Friday, April 19, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১৮৬।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল চিন্ময় দাশ রাধাগোবিন্দ মন্দির, ডিহি বলিহারপুর
দাসপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর)রাধাকৃষ্ণের যুগল প্রেমাবতার বলা হয় চৈতন্যদেবকে। তিনি হলেন ভক্তিযোগ ভাগবত দর্শনের বিশিষ্ট প্রবক্তা ও প্রচারক। তবে, চৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনকাল মাত্রই ৪৮ বছরের।
১৫১০ সালে দণ্ডী কেশব ভারতীর কাছে দীক্ষাগ্রহণ করে, জগন্নাথধাম পুরী চলে গিয়েছিলেন তিনি। তখন থেকে বঙ্গদেশে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন শ্রীনিবাস আচার্য্য, নরোত্তম ঠাকুর এবং শ্যামানন্দ প্রভু।
মেদিনীপুর জেলায় ধর্মপ্রচারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন শ্যামানন্দ প্রভু এবং রসিকানন্দ। তাঁদের ধর্মপ্রচারের প্রভাবে, বহুসংখ্যক গোস্বামী এবং মোহান্ত মহারাজের উদ্ভব হয়েছিল এই জেলার এলাকায় এলাকায়। তাঁরা ধর্মপ্রচার এবং দীক্ষাদানের মাধ্যমে, সমাজের সিংহভাগ মানুষকে বৈষ্ণবধর্মের অনুসারী করে তুলেছিলেন।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

তেমনি একজন চৈতন্যভক্ত সাধকের নাম জানা যায়, তিনি বক্রেশ্বর গোস্বামী। কাছে-দূরে বহু শিষ্য ছিল তাঁর। সেই শিষ্যকুলের একজন হলেন পাঠকরাম গোস্বামী। আশ্রম ছিল চেতুয়া পরগণা (বর্তমান দাসপুর থানা)র ডিহি বলিহারপুর গ্রামে।
পাঠকরামের ইষ্টদেবতা ছিল রাধাগোবিন্দজীউ। দেবতার জন্য একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। অকৃতদার ছিলেন এই সাধক। মৃত্যুকালে নিজের প্রিয় শিষ্য নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেবাইত নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন। বর্তমানে নন্দলালের দৌহিত্র শুভাশিস রায় মন্দিরের অধিকারী ও সেবাইত হিসাবে বহাল আছেন।
নিত্যপূজা ছাড়াও, বারো মাসে তেরো পার্বণের আয়োজন হয় এখানে। তবে, বছরের বড় উৎসবটি হয় আষাঢ় মাসে। রথযাত্রার পর, কৃষ্ণা একাদশী তিথিতে পাঠকরাম গোস্বামী প্রয়াত হয়েছিলেন। তাঁর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে, মহা আড়ম্বরে ৩ দিনের একটি উৎসবের আয়োজন হয় এখানে।
মন্দিরে পোড়ামাটিতে লেখা সংক্ষিপ্ত একটি প্রতিষ্ঠালিপি আছে। তা থেকে জানা যায়, বাংলা ১২০৫ সন বা ইং ১৭৯৮ সালে এটি নির্মিত হয়েছিল। তার অর্থ হোল, সওয়া দু’শ বছর আয়ু পার হয়ে এসেছে মন্দিরটি। পরে, ১৯৬৪ সালে এই মন্দিরের সংস্কার কাজ করা হয়েছে।
ফুট চল্লিশেক উঁচু, ইটের তৈরি দক্ষিণমুখী মন্দিরটি পঞ্চ-রত্ন রীতির। রত্নগুলিতে বেদী, বাঢ়, বরণ্ড, গণ্ডী অংশ জুড়ে রথ বিভাজন করা আছে।

