Monday, June 17, 2024

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-১১৪।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল
চিন্ময় দাশ                             রাধাবল্লভ মন্দির মির্জাবাজার(মেদিনীপুরশহর)

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

বৈষ্ণব যুগের মধ্যভাগে তিনজন প্রভুর আবির্ভাব হয়েছিল– শ্যামানন্দ, শ্রীনিবাস এবং নরোত্তম। বৈষ্ণব সমাজে শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ এবং অদ্বৈতাচার্য যে সম্মান লাভ করেছিলেন, পরবর্তীকালে এই তিনজন প্রভুও সেই সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন।

বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকা, সংলগ্ন বিহার (অধুনা ঝাড়খন্ড) এবং ওডিশার ব্যাপক এলাকা জুড়ে ধর্মপ্রচারের কাজ করেছিলেন শ্যামানন্দ। নরহরি চক্রবর্তীর ‘ভক্তি-রত্নাকর’ গ্রন্থে শ্যামানন্দের ধর্মপ্রচারের বিবরণ পাওয়া যায়। শ্যামানন্দ এবং তাঁর শিষ্য রসিকানন্দ সেসময় কেশিয়াড়ি এবং মেদিনীপুর– দুই নগরীর মুঘল রাজকর্মচারীদের উপরও বিপুল প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন তিনি। দুটি এলাকায় বৈষ্ণবদের জন্য আশ্রয় স্থাপনও করতে পেরেছিলেন তাঁরা।

মেদিনীপুর শহরে বৈষ্ণবধৰ্ম এবং বৈষ্ণবীয় রীতিতে দেবারাধনার যে বিস্তার আজও চোখে পড়ে, তা শ্যামানন্দ প্রভুরই অবদান। তাঁর প্রভাবে নতুন করে বহু দেবালয় গড়ে উঠেছিল এখানে। এমন কোনও জমিদারবাড়ি, এমনকি কোনও ধনী পরিবারও ছিল না, যাঁরা নতুন করে বিষ্ণু বা কৃষ্ণ মন্দির গড়েননি। তেমনই একটি মন্দির নিয়ে আজকের এই বিবরণ।

মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা-লিপি থেকে জানা যায়, বঙ্গাব্দ ১২৬৪ সনে  এটি নির্মিত হয়েছিল। শহরের মির্জাবাজার কুমোরপাড়ায় জনৈক মৃৎশিল্পী কুঞ্জবিহারী পাল এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিঃসন্তান কুঞ্জবিহারী শেষ বয়সে পুরোহিত সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তীকে মন্দিরটি সমর্পন করে গিয়েছিলেন।

নিঃসন্তান ছিলেন সতীশ চন্দ্রও। এক প্রতিবেশীর কন্যা ময়না এবং তাঁর স্বামী অতুল চন্দ্র ভট্টাচার্য্যকে দেবতা ও মন্দির দান করে গিয়েছিলেন তিনি। অতুল চন্দ্রের পুত্রগণই বর্তমানে মন্দিরের স্বত্ত্বাধিকারী। তাঁরাই দেবতার সেবাপূজা করে থাকেন।
শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানীর ধাতুমূর্তি ছাড়াও, অষ্ট-সখী, সাতটি শালগ্রাম, ছ’টি গোপালমূর্তি এবং গৌরাঙ্গ-নিত্যানন্দের দারু-মূর্তি বিরাজিত আছে মন্দিরে। এছাড়া, শ্রীচৈতন্যের একটি ‘ষড়-ভূজ মূর্তিও মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত আছে।

অন্নভোগ সহ নিত্যপূজা হয় মন্দিরে। বারো মাসে তেরো পার্বণের আয়োজন। তার ভিতর রাস যাত্রা আর দোল উৎসবের বিশেষ খ্যাতি। পূর্বকালে একটি ঘূর্ণায়মান রাসমঞ্চ ছিল এখানে। দোল পূর্ণিমায় চাঁচুরি, অধিবাস, যোগমায়া দেবীর পূজা, দধি, অন্নকূট– নানান অনুষ্ঠান দেখা যায় মন্দিরে।
ইটের তৈরী অতি সুদর্শন নব-রত্ন রীতির এই মন্দিরটি পূর্বমুখী হিসাবে নির্মিত হয়েছে। বেশ উঁচু পাদপীঠ। একটি প্রশস্ত প্রদক্ষিণ পথও আছে মন্দিরকে ঘিরে। প্রথমে খিলান-রীতির তিনটি দ্বারপথ। তার পিছনের অলিন্দটির মাথায় টানা খিলানের সিলিং। গর্ভগৃহের একটিই দ্বার। সিলিং হয়েছে খিলানের মাথায় গম্বুজ স্থাপন করে। দ্বিতলেও একদ্বারী একটি গর্ভগৃহ আছে।রত্নগুলি শিখর রীতির। কেন্দ্রীয় রত্নে পঞ্চ-রথ এবং কোণের রত্নগুলিতে বাঢ় এবং গন্ডী অংশে ত্রি-রথ বিভাজন দেখা যায়। কেবল কেন্দ্রীয় রত্নটির গন্ডীতে পীঢ়ভাগ করা হয়েছে, বাকিগুলিতে নয়।
অলংকরণের কিছু কাজ দেখা যায় মন্দিরে। তিন দ্বারপথের মাথার উপর পঙ্খের জ্যামিতিক কারুকাজ করা হয়েছে। গর্ভগৃহের দ্বারপথের দু’পাশে দুটি বিশেষ মূর্তি আছে। সচরাচর যেখানে দ্বারপাল-এর মূর্তি দেখা যায়, সেখানে দুটি সন্তান-কোলে জননী মূর্তি স্থাপিত আছে। অলিন্দের সামনের দেওয়ালে, কার্ণিশের নীচে এক সারি এবং দুই কোনাচ অংশে চার সারি যে টেরাকোটা ফলক দেখা যায়, সেগুলি কোনও সংস্কারকাজের সময় লাগানো হয়েছে বলে, মনে হয়। সেবাইত পরিবারের সযত্ন দৃষ্টির ছাপ দেখা যায় মন্দিরের সর্বাঙ্গে।

সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী গোপাল ভট্টাচার্য্য, বনমালী ভট্টাচার্য্য– মির্জাবাজার-বকুলকুঞ্জ।
সহযোগিতা— অরুণ কবি, অমিয় দাস– মির্জাবাজার-বকুলকুঞ্জ।
পথনির্দেশ : যে কোনও দিক থেকে বাস কিংবা ট্রেনযোগে মেদিনীপুর পৌঁছে, সহজেই মির্জাবাজার-বকুলকুঞ্জ পৌঁছানো যাবে। সেখানে পথের পাশেই মন্দিরটি স্থাপিত।

- Advertisement -
Latest news
Related news