Tuesday, April 16, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-১৬২ ।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্নালচিন্ময় দাশ
চন্ডী মন্দির (পিংলা, পশ্চিম মেদিনীপুর)বহু প্রাচীন কাল থেকে এক দেবী আছেন গ্রামে। দেবীর নাম– পিঙ্গলাক্ষী। তাঁর নাম থেকেই গ্রামের ” পিংলা ” নাম হয়েছে, এমন অভিমত শোনা যায়।
তবে, আজকের জার্নাল-এর উপজীব্য পিংলা গ্রামেরই আর এক চণ্ডীদেবী। তিনি স্থানীয় জমিদার বসু পরিবারের কুলদেবী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এই বসুরা জাতিতে কায়স্থ, মেদিনীপুরে এসেছিলেন বর্ধমান জেলা থেকে। বসু পরিবারের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে, কায়স্থ জাতি সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। কেননা, বিগত তিনশ’ বছর ধরে, পিংলা থানার সমাজ জীবনে অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি ইত্যাদিতে যা কিছু বিকশিত হয়েছে, সে অবদান পিংলার কয়েকটি কায়স্থ পরিবারের।
পদ্মপুরাণ, গরুড়পুরাণ, স্কন্দপুরাণ, ভবিষ্য়পুরাণ ইত্যাদি প্রাচীন গ্রন্থে কায়স্থদের কথা জানা যায়। এঁদের আদিপুরুষ হলেন চিত্রগুপ্ত। ব্রহ্মার কায়া থেকে জন্মেছিলেন, সেকারণে তাঁর জাতি হয়েছিল– কায়স্থ। চিত্রগুপ্তের ১১ জন পুত্র– মতিমন্ত, দাশরথী, অতিক্রান্ত, গুহ্যক, দুর্বাক্য, দুর্বাসা, কুথু, শশাঙ্ক, পৌলব, সহস্রাক্ষ এবং দুর্ধর্ষ। এই ১১ জন বিদ্যাশিক্ষার জন্য নৈমিষারণ্যে ১১ জন ঋষির আশ্রমে গিয়ে থেকেছিলেন। সেকারণে, এঁরা প্রত্যেকে গুরুর গোত্র এবং নিজ নিজ বৈশিষ্ট অনুযায়ী উপাধি বা পদবী পেয়েছিলেন। যেমন– দাশরথী থেকেছিলেন ঋষি গৌতমের আশ্রমে। সেকারণে, তাঁর গোত্র হয়– পৌতম। দাশরথি বহু ধন-রত্নের অধিকারী ছিলেন বলে, তাঁর পদবী হয়েছিল– বসু।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, বাংলায় কুলীন প্রথার খোল-নলচে বদল করেছিলেন বল্লালসেন। আবার, আমরা এ কথাও জানি, একবার রাজা আদিশূর তাঁর যজ্ঞ আয়োজনের সময় কনৌজ থেকে পঞ্চ-ব্রাহ্মণ এনেছিলেন। পাঁচজন কায়স্থও ছিলেন সেই ব্রাহ্মণদের সাথে। তাঁরা হলেন– দশরথ বসু, মকরন্দ ঘোষ, কালিদাস মিত্র, পুরুষোত্তম দত্ত এবং বিরাট গুঁই।কায়স্থদের ত্রয়োদশ পুরুষে, বসু বংশে ছিলেন জনৈক পুরন্দর বসু। তিনি ইং ১৪৮০ সালে, রাঢ় বাংলার সমস্ত কায়স্থকে একজাই করে, মেলবন্ধ করেছিলেন। তাতে ৮ ঘর সিদ্ধ মৌলিক এবং ৭২ ঘর সাধ্য মৌলিক হিসাবে সাব্যস্ত হয়েছিল। ‘ বসু ‘ পদবীধারীরা ছিলেন সাধ্য মৌলিক বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। এমনই এক বসু পদবীধারীরা ছিলেন আজকের আলোচ্য মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা।
মন্দির সমীক্ষার সময়, সেবাইত পরিবার থেকে জানা যায়, পিংলায় বসু বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনৈক শম্ভূরাম বসু। পূর্বোক্ত দশরথ বসু এবং পুরন্দর বসুর উত্তর পুরুষ ছিলেন তিনি। বর্ধমান জেলার নাহার-বেলনা গ্রাম থেকে মেদিনীপুর জেলায় চলে এসেছিলেন শম্ভূরাম। আসার সময়, কুলদেবী চন্ডীর বিগ্রহটি সাথে এনেছিলেন তিনি। একটি মাটির মন্দির গড়ে, প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল দেবীকে।
