Wednesday, May 22, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৫৬ ।। ভগিনী নিবেদিতা; বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

লোকমাতা
নিবেদিতা

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

বিনোদ মন্ডল

ভারতের মাটিতে তিনি পদার্পণ করেন,২৪ জানুয়ারি ১৮৯৮। স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতা বিমানবন্দরে যেদিন তাঁকে স্বাগত জানান সেই দিনটা হল ২৮ ফেব্রুয়ারি। ঠিক দুমাস পরে স্বামীজী তাঁকে শিব পূজায় ব্রতী করলেন। অঞ্জলি দিতে বললেন ফুল বেলপাতা। দীক্ষা দিলেন ২৫ মার্চ। আশীর্বাদ করে আশা প্রকাশ করলেন -” তোমার জীবন পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য উত্সর্গিত হবে”। লোকসাধনায় নিবেদিত প্রাণ তাই নাম হল – নিবেদিতা (২৮ অক্টোবর ১৮৬৭ — ১৩ অক্টোবর ১৯১১)। অরবিন্দ প্রদত্ত অভিধা হল ‘শিখাময়ী’। আর রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারতসেবিকা রূপে মুগ্ধ হয়ে ‘লোকমাতা’ বিশেষণে বিশেষিত করে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানালেন। প্রিয় শিষ্যার মধ্যে স্বামীজী খুঁজে পান “মায়ের মমতা আর বীরের হৃদয় “। যাঁর স্বরূপ আবিষ্কার করেন তিনি – সেবিকা, বান্ধবী, গুরু — একাধারে (peace কবিতা দ্রষ্টব্য)।

উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভ্যান গ্যানন নামে একটি ছোট্ট শহরে জন্মগ্রহণ করেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। বাবা স্যামুয়েল রিচমন্ড নোবেল ছিলেন ধর্মযাজক। মা মেরি ইভাবেন হ্যামিল্টন (ইসাবেলা) ছিলেন গৃহবধূ। মাত্র দশ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে প্রায় অনাথ হন তিনি। মাতামহ হ্যামিল্টন উচ্চ আদর্শ ও নিয়মানুবর্তিতার অনুশাসনে তাঁকে মানুষ করেন। মাত্র সতের বছর বয়সে শিক্ষিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ তাঁর। ধর্মের আচার সর্বস্বতা, চার্চের চোখ রাঙানি দেখে এসেছেন আজন্ম। বিরক্ত তিনি মুক্তির সন্ধানে যখন কাতর -ঠিক তখনই স্বামীজীর সন্ধান পান। সান্নিধ্যে আসেন। ১৮৯৫ এর লন্ডন। নভেম্বরে হাড় কাঁপানো শীতে কাবু। রবিবার সন্ধ্যার সেই অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন লিখে —
‘ ওয়েষ্ট এন্ডের একটি বসার ঘরে আগুনের দিকে তিনি পিছন ফিরে বসেছিলেন। সামনে অর্ধবৃত্তাকারে শ্রোতাগণ। তিনি প্রশ্নের পর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন ,মনে হচ্ছিল তিনি সংস্কৃত গ্রন্থ থেকে আবৃত্তি করছেন, যা গীতধ্বনির সংগে তুলনীয়। …. পরিধানে গেরুয়া, মাঝে-মাঝে এক -একবার ‘শিব’ ধ্বনি,আর তাঁর মুখ মণ্ডলে অপূর্ব কোমলতা ফুটে উঠেছে, যার সংগে রেফায়েল – চিত্রিত মিস্টিক চাইল্ডের ললাটলিপি তুলনীয় ।’

সমবেত শ্রোতৃমন্ডলীর উদ্দেশ্যে স্বামীজী আহ্বান জানালেন মানুষের কাজে অত্মোত্সর্গ করুন। এগিয়ে আসুন। আলোড়িত হন ভগিনী নিবেদিতা। প্রস্তুত করেন নিজেকে। তাঁর মনের ভাব প্রকাশ করেন নির্দ্বিধায়। তাঁর আন্তরিক উচ্চারণ শুনে বিবেকানন্দ বলেন, এমনই বীর্যবতী নারীকে তাঁর দরকার। তবে তাঁকে মনে রাখতে হবে, কোনো বিদেশিনীকে ভারতবাসীরা সহজে আপন করে নেবেনা। ‘কেউ হয়তো তোমার সংগে কথা বলবেনা, মিশবেনা, তোমাকে ছোঁবেও না।’ তবে তিনি আশ্বস্ত করেন গুরু হিসেবে ‘তোমাকে যথাসাধ্য এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়াসী হব।’ বাকীটা ইতিহাস ।

