকে।
জাহালদায় যে হাটের পত্তন করা হয়েছিল, আজ এই একবিংশ শতাব্দীতেও, নিয়মিত সেই হাটের ‘বটি’ জমা পড়ে এই জমিদারবাড়িতে। আদলাবাদের এই মন্দির রাধামোহন-এর নামিত। এছাড়া, মদনমোহন নামিত কৃষ্ণ, রাধারানি, গোপালজীউ, লক্ষ্মী, ষোলটি শালগ্রাম শিলা এবং দুটি মহাদেব বিগ্রহও নিত্য পূজিত হন। বস্তিনারায়ণের বংশধরগণ বর্তমানে সপ্তম পুরুষে পৌঁছেছেন। ‘দাসবংশ’ সহ ‘মহান্তি’ পদবীর একটি দৌহিত্রবংশও কুলদেবতার সেবাইত। মোট দশটি পরিবার সেবাপূজার ধারাটি বহন করে চলেছেন।
বিষ্ণু মন্দির মানেই বারো মাসে তেরো পার্বণের আয়োজন। পূর্বকালে মহা আড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হত সেসব। স্বাধীনতার এক দশকের মধ্যে, জমিদারী ব্যবস্থা উচ্ছেদ হয়ে যায় বাংলা থেকে। তখন থেকে দেবতার সেবাপূজায় ভাটার সূত্রপাত। ধীরে ধীরে যা কিছু আড়ম্বর, সবই মুছে গিয়েছে। পূর্বে রাস উৎসব আর ঝুলন পূর্ণিমার আয়োজন হোত বিশেষ ঘটা করে। অন্নকূট প্রচলিত ছিল মন্দিরে। তীর্থ পরিক্রমারত সাধু-সন্ত, সাধারণ ভক্ত, দীন-দরিদ্র—দেবতার প্রসাদ পেতেন সকলেই। সেসকল দিন এখন বেদনা বিধুর স্মৃতিমাত্র।
তবে, দুর্গাপূজাটি হয় বিশেষ ঘটা করে। বর্তমানে জমিদার বংশের সম্বৎসরের বড় উৎসব এটিই।

ভারতীয় দিক-নির্দেশনা অনুসারে, পূর্ব হোল সূর্যোদয়ের দিক। মন্দির পূর্বমুখী হলে, দিনের প্রথম সূর্যালোকটি দেবতার চরণে এসে প্রণত হতে পারে। ভারতের বিখ্যাত প্রাচীন মন্দিরগুলি এই রীতিতে পূর্বমুখী করে নির্মিত।
জমিদার বস্তিনারায়ণও প্রাচীন এই ধারাটি অনুসরণ করেছিলেন। কুলদেবতা রাধামোহনের মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন পূর্বমুখী করেই। তবে মন্দিরে উঠবার সিঁড়িটি দক্ষিণে রচিত হয়েছে।
মন্দিরের পাদপীঠ বা ভিত্তিবেদী অংশটি চতুষ্কোণ ব্লক ভাগ করা। একটি প্রদক্ষিণ-পথ মন্দিরকে বেষ্টন করে আছে। ভক্তজন এই পথে দেবতাকে পরিক্রমা করতে পারেন।
তিন-তিনটি মন্দিরশৈলী অনুসরণ করা হয়েছে এই দেবালয়টির নির্মাণে। পিছনে বিমান বা মূল মন্দির এবং সামনে জগমোহন—দুটি পৃথক সৌধ এই মন্দিরের। বিমান সৌধটি উত্তর ভারতীয় নাগর-শৈলীর অনুসারী ‘শিখর-দেউল রীতি’তে নির্মিত। তার বাঢ়, বরণ্ড এবং গণ্ডী– তিনটি অংশ জুড়ে ‘নব-রথ; বিন্যাস করা। মাথায় সুদৃশ্য দুটি আমলক, কলস এবং চক্র মণ্ডিত শীর্ষক।

সামনের জগমোহনটি চতুর্দ্বারী। তার দুটি অংশ—নীচের গর্ভগৃহ অংশটি ‘দালান রীতি’তে নির্মিত হয়েছে। মাথায় ছাউনি নির্মিত হয়েছে ‘চালা-রীতি’তে। সেকারণে, কার্ণিশগুলি বক্রাকার নয়, সরলরৈখিক।
জগমোহনের ছাউনির তিনটি চালায়, কলিঙ্গ প্রভাবে ‘পীঢ়া-রীতি’তে ভূমির সমান্তরালে থাক কাটা হয়েছে। এর ফলে সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছে দেবালয়টিতে।
জগমোহনে মোট চারটি দ্বারপথ। সবগুলিই ‘খিলান-রীতি’র। পিছনের দ্বারটি গর্ভগৃহের সাথে যুক্ত। জগমোহনের মুখ্য দ্বারপথটির দু’পাশে, ভিনিশীয় রীতির দুটি ‘প্রতিকৃতি-দ্বার’ রচিত আছে। এই দুটিও সহায়ক হয়েছে সৌন্দর্য সৃষ্টিতে।
মন্দিরের সিলিং দুটির দিকে তাকানো যেতে পারে। জগমোহনের সিলিং হয়েছে ‘টানা-খিলান’ রীতিতে। মূল মন্দিরের সিলিং-এ দৃষ্টি দিলে সম্যক অনুধাবন করা যায়, সিলিং রচনায় কারিগর তাঁর কী মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। চার দিকে চারটি পাশ-খিলানের কেন্দ্রে গম্বুজ রচিত হয়েছে, বারোটি ক্ষুদ্রাকার ঠেস-খিলানের সাহায্য নিয়ে। ভারি দক্ষতার নিদর্শন এটি।
কোন টেরাকোটা ফলক নাই মন্দিরে। তবে পঙ্খের সমৃদ্ধ কাজে দেওয়ালগুলি অলংকৃত। জ্যামিতিক এবং ফুলকারী নকশার কাজ দেখা যায় সারা দেওয়াল জুড়ে।
কিন্তু সুদর্শন এই সৌধের কলেবরে কালের নখরাঘাত প্রকট হয়ে উঠছে। খসে পড়তে শুরু করেছে পঙ্খের শিল্পকর্মগুলি। অবিলম্বে সংস্কার প্রয়োজন সৌধটির।
সাক্ষাৎকার ঃ সর্বশ্রী সুভাষ চন্দ্র দাস, অশোক কুমার দাস, বিমল কুমার দাস (বর্তমানে প্রয়াত), প্রীতিরঞ্জন দাস, অরুণ মহান্তি— আদলাবাদ। অমিত রঞ্জন দাস—কলকাতা।
পথনির্দেশ ঃ মেদিনীপুর-খড়গপুর, কাঁথি, দীঘা, বালেশ্বর যে কোন দিক থেকে এগরা। পৌরসভার পূর্ব এলাকায়, ১৪ নং ওয়ার্ডে, আদলাবাদ এবং জমিদার দাসবংশের মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news