Saturday, April 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৫১ । প্রমথ চৌধুরী; বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

সাহিত্যসেবী
প্রমথ চৌধুরী                                         বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

উনবিংশ শতকে নব জাগরণের ইতিহাসে তাঁর নাম সবুজ রংএ রঞ্জিত। তিনি বাংলা গদ্যে চলিত রীতির প্রয়োগে ছিলেন সিদ্ধ হস্ত। একটি পত্রিকাকে হাতিয়ার করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নবায়নে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। যা দেখে ১৯৫৩ সালে পরিচয় পত্রিকা লিখেছিল -‘ যুগসন্ধির যে চাঞ্চল্য ছিল তখনকার আবহাওয়ায় সবুজ পত্র তাতে সজোরে আন্দোলিত হয়েছিল।’ আর রবীন্দ্রনাথ মনে করেন – ‘সবুজ পত্র বাংলা ভাষার মোড় ফিরিয়ে দিয়ে গেল ।’ তিনি প্রমথ চৌধুরী ওরফে বীরবল (০৭-০৮ -১৮৬৮ — ০২-০৯- ১৯৪৬)।

রবীন্দ্র সমসাময়িক এই ক্ষুরধার প্রতিভা জন্মগ্রহণ করেন যশোরে। তবে পৈত্রিক ভিটে পাবনা জেলায়। বাংলাদেশের চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রামে। পুরো নাম প্রমথনাথ চৌধুরী। তবে সাহিত্য ক্ষেত্রে ‘নাথ’ ত্যাগ করে শুধু প্রমথ হয়েছেন। কৃষ্ণনগর শহরের হেয়ার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে এফ. এ. পাস করেন, এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দর্শনে অনার্স সহ বি. এ.পাস (১৮৮৯) করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম. এ.পাস করে আইন পড়তে বিলেত যান। দেশে ফিরে নানা পেশায় নানা সময়ে বিচরণ করেছেন। কখনো ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেছেন। কখনো কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি করেছেন। কখনো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। আবার কখনো জোড়াসাঁকোর ঠাকুর এস্টেটের ম্যানেজার এর ভূমিকা পালন করেছেন। রুচিশীল এই মানুষটি ঠাকুর বাড়ির জামাতা হয়েছেন, ইন্দিরা দেবীর (১৮৭৩ – ১৯৬০) সংগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে।

সম্প্রতি তাঁর ১৩ টি প্রবন্ধ নিয়ে বাণীশিল্প প্রকাশনী একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ প্রকাশ করল। গ্রন্থটির নাম শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৯২। অসাধারণ মননশীল ভূমিকা লিখেছেন প্রাজ্ঞ সম্পাদক রমানাথ রায়। এছাড়াও পূর্ব প্রকাশিত গ্রন্থ গুলি হল: তেল নুন লকড়ী (১৯০৬) , বীরবলের হালখাতা (১৯১৬), নানা কথা (১৯১৯), রায়তের কথা (১৯১৯) আমাদের শিক্ষা (১৯২০), নানা চর্চা (১৯৪২), এবং দুই খণ্ডে প্রবন্ধ সংগ্রহ (প্রথম খণ্ড ১৯৫২, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৫৩)। তাঁর গল্প গ্রন্থ গুলি হল : চার ইয়ারী কথা (১৯১৬), আহুতি (১৯১৯), নীললোহিত (১৯৪১), অনুকথা সপ্তক এবং ঘোষালে ত্রিকথা।কবিতার জগতে পদচারণার স্থায়ী স্বাক্ষর হলো সনেট পঞ্চাশৎ (১৯১৩)‍ এবং পদচারণ (১৯১৯)।
বিলেত যাত্রা তাঁর মনোলোকে বিশেষ প্রভাব ফেলে। ফলে সাহিত্য সৃষ্টিতেও তার অনুরণন পরিলক্ষিত হয়। বাঙালি পেট্রিয়টিজম প্রবন্ধে তিনি নিজে তা স্বীকার করেছেন —
“আমার মন তিন বিদেশের — ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালির — বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকদের হাতে ধোলাই হয়েছে। ” বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ ভূমিকার জন্য তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী পদক ‘ অর্জন করেছিলেন। বুদ্ধিদীপ্ত, খরশান ভাষা, বিদ্রূপাত্মক কথনশৈলী এবং পরীক্ষামূলক চলিতরীতির নিরন্তর ব্যবহারে আজীবন সচেষ্ট ছিলেন তিনি। বাংলা সাহিত্যে তাঁর বহু উক্তি প্রবাদ প্রতিম খ্যাতির অধিকারী।

