Friday, April 19, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা- ৫০।। কাদম্বিনী গাঙ্গুলী।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

আলোকনন্দিনী
কাদম্বিনী                                         বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

পেশা, ব্রত সেবা ও সাধনাকে সমার্থক ভাবতেন তিনি। বয়স পঁয়ত্রিশ। সকালে স্বামী প্রয়াত হলেন। আত্মীয় – পরিজনের ভিড়ে ঠাসা শোকের আবহ বাড়িতে ।বিকেলে ‘কল’ এল কলকাতার এক বনেদি জমিদার বাড়ি থেকে। বধূটির প্রসব বেদনা উপশমে হাতে তুলে নিলেন ডাক্তারি ব্যাগ। গলায় স্টেথো। বাড়ি সুদ্ধ সবার আপত্তিতে এমন জবাব দিলেন ,সবাই বাকরুদ্ধ। ” যে গেছে সে তো আর ফিরবেনা, যে নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আসছে, তাকে তো আনতে হবে।” মহীয়সী এই ডাক্তারের নাম – কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় (১৮ জুলাই ১৮৬১ — ৩ অক্টোবর ১৯২৩) ।

লড়াকু এই তেজস্বিনীর জীবন নানা নাটকীয় ঘটনায় আবর্তিত। গোঁড়া হিন্দু সমাজের পদে পদে বিপদে ফেলার অভিসন্ধি তাঁকে বারংবার অতিষ্ঠ করেছে।শৈশবে – কৈশোরে মায়ের সমর্থন পাননি কখনো। শিক্ষার পথে প্রতিবন্ধক হতে চেয়েছেন- সমাজনেতা -কেশবচন্দ্র সেন। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির পথে, পড়াশুনার সময়ে, পেশাগত জীবনে অনেক পাহাড় ডিঙিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অলঙ্ঘনীয়া আলোকনন্দিনী। আশার কথা পাশেও পেয়েছিলেন বেশ কয়েকজন কৃতী মানুষকে। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় তাঁর বাবার কথা। ব্রাম্ভধর্মগামী ব্রজকিশোর বসু। প্রথমে ভাগলপুরে, পরে বহরমপুরে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি আদরের বড় মেয়েকে স্নেহে ও সাহচর্যে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়ে ছিলেন।

বাবা, স্ত্রীশিক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন বলেই, কুলীন প্রথা অনুযায়ী নয় বছরে বিয়ে না দিয়ে মেয়েকে উচ্চ শিক্ষার জন্য হিন্দু মহিলা বিদ্যালয় বা বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে ভর্তি করান । কলকাতায় এসে নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বেথুন স্কুলের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় কড়া নাড়লেন কাদম্বিনী। অধিপতি সমাজ তখন এই ঘটনায় প্রমাদ গুণল। অবশ্য একাংশের উচ্চবিত্ত শিক্ষিত নাগরিক নারীশিক্ষা প্রসারে জনমত গঠন করছেন, সেই সময়ে। কাদম্বিনী এবং উপেন্দ্রনাথ দত্তের কন্যা সরলা দাসী স্পেশাল টেস্ট দিলেন। তিনি কৃতকার্য হলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পেল প্রথম ভারতীয় মহিলা ম্যাট্রিকুলেট।

পাশে তখন মেন্টর কাম শিক্ষক ‘অবলাবান্ধব’ দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। এদিকে দেরাদুন থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা এসেছেন চন্দ্রমুখী বসু। এফ. এ. পাশ করবার পর দুজনে একই বছরে বি. এ. পাশ করেন। তাঁরা হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট। চন্দ্রমুখী এম. এ. ক্লাসে ভর্তি হলেন, কাদম্বিনীর ধনুর্ভাঙা পণ তিনি ডাক্তারি পড়বেন। মাদ্রাজে মহিলাদের জন্য চিকিৎসা শাস্ত্র পাঠের দরজা ইতিমধ্যে খুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কলকাতা অনড়। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে তাঁর ভর্তি হওয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজে আলোড়ন পড়ল। এমনকি যে পত্রিকা না পড়লে পিছিয়ে পড়তে হয় বলে কর্তৃপক্ষ দাবী করে: তারা প্রশ্ন তুললেন – ” উক্ত কলেজের ছাত্রদিগের রাত্রিতে যখন কলেজে থাকিতে হয় তখন দুই জন করিয়া ছাত্র এক ঘরে থাকে। এরূপ অবস্থায় স্ত্রীলোক কিরূপ করিয়া পুরুষের সহিত এক ঘরে থাকিবে। এবং ছাত্রদিগকে যখন পুরুষ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বুঝাইয়া দিতে হয়,তখন পুরুষ শিক্ষক স্ত্রীলোকদিগকে কিরূপে উহা বুঝাইয়া দিবে। আর ও অন্যান্য আপত্তির মধ্যে উক্ত কলেজের একজন ছাত্র বলেন যে নিয়ম আছে সমস্ত বক্তৃতায় উপস্থিত না থাকিলে পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না। এবং এই পাঁচ বৎসরের মধ্যে যদি কোনো রমণীর গর্ভ হয়, তবে প্রসবকালীন তিনি কী করিয়া বক্তৃতায় উপস্থিত থাকিবেন? আপত্তি কয়েকটি যুক্তিসঙ্গত (০২-০৭-১৮৮৩)।

