Tuesday, April 16, 2024

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১৮৯।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল                                                           চিন্ময় দাশলক্ষ্মীজনার্দন মন্দির, দনিচক                       (পিংলা, পশ্চিম মেদিনীপুর)                         উনিশ শতকের একেবারে মাঝামাঝি সময় তখন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার সুবাদে, নতুন নতুন জমিদারের উদ্ভব হয়ে চলেছে বাংলা জুড়ে। যশোহর থেকে জনৈক সুর্য্যশঙ্কর দাস মাইতি বেরিয়ে পড়েছিলেন ভাগ্যসন্ধানে। সাথে নিয়েছিলেন প্রভূত সম্পদ এবং কনিষ্ঠ পুত্র নিকুঞ্জ বিহারীকে। প্রথমে গিয়েছিলেন বর্ধমান জেলায়। খেরি নদীর কোলে– নাদনঘাটে। মনঃপুত না হওয়ায়, মণ্ডলঘাট পরগ্ণায় চলে যান।
মণ্ডলঘাটের বুক চিরে বয়ে চলেছে রূপনারায়ণ নদ। তার দু’পার জুড়ে এই পরগণা। সুর্য্যশঙ্কর পৌঁছেছিলেন নদীর পূর্ব তীরে। বর্তমান হাওড়া জেলার সামতাবেড়-পানিত্রাস এলাকায়। নদীর জল (পানি) যে এখানে অধিবাসীদের ত্রাসের কারণ, গ্রামের ‘পানিত্রাস’ নামের মধ্যেই সেটি প্রকট। ঘটেও ছিল সেটাই। ফি-বছর বন্যার দাপটে, সেই বাসস্থানটিও ছেড়ে দিয়েছিলেন সুর্য্যশঙ্কর। অবশেষে, সেখান থেকে খানিক দক্ষিণে, সবং পরগণার (বর্তমান মেদিনীপুর জেলার পিংলা থানা) দনিচক গ্রামে এসে, স্থায়ী বসবাস গড়েছিলেন।
সেসময় এক জমিদার বংশের গুল মহম্মদ ও মীর মহম্মদ নামের দুই সহোদর ভাই, তাঁদের সম্পত্তি বিক্রি করে দিচ্ছিলেন। নতুন জমিদারী প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী বহুজনই হাজির হয়েছিলেন নিলামে। হাজির ছিলেন সূর্য্যশঙ্করও। প্রথমে কাঁচা টাকা, পরে সোনার বাট নামিয়ে দিয়ে, নিলাম ডেকে নিয়েছিলেন পিতা-পুত্র।
জমিদারী প্রতিষ্ঠা করে, সাত দেউড়ির অট্টালিকা, ঘোড়াশাল, ছয় বেহারার চতুর্দোলা, মুহুরি-গোমস্তা সহ কাছারিবাড়ি, এক-নলা বন্দুক সহ “নগদী” পাহারাদার, পঁচিশ হাত বিস্তারের পাকা ঘাট—কত কিছুই না গড়া হয়েছিল জমিদারবাড়িতে।
সদাব্রত প্রচলিত ছিল জমিদার দাস মাইতি বংশে। তখনকার দিনে, উত্তর ও মধ্য ভারতের তীর্থ পরিক্রমারত সাধুরা আসতেন হাতি বা উটের কাফেলা সাজিয়ে। যাত্রাবিরতি ঘটিয়ে জমিদারবাড়িতে আতিথ্য নিতেন সাধু-সন্ন্যাসীর দল। বিদায় বেলায় দক্ষিণাও পেতেন তাঁরা।
একবার এক সাধু বিদায়কালে তাঁর ঝোলা থেকে একটি শাল্গ্রাম দিয়ে গিয়েছিলেন। সেটি যথাবিধি প্রতিষ্ঠা করে, দেবতার মন্দির গড়বার জন্য, সুলক্ষণ যুক্ত ভূমি নির্বাচনও করে দিয়ে গিয়েছিলেন সাধু মহারাজ।
শালগ্রাম হোল, ভগবান বিষ্ণুর শিলীভূত রূপ। একবার শঙ্খচূড় (শ্রীরাধিকার অভিশাপে, দৈত্যকুলে জন্মগ্রহণ করা, কৃষ্ণসখা সুদামা)-এর পত্নী তুলসি দেবী অভিশাপ দিলে, বিষ্ণুকে শিলারূপ ধারণ করতে হয়েছিল। শালগ্রাম শিলাতেই বিষ্ণুর আরাধনার প্রচলন হয়েছিল তখন থেকেই। সেসব অন্য কথা। অনেক কথা। এখন থাক। সাধুর দেওয়া শালগ্রামটির নাম ছিল—লক্ষ্মীজনার্দন।