স্বামীজীর মানসকন্যা নিবেদিতা। কলকাতাকে কেন্দ্র করে সমাজসেবার নানা দিগন্তে উদ্ভাসিত হয়েছেন তিনি। সমাজ – সংস্কারক ,লেখক, শিক্ষক, সেবিকা। প্রথম বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হলেন ১৮৯৯ তে। সেবার প্লেগ মহামারীর দাপটে কাঁপছে কলকাতা। চলছে মৃত্যু মিছিল। স্বামীজী প্লেগের মোকাবিলায় রামকৃষ্ণ মিশনের পক্ষ থেকে যে কমিটি গড়ে দিলেন – তার সম্পাদকের দায়িত্বভার অর্পিত হল নোবেলের ওপর। পুরনো কলকাতা তখন আবর্জনা ভারে নরক। মারণ রোগের ভয়ে রাস্তাঘাট সাফ -সুতরো করার কাজ স্তব্ধ। শেতাঙ্গ অত্যাচারে ক্লিষ্ট কলকাতা দেখলো অন্য এক শ্বেতাঙ্গিনীকে। ঝাঁটা হাতে রোদ ঝলমলে সকালগুলোতে বাগবাজারের অলিতে গলিতে ঝাঁট দিয়েছেন তিনি। শুধু কি তাই? গলির অন্ধ ঝুপড়িতে মুমূর্ষু মা যখন প্লেগে কাতর ,পরিবারের অন্যরা ছোঁয়াছুঁয়ির ভয়ে ছেড়ে পালিয়েছে, তিনি গিয়ে সেবা করেছেন, কোলে তুলে নিয়েছেন সংক্রমিত শিশুকেও। ১৯০৬- এ যখন পূর্ববঙ্গের মানুষ বন্যা দুর্গত, তখনও তাঁদের পাশে সেবা ও আহার্য্যসহ নানা ত্রাণসামগ্রী বিলি করেছেন দিনের পর দিন। তিনি নিজেকে ভুলে গিয়ে সেবা করেছেন। স্বামী সারদানন্দ মহারাজ ,মিস জোসেফিন ম্যাকলাউডকে চিঠিতে লিখেছেন — “শি (নোবেল) হ্যাজ গ্রোন থিনার দ্যান বিফোর ….. বাট ‘দ্য ডিয়ার গার্ল’ ডিড বিয়ন্ড হার লাইফ টোয়াইস দ্যাট ওয়ে….”

গুরুর নির্দেশে পাশ্চাত্যের বহু দেশে বেদান্তের বাণী প্রচার করেছেন তিনি। আবার ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন স্বেচ্ছায়। তাঁর ভাষণে ও লেখায় উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এদেশের প্রথম সারির মুক্তিযোদ্ধারা। বরোদায় তখন অবস্থান করছেন শ্রী অরবিন্দ। তাঁর গ্রন্থ পাঠে উজ্জীবিত হয়ে লিখেছেন – “I was very much enamoured at the time of her book, Kali the mother. ..I had read and admired the book.” নিবেদিতাই যেন কালী, ভেবেছিলেন শ্রী অরবিন্দ। তাই কলকাতা ছেড়ে যখন চন্দননগরে আসেন, তখন সেই গোপনে যাওয়ার পেছনেও ছিল নাকি কালীর নির্দেশ। তারপর বিপ্লবীরাও দেখি কালী সাধনায় মেতে উঠছেন। বারীন ঘোষ বলেন Sister Nivedita wrote an inspiring booklet called kali the mother .That book served as an inspiration of our workers.
এছাড়াও লেখেন ‘ক্রেডল টেলস ফ্রম হিন্দুইজম, ‘ও দ্য ওয়েভ ওফ ইন্ডিয়ান লাইফ , স্টাডিজ ফ্রম আন ইস্টার্ন হোম, সিভিল আইডিয়াল এন্ড ইন্ডিয়ান ন্যাসানালিটি ,’স্বামীজী কে যেরূপ দেখিয়াছি’,’ স্বামীজীর সহিত হিমালয়ে’ প্রভৃতি মূল্যবান গ্রন্থ ।

তাঁর জীবন ও সৃষ্টির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এ দেশের মহিলাদের মধ্যে। অবনীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ‘ভারতমাতা’ ছবিটি কিন্তু ভগিনী নিবেদিতার ‘মাতৃরূপা কালী’ গ্রন্থ পাঠের অনুপ্রেরণায় চিত্রায়িত। তিনিই প্রথম পাশ্চাত্যের অগ্নিকন্যা, যিনি ভারতীয় সন্ন্যাসিনীর জীবন বরণ করেন। শিক্ষাবিস্তারের পথে তিনি আলোকবর্তিকা। ১৮৯৮ সালে কলকাতায় বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ, জগদীশচন্দ্র, তাঁর স্ত্রী লেডি অবলা বসু,ওকাকুরা কাকুজো প্রমুখের সাথেও তাঁর কর্মসূত্রে সখ্য গড়ে ওঠে।

তাঁর জীবনে সেবা মন্ত্রের প্রধান আয়ুধ ছিল শিক্ষা প্রসার। স্ত্রী শিক্ষা বিস্তার। তাঁর বক্তব্যে এবং লেখায় তাই বারে বারে প্রতিধ্বনিত হয়েছে:
ক । জাতিকে জাগিয়ে তুলতে হলে, দেশে জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটাতে হলে, সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিক্ষা। শিক্ষাই তৈরি করে জাতির মেরুদন্ড।                                                         খ । ভারতের শিক্ষার ভিত্তি ত্যাগ ও প্রেম ।                            গ । প্রত্যেক জননী যেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন যে তাঁর সন্তানেরা মহৎ হবে ।                                                           ঘ । The boat is sinking .But I shall see the sunrise.
ভারতের মতো গ্রীষ্ম প্রধান দেশে অমানুষিক পরিশ্রমের ফলে তাঁর শরীর অসুস্থ হয়ে যায়। শুভানুধ্যায়ীদের পরামর্শ ও তাগাদায় তিনি ব্ন্ধু জগদীশচন্দ্র এবং সখা অবলা বসুর সাথে বায়ু বদলের লক্ষ্যে দার্জিলিংএ বেড়াতে যান। সেখানেই মাত্র ৪৪ বছর বয়সে জীবনদীপ নির্বাপিত হয় এই আলোকদুহিতার। যিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থে (The master as I saw him) লিখেছেন –I heard the teachings of my master, th Swami Vivekananda’ যে কোনো একজন শিক্ষক নন ‘the’ বিবেকানন্দ! আমরা তা শুনছি কি !

- Advertisement -
Latest news
Related news