Monday, June 17, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল- ১৩৩।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল                                                                                        চিন্ময় দাশ
শান্তিনাথ শিব মন্দির, চন্দ্রকোণা-দক্ষিণ বাজার (চন্দ্রকোণা)
তাম্রলিপ্তের পর, বাহান্ন বাজার আর তিপান্ন গলি-র শহর চন্দ্রকোণা হোল মেদিনীপুর জেলার প্রাচীনতম নগরী। এককালে এর প্রতিটি বাজার আবার কয়েকটি করে পট্টি বা পটিতে বিভক্ত ছিল। রেশম শিল্প, পট্টবস্ত্র, কাঁসা-পিতল, স্বর্ণ, গন্ধদ্রব্য ইত্যাদির ধনাঢ্য ব্যবসায়ীগণের বাস ছিল এখানে।
বিশেষত রেশমশিল্পের সুবাদে বহু পরিবার সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। জেলা গেজেটিয়ারেও উল্লেখ আছে চন্দ্রকোণা, ক্ষীরপাই, খড়ার, রামজীবনপুর, রাধানগর ইত্যাদি এলাকার সমৃদ্ধ রেশমশিল্পের কথা। রেশম ব্যবসার সাথে যুক্তহয়ে, এখানে এসে কুঠি গড়েছিল, আর্মেনীয়, ফরাসি, ইংরেজ বণিকেরাও।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে


বিদেশীদের কথা থাক। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে, চন্দ্রকোণার ব্যবসায়ীদের অনেকে জমিদারীও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ব্যবসার অর্থে। অনেকগুলি মন্দির গড়ে উঠেছিল তাঁদের হাতে। বিষ্ণু বা কৃষ্ণ মন্দির ছাড়াও, শিবের মন্দিরও ছিল বহু সংখ্যায়। এই এক নগরী, যেখানে ‘শান্তিনাথ’ নামেরই ছ’-ছ’টি শিব মন্দির নির্মিত হয়েছিল। তার ভিতর দুটি মন্দির আবার নব-রত্ন রীতির।
একটি মন্দির নির্মিত হয়েছিল শহরের মিত্রসেনপুর এলাকায়। দক্ষিণ বাজারে নির্মিত দ্বিতীয় মন্দিরটি নিয়েই আমাদের আলোচনা এবারের জার্নালে।
এই মন্দিরের দেবতার প্রচলিত নাম— শান্তিনাথ শিব। তবে, লোকমুখে আরও দুটি নাম শোনা যায়—বুড়ো শিব এবং দেশ ষোল আনার শিব। এই শেষের নামটি থেকে অনুমান করা যায়, মন্দিরটি কোন নির্দিষ্ট পরিবার বা ব্যক্তিবিশেষের হাতে নির্মিত হয়নি। হয়তবা, যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল দেবালয়টি।


সেকালে চন্দ্রকোণার এক পট্টির ধনী ব্যক্তিরা অন্য পট্টির ধনীদের সাথে টেক্কা দিতে, একই নামে পৃথক আর একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করতেন। এমনই রেওয়াজ প্রচলিত ছিল চন্দ্রকোণায়। অনুমান করা হয়, হয়তো সেই ধারাতেই, কয়েকজন ধনী ব্যক্তির মিলিত উদ্যোগে, শান্তিনাথ শিবের এই মন্দিরতি নির্মিত হয়েছিল। মন্দির ছিল এলাকার সকলের। এবং তা থেকেই দেবতা এবং মন্দিরের নাম হয়েছিল—‘দেশ ষোল আনা’র শিব এবং মন্দির।
পূর্বমুখী ইটের মন্দিরটি নব-রত্ন রীতির। সামনে খিলানের তিন-দুয়ারী অলিন্দ। দ্বিতলের অলিন্দে একটি উন্মুক্ত দ্বার এবং দুটি প্রতিকৃতি দ্বার রচিত। গর্ভগৃহটি এক-দ্বারী।
উপরের পাঁচটি রত্ন চতুষ্কোণ। বাঢ় এবং গণ্ডী অংশ জুড়ে রথবিন্যাস এবং গণ্ডীতে পীঢ়ভাগ করা। কার্ণিশগুলি সরলরৈখিক। কিন্তু প্রথম তলের মাথার চারটি রত্ন বেদী, বাঢ় এবং গণ্ডী সহ আট-কোণা (অক্টাগোনাল) হিসাবে নির্মিত। রথবিন্যাস নাই। কার্ণিশগুলি বক্রাকার।


নটি রত্নেরই শীর্ষক অংশ বেশ সুরচিত। মন্দিরের ত্রিতল পর্যন্ত একটি সিঁড়ি রচিত আছে। টিনের ছাউনি দেওয়া, ষোড়শ-দ্বারী একটি নাট্মন্দিরও আছে মন্দিরের সামনে।
অলঙ্করণের কয়েকটি বিষয় জানানো যেতে পারে। ১. অলিন্দের সামনের দেওয়ালে তিন সারি কার্ণিশ এবং দু’দিকের কোণাচের গায়ে—মোট পাঁচটি সারিতে অনেকগুলি পূর্ণাঙ্গ মূর্তি রচিত হয়েছে। তবে, বারংবার রঙের প্রলেপে, সেগুলির শিল্পকাজের সুক্ষ্মতা আর অবশিষ্ট নাই। ২. গর্ভগৃহের দু’দিকে দুটি দ্বারপাল মূর্তি—রচিত হয়েছে জটাজুট ও কৌপীনধারী সন্ন্যাসীর বেশে। দুটির হাতেই দুটি সাপ ধরা আছে। প্রথম দর্শনেই শিব বলে বিভ্রম সৃষ্টি হয়। ৩. দ্বিতলের অলিন্দের দুটি প্রতিকৃতি-দ্বারের কথা আমরা বলেছি। সেখানে ভিনিশীয় রীতির আধখোলা পালার পাশে দণ্ডায়মান দুটি নারীমূর্তি। দূরগত প্রিয়জনের আগমনের প্রতীক্ষারত—দ্বারবর্তিনী। ৪. সামনের দেওয়ালে প্রথম প্রথম কার্ণিশের উপর দুটি সিংহমূর্তি। ৫. প্রথম তলের ছাউনির জোড়মুখলিতে চার কোণে চারটি মকরমুখ রচিত হয়েছে।
এক কথায় মন্দিরটি বেশ সুরচিত এবং সেবাইতগণের হাতে বেশ সযত্ন রক্ষিতও।
সাক্ষাতকারঃ শ্রী জটাধারী ভূঁইয়া, স্বর্ণেন্দু ভূঁইয়া, কমল কৃষ্ণ চক্রবর্তী, রাজেশ চক্রবর্তী—দক্ষিণ বাজার, চন্দ্রকোণা।
সমীক্ষা সহযোগী ঃ সর্বশ্রী গণেশ দাস—চন্দ্রকোণা। পার্থ দে—পাঁশকুড়া। শোভন মাইতি—কলকাতা।
পথনির্দেশঃ মেদিনীপুর কিংবা চন্দ্রকোণা রোড স্টেশন থেকে সরাসরি, অথবা পাঁশকুড়া স্টেশন থেক ঘাটাল হয়ে চন্দ্রকোণা পৌঁছানো যাবে। সেখানে গাছশীতলা মোড় থেকে সামান্য দক্ষিণে মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news