১। পাতা কখনো আর কিশলয়ে ফিরে যেতে পারে না, প্রাণ পশ্চাৎপদ হতে জানেনা। (সবুজপত্র)
২। সৃষ্টির জন্য মনের যৌবন চাই। পুরাতনকে আঁকড়ে থাকাই বার্ধক্য অর্থাৎ জড়তা। ( যৌবনে দাও রাজটীকা)
৩। দরিদ্রের ঘরে কোহিনূর থাকলে তার রাত্রে ঘুম হওয়া অসম্ভব ।
৪। যে লেখায় লেখকের মনের ছাপ নেই তা ছাপলে সাহিত্য হয়না ।
৫। প্রেম হচ্ছে মূল্যহীন ফুলের বিনি সুতোর মালা ।
৬। সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্ব-শিক্ষিত।
৭।পৃথিবীতে যত দিন দরিদ্র আর ধনী থাকবে, তত দিন আইন কানুন সবই থাকবে ।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে অবস্থান জনিত কারণে পরিবেশ পরিমন্ডল তাঁর প্রতিভা স্ফুরণে অনুকূল রসদ সরবরাহ করেছে। শ্বশুর সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতবর্ষের প্রথম আই. সি. এস.। শ্বাশুড়ী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী নারীর আত্মবিকাশে পথপ্রদর্শিকা। খুড়শ্বশুর সংস্কৃতিমান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শ্যালকের তালিকায় অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ প্রমুখেরা। আর সর্বোপরি সহগামিনী প্রিয়দর্শিনী বিদুষী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী। তাই “সবুজপত্র “প্রকাশে নানা প্রণোদনা তিনি পারিপার্শ্ব থেকে লাভ করেছেন। বাস্তবিক ,ইতিহাসে তাঁর সর্ব শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে সোনার অক্ষরে লেখা আছে পত্রিকাটির কথা। ১৯১৪ খ্রীষ্টাব্দে( ২৫ বৈশাখ, ১৩২১ সন) প্রথম প্রকাশিত হয় সবুজপত্র।প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন নন্দলাল বসু। প্রচ্ছদে প্রতীকী তাত্‍‍পর্যে মণ্ডিত হয়ে সবৃন্ত সবুজ তাল পাতার ছবি উদ্ভাসিত হয়।

পত্রিকাটির সূচনা লিপি ছিল “ওঁ প্রাণায় স্বাহা”। উপদেশক হিসেবে ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তিনি প্রথম সংখ্যার জন্য উপহার হিসেবে ‘সবুজের অভিযান’ নামক কালজয়ী কবিতাটি রচনা করেন। সেখানে তিনি উচ্চারণ করেছেন-”
চিরযুবা তুই যে চিরজীবী/জীর্ণ জরা ঝরিয়ে দিয়ে / প্রাণ অফুরান ছড়িয়ে দেদার দিবি।”
সবুজ — প্রাণের, যৌবনের, তারুণ্যের প্রতীক। তাই পত্রিকার এমন নাম প্রদান। বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে তার আগে বঙ্গদর্শন ছাড়া আর কোনো পত্রিকা এতটা সাড়া ফেলতে পারেনি। কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নয়, শুধুমাত্র বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে ভালোবেসে এই পত্রিকার ১০৮ টি সংখ্যা প্রকাশিত হয় প্রমথবাবুর হাত ধরে। প্রথম পর্বে এখানে কোনো বিজ্ঞাপণ গ্রাহ্য হত না। পরবর্তী কালে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের উদ্যোগে পত্রিকাটি পুনর্জীবন লাভ করলে বিজ্ঞাপণ গৃহীত হয়। বীরবল এর কলমে: “. ….গতপূর্ব যুদ্ধের সময় জিনিসপত্রের আকাল হওয়ায় আমি সবুজপত্র বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। প্রথম পর্যায় সবুজপত্র ১৩২১ সাল থেকে ১৩২৮ সাল পর্যন্ত একাদিক্রমে চলে। তারপর ক’বছর বন্ধ থাকে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৩৩০ থেকে ১৩৩৪ পর্যন্ত চালিয়ে ছিলুম। তারপর আর পারলুম না।…….দ্বিতীয় পর্যায় সবুজ পত্রের খরচা সুধীন্দ্র দেন। ….সুধীন দত্ত খরচা দেওয়া বন্ধ করলেন, তাই সবুজপত্র বন্ধ হয়ে গেল।” (কোরক: বইমেলা ২০১৪)।