সামনে খিলানের তিনটি দ্বারযুক্ত একটি অলিন্দ। তাতে থামগুলি ইমারতি-রীতির। আর, দরুণ-রীতির খিলান। অলিন্দটির সিলিং হয়েছে টানা-খিলান রীতিতে। গর্ভগৃহটি এক দ্বারী। তার সিলিং হয়েছে দুই প্রস্থ খিলানের মাথায় গম্বুজ স্থাপন করে।
দেবতার রাসমঞ্চটি একটু বিশিষ্ট রীতির। প্রথাগত রীতিতে তৈরি না হয়ে, একেবারে নব-রত্ন মন্দিরের আদলে গড়া হয়েছে মঞ্চটিকে। প্রতিটি রত্নেই রথ-ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয়—দুটি তলেই চারদিক জুড়ে টানা অলিন্দ। তাতে পশ্চিম ছাড়া তিন দিকেই তিন-খিলানের উন্মুক্ত দ্বারপথ। রাস উৎসবটি দীর্ঘকাল আর অনুষ্ঠিত হয় না। সেকারণে, অনাদরে অবহেলায় ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে সৌধটি।একেবারে রাজকীয় গড়নের একটি নাট্মন্দির ছিল মন্দিরের সামনে। বায়ুকোণের একটি ভাঙা থাম ছাড়া, বর্তমানে আর কিছুই অবশিষ্ট নাই তার। স্তম্ভগুলির বেদীর প্রায় মুছে যাওয়া চিহ্নগুলিই কেবল তাদের অতীত গরিমার নিদর্শন হয়ে টিকে আছে মাত্র।
পাঠকরাম মন্দিরটি গড়েছিলেন টেরাকোটা ফলকে মুড়ে। সওয়া দু’শ বছর পার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু অলঙ্করণের সেই মহিমা আজও ধারণ করে আছে মন্দিরটি।ফলকগুলি রচিত হয়েছে তিনটি দ্বারপথের মাথার উপর, তিন প্রস্থে। কার্ণিশের নীচে সমান্তরাল একটি সারিতে। এবং দুই কোণাচ অংশের গায়ে দুটি করে খাড়া সারিতে।
ফলকের মোটিফ রামায়ণ, কৃষ্ণলীলা, পুরাণ ইত্যাদি থেকে নেওয়া। হরধনু ভঙ্গ, সুর্পনখার নাসিকা ছেদন, বালি বধ, গণ্ডীবদ্ধ সীতাদেবী ও ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে রাবণ, রাবণের সীতাহরণ ও জটায়ুর যুদ্ধ, রাম-রাবণের লঙ্কাযুদ্ধ, রামচন্দ্র ও সীতাদেবীর অভিষেক ইত্যাদি ফলকগুলি রমায়ণ কাহিনী থেকে নেওয়া।
কৃষ্ণলীলা থেকে নেওয়া হয়েছে রাধাকৃষ্ণ, শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম, নৌকাবিলাস, গোপনারীদের বস্ত্রহরণ, দধিভাণ্ড মাথায় নিয়ে গোপীদের নৌকায় নদী পার, শ্রীকৃষ্ণের কালীয় দমন, কদম্ব বনে শ্রীকৃষ্ণের বিহার, কৃষ্ণ-বলরামের গোষ্ঠবিহার ইত্যাদি ফলকগুলি।পুরাণকথার দশাবতার থেকে একটি বড় ফলক আছে মৎস্য, কূর্ম ও নৃসিংহ অবতার নিয়ে। বিবিধ বিষয় নিয়ে আছে শ্রীচৈতন্যদেবের ‘ষড়ভূজ গৌরাঙ্গ’ মূর্তি, গৌর-নিতাই, সাধু-সন্ত, মৃদঙ্গ বাদনরত কীর্তনীয়া ইত্যাদির মূর্তি। মন্দিরের সামনে শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি আঁকা একটি তুলসীমঞ্চ আছে এখানে।
পাঠকরাম গোস্বামীর সমাধি মন্দিরটি আছে মন্দিরের সামান্য পশ্চিমে। ভারি সযত্নে রক্ষা করা হয় মন্দিরটিকে।
সাক্ষাৎকারঃ শ্রী শুভাশিস রায়, ডিহি বলিহারপুর।
পথনির্দেশঃ খড়গপুর-হাওড়া রেলপথের পাঁশকুড়া স্টেশন কিংবা ৬ নং জাতীয় সড়ক মুম্বাই রোডের মেচগ্রাম থেকে উত্তরমুখে ঘাটালগামী পথে দাসপুর। এবার সামান্য পূর্বমুখে এগিয়ে, ডিহি বলিহারপুর গ্রাম এবং রায়বংশের মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news