Sunday, April 14, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১৮৭ ।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

চিন্ময় দাশ  দুর্গা মন্দির, খণ্ডরুইগড়                              (দাঁতন-পশ্চিম মেদিনীপুর)
ইতিহাস আর কিংবদন্তির উপাদানে গড়া এই রাজবংশ আর মন্দিরের কাহিনী। প্রথমে ইতিহাসের কথা।
দ্বাদশ শতকের গোড়া থেকে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি। পুরো সাড়ে চারশ’ বছর, ওড়িশার রাজাদের শাসন কায়েম ছিল মেদিনীপুর জেলায়।
সেই শাসনকালের, সম্ভবত উৎকলরাজ হরিচন্দন মুকুন্দদেব-এর সময়কাল তখন। রাজার একজন সেনাপতি ছিলেন কৃষ্ণদাস মহাপাত্র। পুরী জেলার খুরদা মহকুমার রথিপুর গ্রামের অধিবাসী ছিলেন তিনি। ওড়িশা রাজ্যের উত্তর সীমান্তে, তুর্কাচৌর পরগণা। ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে একটি ‘মহাল’ হিসাবে তুর্কা-র উল্লেখ আছে। তেলেঙ্গীজাতীয় একজন করদ রাজা তুর্কায় প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। যাইহোক, তেলেঙ্গি রাজা একবার খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দিলে, পুরীরাজ তাঁর সেনাপতি কৃষ্ণদাসকে বিদ্রোহী দমনে পাঠিয়েছিলেন।
কৃষ্ণদাস ওড়িশা ফিরেছিলেন বিদ্রোহী দমন করে। রূপোর থালায় বিদ্রোহী রাজার কাটা মুণ্ড সাজিয়ে, নামিয়ে দিয়েছিলেন মুকুন্দদেবের পায়ের কাছে। রাজাও উপযুক্ত সম্মান দিয়েছিলেন বীর সেনাপতিকে। জাতিতে মাহিষ্য কৃষ্ণদাস ছিলেন ‘গজেন্দ্র’ বংশীয়। মুকুন্দদেব তাঁকে ‘সিংহ গজেন্দ্র’ খেতাব এবং তুর্কাচৌর পরগণার জমিদারী দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।ইতিহাসের পর, কিংবদন্তির কাহিনী।
কিংবদন্তি—১ রাম-রাবণের যুদ্ধের মতই এক কাহিনী। কৃষ্ণদাস তিন দিন যুদ্ধ করেও, তেলেঙ্গীরাজাকে পরাস্ত করতে পারছিলেন না। সে সময় এক স্বপ্নাদেশে, রাজার কুলদেবী ভাগ্যেশ্বরীর কথা জানতে পারেন। সেই রাতেই মন্দির থেকে দেবীর হাতের কৃপান নিয়ে চলে এসেছিলেন কৃষ্ণদাস। পরদিন তেলেঙ্গীরাজার মুণ্ডচ্ছেদ করেছিলেন সেই কৃপানে।
কিং বদন্তি—২ তেলেঙ্গী রাজার, তুর্কাচৌর মহালের, রাজধানি ছিল খণ্ডরুইগড়। রাজপ্রাসাদ আর কাছারিঘরের পাশেই, চার দিকের পাড়ে চারটি ঘাট যুক্ত, একটি পুকুর। তার ঈশান কোণে একটি অন্ধকূপ আছে। প্রাণদণ্ডিত আসামিদের নিক্ষেপ করে দেওয়া হোত তাতে। এছাড়াও, উপভোগের পর, সেই কূপে ফেলে দেওয়া হোত, তুলে আনা সুন্দরী রমণীদেরও।
শোনা যায়, তেলেঙ্গী রাজা নিহত হলে, তাঁর পত্নীও, সেই কূপে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন দিয়েছিলেন।