লক্ষ্মীজনার্দনকে কুলদেবতা হিসাবে বরণ করেছিল জমিদার বংশ। মন্দির ছাড়াও, একটি ঝুলন মন্দির এবং বড় আকারের একটি রাসমঞ্চও গড়া হয়েছিল দেবতার জন্য। নিত্যপূজা ছাড়াও, বারো মাসে তেরো পার্বণের প্রচলন হয়েছিল মহা আড়ম্বরের সাথে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, এক দশকের মধ্যেই জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তখন থেকে দেবতার সেবাপূজা আর মন্দিরটিকে টিকিয়ে রাখায় সঙ্কটের সূত্রপাত হয়েছিল। এক সময়ে মন্দিরটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, সেখানে বিগ্রহ রেখে সেবাপূজা সম্ভব হয়নি। বিগ্রহকে ঝুলন মন্দিরে সরিয়ে আনতে হয়েছে। তখন থেকে মূল মন্দিরটি পরিত্যক্ত। সর্বনাশের পথিক।
ইটের তৈরি মন্দিরটি পূর্বমুখী। মন্দির পূর্বমুখী হলে, দিনের উদিত সূর্য্য তার প্রথম আলোকরশ্মিটি দেবতার চরণে নিবেদন করে, দিনের যাত্রা শুরু করতে পারে। ভারতবর্ষের বিখ্যাত প্রাচীন হিন্দু মন্দিরগুলি পূর্বমুখী করেই নির্মিত হয়েছিল। মন্দির গড়বার সময়, সুর্য্যশঙ্করও সেই ধারা অনুসরণ করেছিলেন।
পিছনে শিখর দেউল রীতির বিমান এবং সামনে চার চালা রীতির জগমোহন। দুটি সৌধ নিয়ে মন্দিরটি নির্মিত। বিমান সৌধে সপ্তরথ বিন্যাস করা। এক-দ্বারী গর্ভগৃহের সিলিং হয়েছে দুই প্রস্থ খিলানের উপর গম্বুজ রচনা করে।
জগমোহনে সামনে তিনটি দ্বার ছাড়াও, উত্তর ও দক্ষিণে দুটি দ্বার আছে। সবগুলি দ্বারপথ খিলান রীতির। অলিন্দের সিলিং হয়েছে চার দেওয়ালের মাথায় অর্ধ-খিলান গড়ে, তার উপর একটি টানা-খিলান স্থাপন করে।মন্দিরের কারিকর ছিলেন জনৈক গোপী রায়। পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ– মন্দিরের তিন দিকের দেওয়ালে অনেকগুলি টেরাকোটা ফলক রচনা করেছিলেন তিনি। মন্দিরটি দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত। জীর্ণতার গ্রাসে, বর্তমানে টেরাকোটা ফলকগুলি ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত। বহু ফলকই অবিকৃত নাই। সবগুলির পরিচয় উদ্ধার করাও দুরুহ।
যেগুলির পরিচয় বোঝা গিয়েছে, তার ভিতর উল্লেখযোগ্য হোল—রাম-রাবণের যুদ্ধ, দশাবতার, একক জগন্নাথদেব, গণেশ জননী, ষড়ভূজ গৌরাঙ্গ, নন্দীবাহন মহাদেব, গরুড়বাহন বিষ্ণু, পরশুরাম, ডাকিনী মূর্তি, হাতির পিঠে সন্ন্যাসী, কৃষ্ণের ননী চুরি, গোপিনীদের বস্ত্রহরণ, দম্পতি মূর্তি, কয়েকটি দ্বারপাল ইত্যাদি। দুটি মিথুন মূর্তিও আছে দক্ষিণের দেওয়ালে।
ঝুলন মন্দিরটি মূল মন্দিরের লাগোয়া। দালান-রীতির পূর্বমুখী সৌধ। দুটি দ্বারপাল ছাড়াও, সামনের দেওয়ালটি বেশ অলংকৃত।
মন্দির থেকে সামান্য দূরে, বড় আকারের একটি রাসমঞ্চ ছিল লক্ষ্মীজনার্দনের। উৎকৃষ্ট টেরাকোটা ফলকে মোড়া ছিল সেটিও। তবে, পরিত্যক্ত হয়ে, বর্তমানে ভারি জীর্ণ দশা মঞ্চটির।
মাইতিবংশের প্রতিষ্ঠাতা সূর্য্য শঙ্কর দাস মাইতির বড় মাপের একটি সমাধি মন্দির গড়া হয়েছিল। বর্তমানে সেটিরও ভারি জীর্ণ দশা। সামান্য একটু অংশমাত্রই টিকে আছে সৌধটির।
সাক্ষাৎকার ঃ সর্বশ্রী দীপেন্দু কুমার মাইতি, স্নেহাঙ্কন মাইতি, প্রিয়াঙ্কন মাইতি– টাবাগেড়িয়া (মাড়োতলা, ডেবরা)। শ্রী প্রকাশ রঞ্জন মাইতি—দনিচক।
*** রাসমঞ্চ এবং স্মৃতিমন্দিরের ভগ্নাংশের ছবি তুলে দিয়েছেন—শ্রীমতি শিউলি গিরি মাইতি, শ্রী প্রিয়ম মাইতি—দনিচক।
পথনির্দেশ ঃ ৬ নং জাতীয় সড়ক মুম্বাই রোডের রাতুলিয়া বাজার থেকে দক্ষিণে ৬ কিমি, কিংবা দ. পূ. রেলপথের হাউর এবং রাধামোহনপুর স্টেশন থেকে দক্ষিণে ৪ কিমি দূরে দনিচক গ্রাম। হাই স্কুল ছাড়িয়ে মাইতি বংশের মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news