Monday, June 17, 2024

PMGSY: আরেক লড়াই ডেবরার ডাক্তারবাবুর! কাজ শেষ না করেই কাজ শেষ বলে রিপোর্ট দেওয়া রাস্তা ৭বছর পরে শেষ করার নির্দেশ কেন্দ্রীয় গ্রামীন সড়ক মন্ত্রকের

- Advertisement -spot_imgspot_img

নিজস্ব সংবাদদাতা: ৫০% কাজ করেই পুরো রাস্তার কাজ শেষ হয়ে গেছে বলে কেন্দ্রকে জানিয়ে দিয়েছিল ঠিকাদার। কিন্তু শেষ রক্ষা হলনা। এক ডাক্তারবাবুর নাছোড়বান্দা লড়াইয়ের জেরে ফের পুরো রাস্তা নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হল ওই ঠিকাদারি সংস্থাকে। আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই শেষ করতে হবে বলে ‘আল্টিমেটাম’ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রের তরফে। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা থানার এই ডাক্তারবাবুর লড়াইয়ের জেরে এর আগেও একাধিক রাস্তার থমকে যাওয়া নির্মাণ হয়েছে।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে
ডাঃ সুমিত সুর

তবে এবারের কাহিনী একেবারেই অন্যরকম। জানা গেছে মাত্র সাড়ে ৩কিলোমিটার রাস্তা। তাই পড়ে ছিল গত ৭বছর। শুধু তাই নয় সরকার জেনেছিল রাস্তা সম্পূর্ণ। তাই চ্যাপ্টার ক্লোজড করে দেওয়াও হয়েছিল। বাধ সাধলেন চিকিৎসক সুমিত সুর। তথ্য প্রমান ও রাস্তার ছবি সহ সমস্ত নথি পাঠাতেই নড়ে চড়ে বসে কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রক। অবশেষে শনিবার এল সেই চিঠি।

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা পঞ্চায়েত সমিতির অন্তর্গত ত্রিলোচনপুর থেকে চকপ্রয়াগ এই রাস্তার জন্য ২০১৩-১৪ সালে প্রায় ২কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী গ্রামীন সড়ক যোজনায় যা বাংলা সড়ক যোজনা নামেও পরিচিত। এলাকার প্রায় ১৫টি গ্রামের ৩০ হাজার মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য ডেবরা ও লাগোয়া দাসপুর থানার অধিবাসীদের কথা মাথায় রেখেই ডেবরা পঞ্চায়েত সমিতি রাস্তাটি পাকা সড়ক বানানোর প্রস্তাব পাঠায় প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনার আওতায়। প্রকল্পটি (Package no. WB 20 764) গৃহীত হয়। ৩.৩ কিলোমিটার রাস্তার জন্য বরাদ্দ হয় ১.৮৭ কোটি টাকা। দায়িত্ব দেওয়া হয় একটি ঠিকাদারি সংস্থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা ভাগ্যধর সুর জানিয়েছেন, কাজ চলাকালীন স্থানীয় এক ব্যক্তি আপত্তি জানায় তার জায়গার ওপর দিয়ে রাস্তা করার। মামলাটি হাইকোর্ট অবধি গড়ায় যদিও শেষ অবধি পঞ্চায়েত সমিতির হস্তক্ষেপে বিষয়টি মিটমাট হয়ে যায় এবং ওই ব্যক্তি আপত্তি প্রত্যাহার করে। ফলে আইনি বাধা সরে যায়। রাস্তা তখন ৫০% কাছাকাছি এগিয়েছিল। এরপর হঠাৎ করেই ঠিকাদার কাজ ছেড়ে চলে যায়।

সেই রাস্তা

বছরের পর বছর কাজটি পড়ে থাকে এবং একসময় পুরো রাস্তাটাই নষ্ট হয়ে যায়। আগের অবস্থায় ফিরে আসে। কেন কাজ হচ্ছেনা তার খোঁজ খবর নিতে গিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার জোগাড়। দেখি ওই ঠিকাদার সংস্থা সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে যে রাস্তার কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। এরপরই আমি স্মরণাপন্ন হই ডাক্তারবাবুর। কারন আমি সোশ্যাল মিডিয়া মারফৎ আগেই জেনেছিলাম যে ডাক্তার সুমিত সুরের জন্য আগেও ডেবরা এলাকার কিছু রাস্তা সম্পূর্ণ হয়েছিল।

