Tuesday, June 25, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৩১।।  চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল                                                                                 চিন্ময় দাশ
নারায়ণ মন্দির, পশ্চিম পুরুষোত্তমপুর (কাঁথি)
‘তিল থেকে তাল’—এই প্রবাদের জ্বলন্ত উদাহরণ নিয়ে এবারের জার্ণাল। সেই ঘটনার অভিঘাতে, অনিন্দসুন্দর একটি দেবালয় কীভাবে একটু একটু করে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হতে পারে, তার দৃষ্টান্তই এই নিবন্ধের প্রতিপাদ্য।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

বিষ্ণু উপাসক একটি পরিবারের বাস মাজনামুঠা পরগণার পশ্চিম পুরুষোত্তমপুর গ্রামে। বর্তমান কাঁথি শহরের সামান্য পূর্বদিকে, হাতের মুঠোয় ধরা যায়, এমনই ছোট্ট মাপের গ্রাম। সেই গ্রামেই বাস ছিল স্বচ্ছল নায়কবংশের।

নায়করা চৈতন্যদেবের গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে প্রভাবিত হয়ে, বাস্তুর ভিতরেই গড়েছিলেন কুলদেবতা নারায়ণের মন্দিরটি। একটি কুলগাছ ছিল মন্দিরের লাগোয়া। একবার পার্শ্ববর্তী আদাবেড়িয়া গ্রামের একটি বালক এসে গাছের কুল চুরি করে খেয়েছিল। তাই থেকে বিবাদের সূত্রপাত।
কিশোরের পরিবার আদালত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল বিবাদটিকে। আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা সকলের জানা। কয়েক দশক ধরে চলেছিল মোকদ্দমাটি।
মামলার দিন গড়িয়েছে যত, তার সাথে তাল মিলিয়ে, একটু একটু করে নিঃস্ব হয়েছে নায়কবংশ। কৃষ্ণপ্রসাদ নায়ক যখন পরিবারের কর্তা, তাঁর জীবদ্দশাতে মামলার নিঃষ্পত্তি হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে কাঠাখানিক জমির উপর বসতবাড়ী আর মন্দিরটুকু ছাড়া, বাকি প্রায় দু’শ বিঘা সম্পত্তি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল।

এমন একদিন এলো, যেদিন মন্দিরের পুরোহিতের দক্ষিণাটুকু দেওয়ার সাধ্যও আর রইল না। তখন চোখের জলে বুক ভাসিয়ে, দেবতার বিগ্রহ দুটি তুলে দিতে হয়েছিল ব্রাহ্মণের হাতে। অশ্রুরূদ্ধ কন্ঠে একটিমাত্র আবেদন ছিল কৃষ্ণপ্রসাদের– ঠাকুরমশাই, আমি তো পারলাম না। আপনার ঘরে জল-তুলসীটুকু যেন বজায় থাকে আমার দেবতার।
সেদিন হাহাকারে বুক ফেটে যাচ্ছিল নায়কবংশের। শালগ্রাম শিলা নয়। শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম ধারী নারায়ণ। প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর দণ্ডায়মান চতুর্ভূজ মূর্তি দেবতা, চলে গিয়েছিলেন বাস্তুভিটে ছেড়ে। সেদিন থেকে, পাশেই ব্রাহ্মণবসান গ্রামে, পুরোহিতবাড়িতে পূজিত হচ্ছেন নারায়ণ।
নায়কবাড়ির মন্দিরে আর ধূপ-দীপ জ্বলে না। শঙ্খ-ঘন্টা- কাঁসরের শব্দে মুখরিত হয় না গ্রামের বাতাস। পূর্ব কালে বারো মাসে তেরো পার্বণের আয়োজন হোত ঘটা করে। সেসব এখন বেদনা বিধুর স্মৃতি মাত্র।
পুরুষোত্তমপুরের অদূরেই সমুদ্র। সমুদ্রের বুক থেকে নোনা বাতাস উঠে আসে। বারো মাস কুরে কুরে খায় পরিত্যক্ত দেবালয়টিকে। বড় বড় গাছপালার শেকড়-বাকড়ে আষ্টে-পৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে দেবালয়টি।