পুরাতন ও নবীনকে সমান গুরুত্ব দিয়ে পথ চলা শুরু করলেও নতুনের দিকেই এ পত্রিকা সজাগ উৎসাহ দেখিয়েছে বরাবর। তাঁকে ঘিরে যে লেখকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল – তার কয়েকটি উজ্জ্বল নাম হল -অতুলচন্দ্র গুপ্ত (১৮৮৪ – ১৯৬১) ,ধূর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায় (১৮৯১- ১৯৬১), সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় (১৮৯০- ১৯৭৭), ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী(পূর্বে উক্ত)।

নানা সময়ে বিচিত্র বিষয় ভাবনায় এই পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করেছেন বহু প্রাবন্ধিক,যাঁরা পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। বিষয় বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করা ক্ষুদ্র নিবন্ধে সম্ভব নয়। তবে দু একটি উল্লেখ করা যেতে পারে।
১। উপমা ও অনুপ্রাস — অজিত কুমার চক্রবর্তী।
২। কাব্য জিজ্ঞাসা — অতুল চন্দ্র গুপ্ত।
৩। ফরাসি কবি বোদলের –নলিনীকান্ত গুপ্ত ।
৪। বাংলাভাষা আর বাঙালী জাতির গোড়ার কথা –সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ।
৫। শিশু শিক্ষার মূল মন্ত্র –শরৎকুমারী চৌধুরানী ।
৬। অতীতের বোঝা –এস ওয়াজেদ আলী ।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে সবুজ পত্রের প্রধান উপদেশক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।তাঁর লেখা যেমন পত্রিকাকে মহিমান্বিত করেছে তেমনি এই পত্রিকাও রবীন্দ্র গদ্য রীতিকে নতুন ভাঙা গড়ায় প্রবৃত্ত করেছে। সবুজ পত্রের আহ্বানেই তিনি চলিত গদ্য ভাষা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। এখানেই তাঁর ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস সহ একাধিক বিশ্বমানের ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছে। স্বভাবত:ই তিনি লেখা দিতে দেরি করলে পত্রিকার পল্লবিত হওয়া ক্ষুণ্ন হয়েছে।
বীরবল তা অকুণ্ঠ ভাষায় স্বীকারও করেছেন- “কিছু দিন ধরে লিখে উঠতে পারছিনে। লেখার হাত ক্রমশঃ গুটিয়ে নিচ্ছি, রবীন্দ্রনাথের লেখাও পাচ্ছিনে তেমন; কিসের উপর নির্ভর করে চলব?” (কোরক /প্রাক শারদ সংখ্যা ১৪১৩)।
আজকের বই-কুণ্ঠ জাতিকে তিনি শতবর্ষ আগে সতর্ক করে গেছেন: “বই কিনে কেউ দেউলে হয়না ,যে জাতির যত বেশি লোক, যত বেশি বই পড়ে, সে জাতি তত সভ্য।”

- Advertisement -
Latest news
Related news