ডেবরা থানার গোয়ালাগেড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা যিনি বর্তমানে বাঁকুড়ার পাত্রসায়র ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ডঃ সুমিত সুর জানান, ‘ এরআগে প্রধানমন্ত্রী গ্রামীন সড়ক যোজনা সহ অন্য কয়েকটি প্রকল্পের বিষয়ে মানুষকে সাহায্য করার অভিজ্ঞতা আমার ছিল ঠিকই কিন্তু এই সমস্যাটি একেবারেই আলাদা। যে কাজ হয়নি তাকেই হয়ে গেছে বলে জানিয়ে দেয় ঠিকাদার। যার ফলে চালু প্রকল্প তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায় রাস্তাটি। আমি ভাগ্যধর বাবুকে সরাসরি কেন্দ্রীয় গ্রামীন উন্নয়ন দপ্তরের গ্রীভেন্স পোর্টালে বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করতে বলি। যেহেতু উনি বিষয়টি জানেননা তাই ওনাকে পোর্টালের যাবতীয় পাঠাই। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই অভিযোগ হয়েছিল কিন্তু প্রায় ৮মাস আমরা কোনও উত্তর পাইনি। ফলে ভাগ্যধরবাবুর ধারণা হয় বিষয়টি শেষ অবধি হয়ে উঠলনা। কিন্তু ১৩ই অক্টোবর আমাদের হতবাক করে দিয়ে কেন্দ্রীয় জাতীয় গ্রামীন পরিকাঠামো উন্নয়ন সংস্থা বা NRIDA এর জয়েন্ট ডিরেক্টর নবনিত কুমার একটি চিঠি পাঠিয়ে জানান বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেছেন তাঁরা এবং আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যে কাজটি শেষ করতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে।

ভাগধর বাবু জানিয়েছেন, ‘আমি রীতিমত হতবাক হয়ে গেছি সরকারের তৎপরতায়। কেন্দ্র সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার জয়েন্ট ডিরেক্টর নবনিত কুমার আমাকে জানিয়েছেন, ‘ এরমধ্যে আমার অভিযোগ নিয়ে একটি তদন্ত করেছেন তাঁরা। সেই তদন্ত জানিয়েছে আমার অভিযোগ সঠিক। কাজ শেষ না করেই কাজ শেষ হয়ে গেছে বলে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকারের আধিকারিকদের সঙ্গেও কথাবার্তা হয়েছে। এরপরই তাঁরা আগামী মার্চ মাসের মধ্যে কাজটি শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি খুশি কেন্দ্রের এই উদ্যোগে। আমি ভাবতেই পারিনি আমার মত সাধারণ একজন নাগরিকের আবেদনে সাড়া দিয়ে সরকার এতটা এগিয়ে আসবে।’

ফের রাস্তা হবে জানতে পেরে খুশি ত্রিলোচনপুর, টাঙ্গাইশ্রী, চকপ্রয়াগ প্রভৃতি গ্রামের মানুষ। তাঁরা জানিয়েছেন ডেবরায় সুপার স্পেশালিটি বা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র তাঁদের এলাকা থেকে ২৬ কিলোমিটার, ব্লক ও পঞ্চায়েত সমিতি অফিসের দূরত্ব ৩০কিলোমিটার, রাধামোহনপুর রেলস্টেশনের দূরত্ব ২২ কিলোমিটার। এই রাস্তাটির জন্য ওই পথ যেতে তাঁদের দুর্ভোগের অন্ত নেই। ডেবরা পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ অলোক আচার্য্য বলেন, ‘ বিষয়টি নিয়ে আমরাও দুশ্চিন্তায় ছিলাম। সমস্ত জটিলতা মিটিয়ে দেওয়ার পরও ওই ঠিকাদার কাজ ছেড়ে চলে যায়। আবার রাস্তাটি হচ্ছে যেনে ভালো লাগছে। যাঁরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁদের ধন্যবাদ।’

ডঃ সুমিত সুরের এই লড়াই অবশ্য নতুন নয়। রেলের সঙ্গে দীর্ঘ ট্যুইট যুদ্ধ করে রাধামোহনপুর রেল স্টেশনের মধ্যের রাস্তাটি কংক্রিট করতে বাধ্য করেন রেলের খড়গপুর ডিভিশনকে। ডেবরায় থমকে যাওয়া হিজলদা-আষাঢ়ি রাস্তা ফের তাঁর পরামর্শ নিয়েই স্থানীয় বাসিন্দারা শুরু করতে পেরেছিলেন। তারই সাথে ওই রাস্তায় ১৬টি বিদ্যুৎ খুঁটির তার নিচু করে টানার প্রতিবাদে লড়াই করে নতুন করে সেই কাজও করতে বাধ্য হয় বিদ্যুৎ দপ্তর। তাঁর কাছ থেকেই পরামর্শ নিয়ে পিংলা থানায় ‘কেলেয়াড়া-লক্ষীবাড়ি’ নিজেদের থমকে যাওয়া রাস্তা কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে ফের চালু করতে সক্ষম হন স্থানীয় বাসিন্দারা। ডঃ সুরের সেই ধারাবাহিক লড়াইয়ের আরেক ঠিকানা হয়ে রইল ত্রিলোচনপুর থেকে চকপ্রয়াগ রাস্তা।

- Advertisement -
Latest news
Related news