জীর্ণ পরিত্যক্ত এই মন্দিরের পাদপীঠ এখনও ফুট দুয়েক উঁচু। চারদিক ঘিরে একটি প্রদক্ষিণ-পথ ছিল, তার চিহ্ন দেখা যায়। ইট-চুন-সুরকির উপাদানে গড়া পূর্বমুখী পঞ্চ-রত্ন মন্দির। চার দিকে চারটি অলিন্দ গর্ভগৃহকে বেষ্টন করে আছে।
সামনের অলিন্দে খিলান-রীতির তিনটি দ্বারপথ। একটি করে দ্বারপথ আছে উত্তর এবং দক্ষিণেও। পশ্চিমেরটি ‘চাপা-অলিন্দ’। গর্ভগৃহে অতিরিক্ত একটি দ্বার আছে, উত্তরের অলিন্দের সাথে যুক্ত সেটি। এই অলিন্দ থেকে একটি সিঁড়ি রচিত আছে দ্বিতল পর্যন্ত।
সামনের অলিন্দের দুটি অর্ধ-স্তম্ভের কঙ্কাল থেকে অনুমান করা যায়, সেগুলি ‘ইমারতি-রীতি’তে নির্মিত হয়েছিল। অলিন্দগুলির সিলিং ‘টানা-খিলান’ রীতির। গর্ভগৃহের সিলিং হয়েছিল পর পর চারটি খিলানের মাথায় গোলাকার ভল্টের সাহায্যে।
পাঁচটি রত্নেই রথ বিভাজন করা। তবে, ছাউনির চালায় পীঢ়-ভাগ করা হয়নি। সবগুলি রত্নেরই শীর্ষক অংশ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। সেগুলিতে বেঁকি, খাপুরী, আমলক, ঘন্টা, কলস, বিষ্ণুচক্র ইত্যাদি কীভাবে রচিত হয়েছিল, সে সম্পর্কে কিছু বলা যায় না।

বর্তমানে মন্দিরে অলিন্দের সামনের দেওয়ালটি নাই বললেই চলে। যেটুকু আছে, তাতেই টেরাকোটা ফলক ব্যবহারের নিদর্শন দেখা যায়। মন্দিরের সর্বাঙ্গে ইটের কঙ্কাল ছাড়া, পলেস্তারার চিহ্নমাত্র নাই। ১০০ বছর তো বড় কম সময় নয় !
তিনটি দ্বারপথের মাথার বড় প্রস্থগুলিতে ফলক বিন্যাস কেমন ছিল, তা আর জানা যাবে না কোনদিন। তবে, প্রস্থগুলির বিভাজক সারিগুলি ফলকমণ্ডিত ছিল, তার নমুনা আছে। এছাড়া, কার্ণিশের নীচ বরাবর এক সারি এবং দু’দিকের দুই কোণাচের গায়ের খাড়া দুটি সারিতে ফলক ছিল, তারও দুটি-একটি নমুনা দেখা যায়।

মোটিফ হিসাবে দেখা যায়—বিষ্ণুর দশাবতার, অশ্বারোহী সৈনিক, কয়েকটি নর-নারী মূর্তি ইত্যাদি। দুটি মিথুন মূর্তিও টিকে আছে এখনও। এককালে মন্দিরটি যে টেরাকোটা মণ্ডিত হয়ে অপরূপ দর্শন ছিল, বুঝতে অসুবিধা হয় না।
একটি অহঙ্কারী বনেদী পরিবারের জেদ আর দম্ভের কারণে, এমন একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস হয়েছে, দেখলে বেদনায় বুক ভারী হয়ে আসে।

সাক্ষাৎকারঃ সর্বশ্রী পুলিন বিহারী নায়ক, কাঁথি। চন্দন নায়ক,পশ্চিম পুরুষোত্তমপুর।
সহযোগিতাঃ সর্বশ্রী জ্যোতির্ময় খাটুয়া—বালিসাহী, রামনগর। অভিজিৎ দাস– সটিকেশ্বর, কাঁথি।
পথনির্দেশঃ বাস কিংবা ট্রেন যোগে, যে কোনও দিক থেকে কাঁথি। শহরের পূর্ব প্রান্তে দারুয়া ছেড়ে সামান্য এগিয়ে, দক্ষিণ মুখে খানিক দূরেই নারায়ণ মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news