Saturday, April 20, 2024

Midnapore Legendry : চলে গেলেন পিংলা পটের নবজাগরণের নায়ক দুখুশ্যাম চিত্রকর! ‘নয়া’র ঘরে ঘরে শোকের চিরাগ

- Advertisement -spot_imgspot_img

নরেশ জানা ও শশাঙ্ক প্রধান: চলে গেলেন বাংলা পটের নয়াযুগের কারিগর দুখুশ্যাম চিত্রকর। বুধবার রাতে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পিংলা থানার নয়া গ্রামে নিজের বাড়িতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে এই প্রবাদ প্রতিম পটশিল্পীর।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে
ছবি: ভাস্করব্রত পতি

বাংলার পট আঁকিয়েদের পটুয়া থেকে পটশিল্পীর মর্যাদায় তুলে এনেছিলেন এই মানুষটি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। কালীঘাটের পটকে যদি আধুনিক সংস্কৃত বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কৃতিত্ব থাকে যামিনী রায়ের তবে হলদি আর হুগলি ঘেঁষা নন্দীগ্রাম আর সুতাহাটার পটুয়াদের বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার কৃতিত্ব দুখুশ্যাম চিত্রকরের।

ষাটের দশকে বুভুক্ষা আর বন্যা কবলিত নিম্নবর্গীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ হাতে আঁকা কিছু ছবি আর ভিক্ষের থলি নিয়ে উঠে এসেছিলেন উপর মেদিনীপুরে। অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুরী বর্ধিষ্ণু গ্রাম আর শহর গুলিতে গান বেঁধে ভিক্ষে চাওয়াই জীবিকা। গানের বিষয় হিন্দু পুরান, রামায়ন মহাভারত, মঙ্গলকাব্য। গ্রামীন হিন্দু রমনীদের চোখ বেয়ে জল পড়ত সেই গীতিকল্পে। চালের সাথে আলুটা, মুলোটা। পিংলা থানার মালিগ্রামের অদূরে বসতি গড়লেন তাঁরা, প্রায় সব্বাই নন্দীগ্রামের। নতুন বসতি তাই ‘নয়া।’

ওদিকে পঞ্চাশ ষাটের দশকের রাজনৈতিক গান বেঁধে বেশ চেনাজানা হয়ে উঠেছেন সুতাহাটার ঢেকুয়া গ্রামের এক বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো ছেলে। রামায়ন মহাভারতের বাইরে গিয়ে পটের গানে তীক্ষ্ণ শ্লেষে বিঁধেছেন সরকারকে। অতুল্য ঘোষ, প্রফুল্ল সেন কে তীব্র ব্যঙ্গ করে বেঁধেছিলেন ‘কংগ্রেস বিপ্লবী’ পট। সভা সমিতিতে ডাক পড়তে শুরু করল তাঁর। কখনও হলে, কখনও আবার ফাঁকা মঞ্চে সেই সেই সব গান গেয়েও বেড়াতেন। তারপর থেকে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দুখুশ্যামের। কিন্তু খ্যাতির অপর দিকেই যে কুখ্যাতি। সরকার বাহাদুরের নজর পড়ল দুখুর দিকে। দুখু পালিয়ে এলেন নয়াতে। ঘর সংসার পড়ে রইল ঢেকুয়ায়। কিন্তু একটা বিপ্লবের সূচনাও হল।

নিজের ভাবনাকে সঞ্চারিত করলেন নয়া শিল্পীদের মধ্যে। পুরান আর মঙ্গলকাব্য, রামায়ন আর মহাভারতের পাশাপাশি মানুষ আর তার সমাজভাবনাও ভাবতে বললেন তাঁদের। নবীন পটুয়াদের তৈরি করতে শুরু করলেন গান শিখিয়ে ও পট আঁকা শিখিয়ে। কাগজের ওপর খসড়া বা দেহ রেখা কী ভাবে টানতে হয়, নাটকের দৃশ্যের মত কী ভাবে কাহিনীকে বদলে বদলে ও পাল্টে দিয়ে সাজাতে হয় এ সব শেখাতে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন এই প্রবীণ পটুয়া। ফ্ল্যাট চিত্রের বদলে পটে ফুটিয়ে তুললেন পুরুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গে বীরোচিত ভাব আর নারী দেহের লালিত্য। মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কালীঘাট পটের গোলগাল চিত্রেরও দেখা মিলল তাঁর চরিত্রে।

পূরাণ কিংবা মঙ্গলকাব্য, রামায়ন মহাভারত কিংবা সামাজিক কাহিনীর পাশাপাশি দুখুশ্যাম পরবর্তী কালে তুলে এনেছেন ঐতিহাসিক চরিত্রকেও ।নেতাজী সুভাষ ও রবীন্দ্রনাথের জীবন আলেখ্য নিয়ে দুটি পট এঁকেছেন। তাঁর সঙ্গে বেঁধেছেন দুটি গান। জনপ্রিয় পালা গানের সুরকে চয়ন করেছেন পট দুটির জন্য। নেতাজি ও রবীন্দ্রনাথের বাল্যজীবনকে চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন দুখুশ্যাম। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আর নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের যুদ্ধ প্রাধান্য পেয়েছে দুখুশ্যামের এই পট দুটিতে। ধীরে ধীরে বয়স হয়েছে, প্রচন্ড পরিশ্রম আর ক্ষুদা যেমন অল্প বয়সেই বার্ধক্যকে আহ্বান করে ফলে ক্ষয় শুরু হয়েছিল তাঁর। ততদিনে তাঁর হাত ধরে ইউরোপ আমেরিকা মায় আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছে নয়া গ্রামের পট। এখন নয়া খুবই বিখ্যাত একটি গ্রাম। এখানকার শিল্পীরাও আজ বিশ্ববন্দিত। তার পেছনে একটাই নাম, দুখুশ্যাম। ছবি ঋণ: ভাস্করব্রত পতি

- Advertisement -
Latest news
Related news