Monday, May 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৬৬, ক্ষণজন্মা সুকুমার রায়।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

ক্ষণজন্মা
সুকুমার রায় বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

ভুবনবন্দিত চিত্র পরিচালক সত্যজিত রায় মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে নিজের ক্ষণজন্মা পিতার জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করেছেন। মাত্র ৩৬ বছর বেঁচেছিলেন মানুষটি। লেখক, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক, ফটোগ্রাফার, নাট্যকার, পত্রিকা সম্পাদক, ব্রাহ্ম সমাজের সংগঠক। তিনি সুকুমার রায় (৩০ অক্টোবর ১৮৮৭ — ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২৩)। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অকৃপণ স্নেহধন্য সুকুমার রায় সম্পর্কে বলেছেন – ‘তাঁর স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ছিল’।

বাস্তবিক উত্তরাধিকার সূত্রে বিজ্ঞান ও সাহিত্য চেতনার ধারক ছিলেন সুকুমার। বাবা ছিলেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সন্দেশ সম্পাদক, চিত্রশিল্পী উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী। মা- বিধুমুখী দেবী। যে বিধুমুখীর বাবা ছিলেন ব্রাহ্ম নেতা ও প্রাবন্ধিক শিক্ষা প্রসারক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী, বিধুমুখীর বিমাতা কাদম্বিনী ছিলেন এদেশের প্রথম বাঙালী মহিলা ডাক্তার ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। সুকুমারের পিসেমশাই হেমেন্দ্র নাথ বসু ছিলেন বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর ভাগিনেয়। ঐতিহ্যবাহী লাহাবাবুর বাড়িতে অনান্য ব্রাহ্ম পরিবারের সংগে এক বৃহত্তর পারিবারিক আবহে ১৩নং কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে শৈশব কেটেছে তাঁর। ব্রাহ্ম- সমাজ পাড়ায় মাতামহ – মাতামহী সহ অনেকেই থাকতেন। সেখানেই প্রথম পড়াশুনা ব্রাহ্ম স্কুলে। পরে সিটি কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে অনার্স পাস করেন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। এরপর বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে গুরুপ্রসন্ন ঘোষ স্কলারশিপ নিয়ে ১৯১১ সালে বিলেতযাত্রা করেন সুকুমার। ‘এরেবিয়া’ স্টিমারে চেপে। লক্ষ্য ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণশিল্প নিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ ।

ফটোগ্রাফি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রসিদ্ধি ছিল ‘পেনরোজ’ পত্রিকার নাম। এই পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে যোগাযোগ ও লেখালেখি করতেন উপেন্দ্রকিশোর। পত্রিকার তখনকার সম্পাদক মি. গাম্বেল এর তত্ত্বাবধানে সুকুমার ভর্তি হন LCC School of Photo Engreving and Lithography প্রতিষ্ঠানে। পাশাপাশি যুক্ত হন লন্ডনের ফটোগ্রাফি সোসাইটিতে। সেখানকার লাইব্রেরিতে প্রথমে পড়াশুনার জন্য যাতায়াত করতেন। পরে তার সদস্যপদ লাভ করেন। তাঁর পূর্বে জন্মসূত্রে কোনো ভারতীয় হিসেবে শুধু স্যার যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর এই সদস্যপদ অর্জন করেন। এরপর ১৯১২ সালে ম্যাঞ্চেস্টারের স্কুল অব টেকনোলজিতে বিশেষ ছাত্র রূপে স্টুডিও ও লেবরেটরি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘ফেলো অব দ্য রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটি ‘ উপাধি প্রাপ্ত হয়ে দেশে ফেরেন। রবীন্দ্রনাথের সংগে দ্বারকানাথ ও উপেন্দ্রকিশোরের যোগাযোগ ছিল অনেকদিন। সেই সূত্রে সুকুমার রায়কে আশৈশব চিনতেন তিনি। বাস্তবে তাঁর ডাক নাম যে ‘তাতা’ তার পেছনেও রবীন্দ্রনাথের অবদান রয়েছে। ১৮৮৭সালে ‘রাজর্ষি’ উপন্যাস রচিত হয়। সেখানে ‘হাসি’ ও ‘তাতা’ নামে দুটি চরিত্র রয়েছে। যার প্রেরণায় উপেন্দ্রকিশোর নিজের বড় মেয়ের ডাক নাম দেন হাসি (সুখলতা) এবং বড় ছেলের ডাক নাম দেন তাতা (সুকুমার)। এই তাতা বিলেত যাত্রার প্রাক্কালে শান্তিনিকেতনে কিছুদিন ছিলেন। সেসময় রবীন্দ্রনাথ এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহশিল্পী হিসেবে ‘গোড়ায় গলদ’ নাটকে অভিনয় করেছেন। লন্ডনে ‘গীতাঞ্জলি’র পাণ্ডুলিপি নিয়ে যান সুকুমার। শুধু তাই না সেখানকার East and West Society-র আহ্বানে একটি বক্তৃতা পেশ করেন। যার শিরোনাম ছিল The Spirit of Rabindranath. যা পরে Quest পত্রিকায় প্রবন্ধ রূপে প্রকাশিত হয়।

