Tuesday, April 16, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৯৬।। বিধানচন্দ্র রায়।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

পশ্চিমবঙ্গের রূপকার
বিধানচন্দ্র রায়

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

বিনোদ মন্ডল
ব্রাহ্মপিতা প্রকাশচন্দ্র সন্তানের জন্য একটি নাম প্রস্তাব করতে অনুরোধ জানান সমাজের আদর্শবান নেতা কেশবচন্দ্র সেনকে। শ্রী সেন তখন ‘নববিধান’ পত্রিকা প্রকাশনার কাজে মশগুল। তাঁর ইচ্ছে মতো নাম হয় বিধানচন্দ্র রায় (০১.০৭.১৮৮২ — ০১.০৭.১৯৬২)।

১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে অঘোরকামিনীর কোল আলো করে জন্ম নেন। আদরের ডাকনাম ভজন। পাটনার বাঁকিপুর শহরে জন্ম। দারিদ্র্য ও অনটনের সাথে লড়াই করে পড়াশুনা করেন। কলকাতায় আসার আগে পাটনাতে গণিতে অনার্সসহ স্নাতক হন। কলকাতায় এসে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। পরে এম. ডি.। উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্যে ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন। ১৯১১ তে দেশে ফেরেন দু বছরের মধ্যে দুটো দুরূহ ডিগ্রি অর্জন করে – এম আর সি পি এবং এফ আর সি এস। ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুলে চিকিৎসক রূপে কর্মজীবন শুরু করেন(NRS) ।

প্রথমে প্রতিষ্ঠা পেতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় তাঁকে। অর্থবান রোগীদের বাড়িতে একসময় মেল নার্স এর কাজ করেছেন। এমনকি কলকাতার রাস্তায় পার্টটাইম ট্যাক্সি চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। প্রথমে রাজনীতিতে সরাসরি অংশ নিতে চাননি। পরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আহ্বানে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথের বিপরীতে আনকোরা মুখ হিসেবে জয়ী হয়ে আইনসভায় প্রবেশ করেন। ব্যারাকপুর কেন্দ্র থেকে।

দেশব্ন্ধুর মৃত্যুর পর স্বরাজ দলের শীর্ষ নেতা হন যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত। তিনি হন সহকারী নেতা। ১৯২৮ সালে এআইসিসির সদস্য হন। বাংলা কংগ্রেসের তখনকার দলাদলির যুগে BIG FIVE কে নিয়ে কাগজে নিত্যদিন লেখালিখি হত। এঁরা হলেন -শরৎ চন্দ্র বসু, তুলসীচন্দ্র গোস্বামী, নির্মলচন্দ্র চন্দ্র, নলিনীরঞ্জন সরকার ও বিধানচন্দ্র রায়। ত্রিপুরি কংগ্রেসের পর নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতা শহরে। চরম অসহনীয় সাংগঠনিক পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করেন সুভাষচন্দ্র বসু। গান্ধীবাদী নেতা গোবিন্দবল্লভ পন্থের প্রস্তাব অনুসারে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন রাজেন্দ্রপ্রসাদ। প্রতিবাদে একদল সমর্থক দক্ষিণপন্থী নেতৃত্বের গুডবুকে থাকা বিধানচন্দ্রের বাস ভবনে চড়াও হয়। বারান্দায় টাঙানো মস্ত একটা দেওয়াল ঘড়ি ভেঙে চুরমার করে।

১৯৩১-৩২ সালে দু দুবার কলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৩৫ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিলের প্রথম ভারতীয় সভাপতি ছিলেন বিধানচন্দ্র। ১৯৪২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য নির্বাচিত হন। তার আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট সদস্য হয়েছিলেন। রয়েল সোসাইটি অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন এন্ড হাইজিন এবং আমেরিকান সোসাইটি অফ চেষ্ট ফিজিসিয়ান এর ফেলো হয়েছিলেন বিধানচন্দ্র।

চিকিৎসক হিসেবে তাঁর খ্যাতি দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। নিয়মিত বাড়িতে রোগী দেখেছেন তিনি। অসাধারণ রোগ নির্ণয় ক্ষমতা তাঁকে জীবদ্দশায় কিংবদন্তি করে তোলে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন. এফ. কেনেডি, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট এটলির চিকিৎসায় পরামর্শদাতা ছিলেন বিধানচন্দ্র। দীর্ঘদিন রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছেন। মতিলাল নেহেরু, কমলা নেহেরু, জওহরলাল নেহেরু, বল্লভভাই প্যাটেল, ইন্দিরা গান্ধীর চিকিৎসা বিষয়ে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। মহাত্মা গান্ধীর চিকিৎসা নিয়ে নানা কাহিনী সুপ্রচলিত। তাঁকে হোমিয়োপ্যথি থেকে এলোপ্যাথি চিকিৎসা পরিষেবা গ্রহণ করতে বাধ্য করেন বুঝিয়ে সুঝিয়ে। মহাত্মা গান্ধী নিজের সেই অনুভবের কথা ব্যক্ত করেছেন এক ছত্রে – ‘বিধান-দ্য সেফটি হ্যান্ড অফ ইন্ডিয়া।’
৪২ এর আগস্ট আন্দোলনে প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা রাজা গোপালাচারি যোগ দেননি। বাংলার ডাকসাইটে নেতা বিধানচন্দ্র সেই সময়ে সরাসরি আন্দোলনে অংশ নেননি। জ্যোতি বসু সহ বামপন্থী নেতৃবৃন্দের সংগে যোগাযোগ ছিল নিবিড়। ১৯৪৩ – ৪৪ সালে দুর্ভিক্ষ সহ নানা সামাজিক বিপদের দিনে বামপন্থীদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। বেঙ্গল রিলিফ কো অর্ডিনেশন কমিটির কাজে সহযোগিতা করেছেন।