পরবর্তীকালে লোকদেবী শীতলার একটি বিগ্রহও মন্দিরে স্থাপন করা হয়েছে। চন্ডী দেবীর বিগ্রহটি পাথরে খোদাই করা মুন্ডমূর্তি। শীতলারও মুন্ডমূর্তি, সেটি ধাতুনির্মিত। একই বেদীতে, দুটি পৃথক কাষ্ঠাসনে দুটি ঘটের উপরে, মূর্তি দুটি স্থাপিত।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই পরিবারের বিপুল সমৃদ্ধি ঘটেছিল। বড় মাপের একটি জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিল এই পরিবার। বিশালাকার অট্টালিকা, দুর্গামন্ডপ ইত্যাদি গড়া হয়েছিল।
বসু পরিবারে এক উল্লেখযোগ্য পুরুষ ছিলেন জগন্মোহন বসু. জন্ম ইং ১৮০১ সালে। ১৮৪৬ সালে মেদিনীপুর জেলা কালেক্টর-এর দেওয়ান হয়েছিলেন তিনি। সমাজসেবায় বহু অবদান ছিল তাঁর। বিশেষ কী, “বিশ্বকোষ” (এনসাইক্লোপিডিয়া ইন্ডিকা। সম্পাদনা– নগেন্দ্রনাথ বসু। পৃষ্ঠা ৬০২-০৩) গ্রন্থে ” দেওয়ানজী ” নামে পরিচিত এই সমাজবান্ধব ব্যক্তির বিবরণ উল্লেখ আছে। জগন্মোহন-ই মাটির মন্দিরে অবস্থিত দেবীর জন্য, দুর্গামণ্ডপের সামনে, আমাদের আলোচ্য দালান-রীতির পাকা-মন্দিরটি গড়ে দিয়েছিলেন।
ইটের তৈরী আয়তাকার মন্দির। দৈর্ঘ্য ২২ ফুট, প্রস্থ ১৭ ফুট এবং উচ্চতা ১২ ফুট। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা এই মন্দিরের প্রবেশপথ কিন্তু উত্তর এবং দক্ষিণ– দু’দিকেই। এমনটা বড় একটা দেখা যায় না। আরও বৈশিষ্ট দেখা যায় এর সম্মুখভাগ নির্ণয়ের সময়। মন্দিরের মাথায় “শীর্ষক” অংশটি নির্মিত হয়েছে উত্তরের দেওয়ালের আলসের উপর। চতুস্কোন বেদী। তার উপর বেঁকি, সুদৃশ্য আমলক, কয়েকটি কলস, নিশানদণ্ড সুচারুভাবে স্থাপিত হয়েছে। সহজেই মনে হতে পারে, এটিই মন্দিরের সামনের দিক। এদিকে, মন্দিরের পাদপীঠটি ফুট দুয়েক উঁচু। মন্দিরে উঠবার সিঁড়িটি নির্মিত হয়েছে দক্ষিণের অংশে।
গর্ভগৃহের দু’দিকে, উত্তর এবং দক্ষিণে, দুটি টানা অলিন্দ। তাতে খিলান-রীতির ৩টি করে দ্বারপথ। থামগুলি চতুস্কোণ। তাতে দু’দিকে এক-জোড়া করে কলাগেছ্যা-রীতির গোলাকার থামের বিন্যাস করা।
অলঙ্করণ বলতে তেমন কিছু নাই মন্দিরে। দেওয়ালে পঙ্খের সামান্য কিছু নকশা আছে, জ্যামিতিক প্যাটার্নের। এছাড়া, উত্তরের অলিন্দে গর্ভগৃহের দ্বারপথের দু’দিকে দুটি দ্বারবর্তিনী মূর্তি। ভিনিশীয় রীতির আধ-খোলা দ্বারপথে প্রিয়জনের প্রতীক্ষারতা রমণী। মূর্তিটির পরিচ্ছদ লক্ষণীয়।
একটি প্রতিষ্ঠা-লিপি ছিল মন্দিরে। পূর্ববর্তী পুরা-গবেষকদের বিবরণ থেকে তার বয়ানটি জানা যায়– ” লক্ষ্মীজনার্দন চন্ডী / সকাব্দা ১৭৭৭ / সন ১২৬২ সাল।। / তারী (ক) ৩০ বৈসাখ / শ্রী আনন্দ মিস্ত্রী দাসপুর। ” (লিপি-র বানান হুবহু রাখা হয়েছে।) অর্থাৎ ইং ১৮৫৫ সালে দাসপুর থানার সদর দাসপুর গ্রামের জনৈক আনন্দরাম মিস্ত্রী মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। বসুবংশের খ্যাতনামা শ্রী জগন্মোহন বসু (জীবনকাল ইং ১৮০১ — ১৮৬৫), যিনি মেদিনীপুর জেলা কালেক্টর সাহেবের দেওয়ান ছিলেন, তিনিই দেবীর জন্য এই পাকা মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন।
সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী জ্যোতির্ম্ময় বসু, রাজনারায়ণ বসু, জয়দেব বসু, রাকেশ কুমার সিংহ– পিংলা।
পথনির্দেশ : মেদিনীপুর, খড়গপুর, ডেবরা বাজার কিংবা বালিচক স্টেশন থেকে ময়নাগামী পথের উপরেই পিংলা। রাস্তার কয়েক পা পশ্চিমে বসুবাড়ির এই মন্দির আর অট্টালিকার খন্ডহর। মেচেদা বা তমলুকের দিক থেকে শ্রীরামপুর, ময়না হয়ে পিংলা আসতে হয়।

- Advertisement -
Latest news
Related news