বিপত্নীক ও দুই সন্তানের জনক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর সাথে এই ফাঁকে বিয়ে হলো কাদম্বিনীর। বাংলায় শিক্ষক-ছাত্রীর প্রথম লাভ ম্যারেজ। বাস্তবিক কাদম্বিনীর এই হ’য়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ, তিতিক্ষা, ও প্রেরণা ছিল তাঁর।
তাঁদের বিবাহ বাসরে সংগীত পরিবেশন করেন তরুণ রবীন্দ্রনাথ। স্বামী সূত্রে, ছাত্রী থাকাকালীন বিদ্যাসাগরের স্নেহাশীর্বাদ লাভ করেন তিনি। পাখি – মা যেমন ডানা দিয়ে ঝড় ঝাপটা থেকে শাবকদের আগলে রাখে, তিনিও কাদম্বিনীকে আমৃত্যু রক্ষা করেছেন। বঙ্গবাসী পত্রিকায় সম্পাদক কাদম্বিনীর রাত বিরেতে রুগী দেখতে যাওয়াকে কটাক্ষ করে নানা কুৎসা প্রকাশ করেন। তাঁকে চরিত্রহীনা, ব্যভিচারিনী আখ্যা দেয়। এর প্রতিবাদে আদালতে মানহানির মামলা রুজু করেন দ্বারকানাথ। জয়ী ও হন। আদালত বঙ্গবাসী সম্পাদক মহেশচন্দ্র পালকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০০ টাকা অর্থদণ্ড এবং ছয় মাসের কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করে।

তিনি মেডিকেল কলেজের একাংশের অধ্যাপকদের চক্রান্তের শিকার হন। ফাইনাল ইয়ারে অন্যায় ভাবে মেডিসিনে তাঁকে ফেল করিয়ে দেওয়া হয়। অধ্যক্ষ ড: কোটস তাঁর প্রতি স্নেহশীল ছিলেন বরাবর। তিনি পরিচালন সমিতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাদম্বিনীকে বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কলকাতায় প্রথম গ্রাজুয়েট অব দ্য মেডিক্যাল কলেজ অব বেঙ্গল (GMCB) ডিগ্রি প্রদান করেন । তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর পাত্রী ছিলেন না তিনি। সন্তানদের সতীন- তনয়া বিধুমুখীর (উপেন্দ্র কিশোরের স্ত্রী) জিম্মায় রেখে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেত যাত্রা (১৮৯৩) করেন। এক বছরের মধ্যে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. আর. সি. পি., এল. আর. সি. এম. এবং গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এল. এফ. সি. পি. ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন । দ্বিতীয় দফায় পুনরায় লেডি ডাফরিন হাসপাতালে কাজে যোগ দেন। গাইনোকলজি বিভাগের সিনিয়র ডাক্তার হিসেবে। কিন্তু চাকরি করার মধ্যে যে পরবশতা রয়েছে, তা সহ্য হয় না তাঁর। ইস্তফা দিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন। অচিরেই সফল হন ।

চিকিৎসক কাদম্বিনীর অন্যতম স্মরণীয় কীর্তি নেপালের রাজা জঙ বাহাদুরের মা ‘নেপালের রাজমাতা’কে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা। এর ফলে প্রায় দু’বছর নেপালের রাজ প্রাসাদে অতিথি হয়ে কাটিয়েছেন তিনি। দেশে ফেরার সময় উপহার হিসেবে সংগে আনেন প্রচুর অর্থ ,পাথর বসানো নানা স্বর্ণালঙ্কার, মুক্তোর মালা, রুপোর বাসন, তামা-পিতল ও হাতির দাঁতের নানা সামগ্রী এবং স্বাস্থ্যবান একটি সাদা টাট্টু ঘোড়া।
সমসাময়িক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন তিনি। গান্ধীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশন (১৮৮৯) এবং কলকাতায় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ অধিবেশনে (১৮৯০) প্রতিনিধিত্ব করেছেন।আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।বিহার ও ওড়িষা প্রদেশের মজুরানীদের স্বার্থে সংগঠনের নির্দেশে কামিনী রায় ও তিনি ঐসব এলাকা পরিদর্শন করে রিপোর্ট দিয়েছেন।

আসামের চা- শ্রমিকদের আন্দোলনেরও সহমর্মী ছিলেন তিনি। আটটি সন্তানের দেখাশুনা, সমাজসেবী স্বামীর প্রতি যথাসাধ্য কর্তব্য সম্পাদন, দেশের কাজ, পেশার কাজ ছাড়াও সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের জন্য নানা উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে লাগাতার অংশ নিয়েছেন তিনি। ১৯১৪ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের কলকাতা অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তিনি। গান্ধীজীর সহকর্মী হেনরি পোলক প্রতিষ্ঠিত ট্রান্সভাল ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি হন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। স্বাধীনতা আন্দোলনের বীরাঙ্গনা জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী (১৮৯০ – ১৯৪৫) দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। ভাবতে গর্ব হয়, জ্যোতির্ময়ীকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন রত্নগর্ভা কাদম্বিনী।
একটি জটিল অস্ত্রোপচার শেষে ফিটন গাড়িতে চেপে বাড়ি ফিরে চানঘরে যান কাদম্বিনী। কলঘরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হন। নিবে যায় জীবনদীপ। আমেরিকান ইতিহাসবিদ ডেভিড কফ যাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন- “গাঙ্গুলীর স্ত্রী কাদম্বিনী ছিলেন তাঁর সময়ে সবচেয়ে সফল এবং স্বাধীন ব্রাহ্ম নারী ।”

- Advertisement -
Latest news
Related news