স্বাধীনতার পর তাঁকে যুক্ত প্রদেশের রাজ্যপাল হওয়ার জন্য অনুরোধ জানান জওহরলাল নেহেরু। তিনি বাংলা ছেড়ে যেতে চাননি। গান্ধীজীর পরামর্শে কঠিন সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে আজীবন এই গুরুভার বহন করেছেন। দুর্ভিক্ষের অভিঘাতে তখন বাংলা বিপর্যস্ত। অর্থনৈতিক কাঠামো বলে কিছু নেই। ম্যালেরিয়ার দাপটে গ্রামবাংলা প্রায় শ্মশানে পর্যবসিত। লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর অন্ন – বস্ত্র – বাসস্থানের সমস্যা, অনাহার ও অশিক্ষার অন্ধকার থেকে বাংলাকে স্বয়ম্ভর করার কাজে ব্রতী হন বিধানচন্দ্র।

দূরদর্শী এই মানুষটি স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি -দুধরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে নিরলস চেষ্টায় পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে শক্ত ও মজবুত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। দুর্গাপুর শিল্পনগরী স্থাপন, চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ কারখানা নির্মাণ, রূপনারায়ণপুরের কেবলস ফ্যাক্টরি প্রতিষ্ঠা, খড়গপুর শহরের উপকণ্ঠে আই. আই. টি. স্থাপন , কোলাইকুন্ডায় বিমান ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা, হিমালয় মাউন্টিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট স্থাপন, কল্যাণী শহর ও কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ। কলকাতায় রাষ্ট্রীয় পরিবহণ ব্যবস্থার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার প্রচলন ,উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্যক্রম প্রবর্তন, জেলাভিত্তিক শিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গঠন, ম্যালেরিয়া ও বসন্তরোগ প্রতিরোধে অভিযান, মেডিক্যাল কলেজগুলির আধুনিকীকরণ, পাটের উৎপাদন বৃদ্ধিতে উদ্যোগ গ্রহণ, খাদ্যসংকট মোকাবিলায় কর্মসূচি প্রণয়নে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।

জেদি ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী বিধানচন্দ্রের চরিত্রের একটি অসামান্য গুণ হল তাঁর অপ্রতিম রসবোধ। বিধানসভার কার্যবিবরণী এবং তাঁর অনুরাগী গবেষকদের লেখায় যার অজস্র নজির প্রকীর্ণ। ক্ষিপ্রগতিতে চটজলদি প্রতিক্রিয়ায় নির্মল হাস্যরস ও শাণিত ব্যঙ্গের চাবুকে সম্মোহিত করতে পারতেন তিনি। কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হলো। সরোজিনী নাইডু তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল। তিনি এক অনুষ্ঠান শুরুর ফাঁকে সর্বসমক্ষে বলেন -‘ ডা. রায় আপনার তো প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স হয়ে গেল! অথচ এই বয়সেও কিন্তু হাসলে আপনার গালে টোল পড়ে।’ উত্তরে বিধানচন্দ্র বলেন – ‘আপনারও তো পঞ্চাশ হলো প্রায়! অথচ এখনও এসব নজর করেন?’

১৯৫৩ সাল। গণনাট্য সংঘ তখন বামপন্থীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জোতদার- জমিদারদের শোষণ-অত্যাচার- নিপীড়নের মুক্তি প্রয়াসে আন্দোলনে রত। রাজ্য সরকার জমিদারদের চাপে গণনাট্য সংঘের ৫৯ টি নাটক মঞ্চায়ন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তা নিয়ে বিধানসভায় প্রশ্ন উত্থাপন করেন মণি কুন্তলা সেন। সভায় একসময় হই চই শুরু হয়। মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ায় অসন্তুষ্ট বিরোধী দলনেতা জ্যোতি বসু বলেন-‘ আপনি হিটলারের মতো আচরণ করছেন’। সংগে সংগে মুখ্যমন্ত্রী জবাব দেন -‘হ্যাঁ হিটলার স্তালিনের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে’।

একবার মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরে যান বিধানচন্দ্র। ফিরে এসে বিধানসভার অধিবেশনে যোগ দেন। বামপন্থী বিধায়ক বঙ্কিম মুখার্জী সহাস্যে বলেন – ‘মশাই কি গঙ্গাসাগরে সারা জীবনের পাপ রেখে এলেন’? উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন -‘ হ্যাঁ রেখে এলাম! তোমরা মেখে নিও।’ চোদ্দ বছর একচ্ছত্র প্রতাপে রাজ্য পরিচালনা করেছেন তিনি। পরিবহণ ও পুলিশ দপ্তর ছাড়া বাকি সব দপ্তর নিজের জিম্মায় রেখেছিলেন।

১৯৬১তে দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ প্রদান করা হয় তাঁকে। নিজের ওয়েলিংটন স্কোয়ারের বাসভবনটিও জাতির সেবায় স্বাস্থ্যদপ্তরকে দান করে গেছেন অকৃতদার মানুষটি । কর্মরত অবস্থায় রাজভবনে প্রয়াত হন বিধানচন্দ্র। দেশবন্ধুর স্ত্রী বাসন্তীদেবী তাঁর বিয়োগবার্তা পেয়ে বলেন – ‘বিধান পুণ্যাত্মা – তাই জন্মদিনেই চলে গেল। ভগবান বুদ্ধও তাঁর জন্মদিনে সমাধি লাভ করেছিলেন’।

- Advertisement -
Latest news
Related news