রানির আত্মদানের সময়কার একটি ঘটনার কথা শোনা যায়। ভরা দরবারে অভিষেকের আয়োজন হয়েছে কৃষ্ণদাস-এর। তুরি-ভেরি, কাড়া-নাকাড়া-শিঙা বেজে চলেছে নহবতখানায়। পতিহারা রানি নিজে উপস্থিত হয়েছিলেন ভরা দরবারে। ন্তুন রাজাকে আবেদন জানিয়েছিলেন রানি—“ তোমরা অব্রাহ্মণ। কিন্তু আমাদের ভাগ্যেশ্বরী হলেন ‘ব্রাহ্মণের দেবী’। মৃত্যুবরণের আগে, একটি অন্তিম অনুরোধ জানিয়ে যাচ্ছি নতুন রাজার কাছে। কোনদিন যেন আমিষ নৈবেদ্য উৎসর্গ না করা হয় দেবীকে। কথা রক্ষা করেছিলেন কৃষ্ণদাস। বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন—“চিরকাল দেবীর আরাধনা হবে সম্পূর্ণ ব্রাহ্মণ্য রীতি মেনে। নিত্য অন্নভোগ নিবেদন করা হবে দেবীকে। সেই ভোগ হবে সম্পূর্ণ নিরামিষ।“
রাজার বিধানে, প্রতিদিন এক মণ আতপ চালের বরাদ্দ ছিল অন্নভোগের জন্য। সাথে ন্যূনতম পঞ্চব্যঞ্জনের উপচার। বিশাল এক ধামসা স্থাপন করা হয়েছিল দেউড়ির মাথার নহবতখানায়। ধামসার শব্দে, দুর-দূরান্তের অভাবী প্রজারা এসে সমবেত হোত মন্দিরে। সাধু-সন্তদের সাথে, দেবীর প্রসাদ পেত প্রজারাও।
হায়, সেসকল দিন কবেই গত হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রথম দশকেই জমিদারী উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে এই রাজ্য থেকে। দেবতার নৈবেদ্যের আড়ম্বর তো দূরের কথা, মন্দির দুটিকেও রক্ষা করা যায়নি। ছোট্ট একটি কুঠুরিতে তুলে এনে, পূজা করা হয় ভাগ্যেশ্বরী দেবীর।
গৃহদেবতা রাধাবল্লভ আর দেবী দুর্গা– পাশাপাশি দুজনের দুটি মন্দির গড়েছিল এই রাজবংশ। দুটি মন্দিরই বহুকাল বিগ্রহশূন্য, পরিত্যক্ত। গৃহদেবতার আট-চালা মন্দিরটি পূর্বমুখী। (৩২ নং জার্ণালে সেই মন্দিরের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে।) সেই মন্দিরের পিছনে দুর্গা মন্দিরের অবস্থান।
ইটের তৈরি উত্তরমুখী মন্দিরটি দালান-রীতির। বহুকাল যাবৎ ব্যবহার না করায়, পরিত্যক্ত অবহেলিত হয়ে ভারী জীর্ণ দশা। প্রতিদিন একটু একটু করে ধ্বংসের পথ হাঁটছে মন্দিরটি।
বেশ উঁচু পাদপীঠ ছিল মন্দিরের। সামনে খিলানের তিন-দ্বারী অলিন্দ। পিছনে প্রশস্ত গর্ভগৃহ, তাতেও তিনটি দ্বার। দুটিরই সিলিং হয়েছে কড়ি-বরগার সাহায্যে। সবগুলি স্তম্ভ চতুষ্কোণ। সেগুলির প্রতিটি কোণায় একটি করে চুমকি-রীতির থামের আদল গড়া হয়েছে।
চুড়া নির্মিত হয়েছিল সামনের দেওয়ালের আলসের উপর, ভাঙা মন্দির থেকে তার ইঙ্গিতটি পাওয়া যায়। দেওয়ালগুলির পলেস্তারা অবশিষ্ট নাই বলেই চলে। তবে, সামনের দেওয়ালে, দুই কোণের অর্ধ-স্তম্ভ দুটিতে, বড় মাপের দুটি দ্বারপাল মূর্তি স্থাপিত ছিল। বর্তমানে তার কঙ্কাল্টুকু টিকে আছে মাত্র।
মন্দিরের সামনে যে একটি নাট্মন্দির ছিল, স্তম্ভগুলির ভগ্নবেদী দেখে, অনুমান করা যায়।
পশ্চিমের দেওয়ালে, কার্ণিশের নীচ বরাবর, দুটি বর্গাকার খোপ দেখা যায়। সেখানে নিশ্চয় মূর্তিবিন্যাস করা হয়েছিল। কবেই খসে পড়ে গিয়েছে সেগুলি!
সাক্ষাৎকারঃ সর্বশ্রী শুভজিৎ সিংহ গজেন্দ্র মহাপাত্র, সুজিত সিংহ গজেন্দ্র মহাপাত্র এবং গৌতম সিংহ গজেন্দ্র মহাপাত্র– খণ্ডরুই গড়।
ক্ষেত্রসমীক্ষাঃ ২০১০ সাল এবং ২০১৮ সাল।
পথনির্দেশঃ মেদিনীপুর কিংবা খড়গপুর থেকে কাঁথি গামী পথে খাকুড়দা। সেখান থেকে দক্ষিণে কিমি সাতেক উজিয়ে, খণ্ডরুইগড়। এই পথে সব রকম ছোট গাড়ি চলাচল করে।

- Advertisement -
Latest news
Related news