উপেন্দ্রকিশোর প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ‘ইউ রায় এন্ড সন্স’ এর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন সুকুমার। সাথে সাথে ব্রাহ্ম সমাজের সহসম্পাদক হন। পিতার মৃত্যুর পর ‘সন্দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনাও করেছেন দীর্ঘদিন। পরে পৈত্রিক ব্যবসা ছোট ভাইকে অর্পণ করেন।
সুকুমারের প্রধান পরিচয় তিনি সাহিত্যিক। ছড়াকার। কবি। আট বছর বয়সে শিবনাথ শাস্ত্রী প্রকাশিত ‘মুকুল’ পত্রিকায় তাঁর ‘নদী’ কবিতাটি প্রথম মুদ্রিত হয়। অনর্গল মুখে মুখে ছড়া কাটতে পারতেন। পরিবারের মধ্যেই ছড়া ও কবিতার লাইভ নির্মাণ প্রচলিত ছিল। সেই সুবাদেই ছাত্র অবস্থাতেই সহপাঠীদের নিয়ে সুরসিক সুকুমার গড়ে তোলেন ননসেন্স ক্লাব। তাদের হাতে লেখা দেওয়াল পত্রিকা চালু ছিল। যার নাম ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’। পাশাপাশি চলত নাটক রচনা ও তাৎক্ষণিক মঞ্চায়ন। বিলেত ফেরত সুকুমার গড়ে তোলেন ‘মানডে ক্লাব’। প্রতি সোমবার সংঘটিত আড্ডায় সেকালের বহু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব সামিল হতেন। নানা বিচিত্র বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি ভোজনরসিক সুকুমারের সান্ধ্য আড্ডায় ঢালাও খাওয়া দাওয়া চলতো। তাই অনেকে মজা করে বলতেন – মন্ডা ক্লাব।

সুকুমারের জীবদ্দশায় কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। তবে আবোল তাবোল গ্রন্থের অঙ্গ সজ্জা, প্রচ্ছদ সব তিনি প্রস্তুত করে যান। তাঁর অনন্য সৃষ্টি গুলি হলো- আবোল তাবোল ও খাই খাই কাব্য গ্রন্থ,বর্ণমালাত্মক ও অতীতের ছবি প্রবন্ধ গ্রন্থ, পাগলা দাশু, বহুরূপী এবং হ য ব র ল গল্প গ্রন্থ এবং অবাক জলপান, লক্ষ্মণের শক্তিশেল, হিংসুটে, ঝালাপালা, শব্দকল্প দ্রুম, চলচ্চিত্ত চঞ্চরি নাটক ।
ব্রাহ্ম সমাজের সংগঠক হিসেবে সুকুমার রায় কর্মচঞ্চল ভূমিকা পালন করেছেন। দুখানি ব্রাহ্ম সঙ্গীত লিখে তিনি পরম তৃপ্তি লাভ করেন। যা সমাজের নানা অনুষ্ঠানে বহুবার গীত হয়েছে। প্রথমটি হলো – ‘প্রেমের মন্দিরে তাঁর আরতি বাজে’ এবং দ্বিতীয় হলো -‘নিখিলের আনন্দ গান’। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে তাঁরই আগ্রহে গড়ে ওঠে ব্রাহ্ম যুব সমিতি । সমিতির কর্মকাণ্ডে মুখপত্র না হলে চলে? যেখানে সুকুমার রয়েছেন সক্রিয়। অতএব চালু হলো ‘আলোক’ নামে একটি সাময়িকী। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রয়াত হওয়ার পরের বছর থেকে শুরু হয় তাঁর মৃত্যু বার্ষিকী উদযাপন। ১৯১৯এ দেবেন্দ্রনাথের প্রয়াণ তিথিতে ‘মহর্ষির জীবন ও সাধনা’ নিয়ে মনোজ্ঞ বক্তৃতা দেন সুকুমার রায় ।

‘সন্দেশ’ পত্রিকাকে উপেন্দ্রকিশোর সুবিকশিত ও জনপ্রিয় করে যান। সুকুমার মুদ্রণ কলায় প্রশিক্ষণ নিয়ে আসার পরে সেই ধারাকে বহুমুখী উদ্ভাবনী শক্তিতে উন্মুখর করে তোলেন। নবীন প্রবীণ শিল্পী ও সাহিত্য রসিকদের মিলনমেলায় রূপান্তরিত হয় সন্দেশ। অঙ্কনশৈলীর বিচিত্র উদ্ভাসে সন্দেশ বর্ণময় হয়ে ওঠে। পরে যা পুত্র সত্যজিতের হাতে অন্যমাত্রায় সঞ্জীবিত হবে।
সুকুমার রায় এবং সুপ্রভা দেবীর পরিণয় সমারোহে উপেন্দ্রকিশোর শিলাইদহ নিবাসী কবিগুরুকে উপস্থিত থাকবার জন্য সনির্বন্ধ আমন্ত্রণ জানান। রবীন্দ্রনাথ জমিদারি পরিচালনার কাজে ব্যতিব্যস্ত থাকবার কারণে নিজের অপারগতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিবাহ বাসরে হাজির হন। যৌবনে যিনি সুকুমারের মাতামহ দ্বারকানাথ ও কাদম্বিনীর বিবাহ বাসরে হাজির হয়ে গান গেয়েছিলেন।

১৯২১ সালের ২ মে সত্যজিতের জন্ম। এই মে মাসের শেষ নাগাদ অসুস্থ হন সুকুমার। চিকিৎসকরা ঘোষণা করেন মারণ ব্যাধির নাম কালাজ্বর। তখনও যার অব্যর্থ প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। নির্মম পরিণতি জানা সত্ত্বেও ভেঙে পড়েননি প্রাণশক্তিতে অফুরান সুকুমার। সৃষ্টিসুখের উল্লাসে মেতে ওঠেন। দার্জিলিংয়ের লুইস জুবিলি স্যানাটোরিয়ামে ভর্তি করা হয়। কোনো উন্নতি হলোনা।
কলকাতায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। নিয়মিত কাছের বন্ধুরা এসে গল্প করেছেন। আড্ডা দিয়েছেন। ১৯২৩ এর ২৯ আগস্ট দেখা করতে আসেন পিতৃপ্রতিম ব্রাহ্ম সখা রবীন্দ্রনাথ। একটা নয়, দুটো নয়, ইতিহাস বলছে নয়খানি গান একাদিক্রমে শুনিয়েছেন সেদিন। আচার্য্য ক্ষিতিমোহন সেন যাত্রা পথ সুগম করতে একেশ্বরবাদী সুকুমারকে নিয়মিত শুনিয়ে গেছেন প্রাসঙ্গিক ধর্মতত্ত্ব। ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮:১৫ মিনিটে প্রয়াত হন সুকুমার। যিনি আগেই ঘোষণা করেছেন অমোঘ বার্তা —
“ঘনিয়ে এলো ঘুমের ঘোর
গানের পালা সাঙ্গ মোর।”

- Advertisement -
Latest news
Related news