Saturday, April 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-১০৬।। বিমল রায়।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

নতুন সিনেমার অগ্রদূত
বিমল রায় বিনোদ মন্ডল                                                                                       ২৫ মে ১৯৪৩। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রথম সম্মেলন। ১৯৪৪ সালে মুক্তি পেল বাংলা ছায়াছবি উদয়ের পথে। এই প্রথম বাংলা সিনেমায় যুক্ত হল কার্ল মার্কস এর প্রতিকৃতি। বাংলা ছবির সাহসী ও বেপরোয়া পর্দায় আছড়ে পড়ল মালিকের শোষণ , প্রতারণা , শ্রমিকের প্রতিবাদ। ছবির পরিচালক বছর পঁয়ত্রিশের তরুণ বিমল রায় (১২.০৭.১৯০৯ –০৮.০১. ১৯৬৬)।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

পরে সত্যজিৎ রায় লিখেছেন “With his first film Udayer Pathe (Humrahi in hindi ), Bimal Ray was able to sweep aside the coldwave of the old tradition and introduce a realism that was wholly suited to the cinema. He was undoubtedly the pioneer. ”

বিমল রায় জন্মেছিলেন ঢাকার সুত্রাপুরে। জমিদার বংশে। তিনি যখন নাবালক, সম্পন্ন বাবার মৃত্যু হয়। নায়েব বা এস্টেট ম্যানেজার মায়ের অজান্তে জমিদারি লিখিয়ে নেয় নিজের নামে। বাইশ বছরের নিঃস্ব যুবক বিমল অসহায় বিধবা মা ও ছোট ছোট ভাই বোনেদের নিয়ে চলে আসেন কলকাতায়। নেশা ছিল ফটোগ্রাফির। আচমকা যোগাযোগ হয়ে যায় প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে। সিনেমার বিজ্ঞাপণ আর প্রচারের চিত্র গ্রহণে হাতে খড়ি। টালিগঞ্জে তখন নতুন যুগের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

ইন্টারন্যাশানাল ফিল্ম ট্রাস্টের কেউকেটা বি. এন. সরকার নতুন স্টুডিও খুললেন। ছবির প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটছে প্রতিদিন। পরিচালকের চাহিদা মতো ইনডোর ফ্লোরে শ্যুটিং শুরু হল। ব্যবস্থা হলো কৃত্রিম আলোর। ক্যামেরা পরিচালনায় এসে গেল বিদেশি কৃৎকৌশল। ট্রলি ।ক্রেন। সমসময়ে নিউ থিয়েটার্সএ যোগ দিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া। এলেন ধীরেন গাঙ্গুলী, দেবকী বসুর মতো প্রতিভা। এলেন বাংলার বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান নীতীন বসু। নীতীন বসুর সহকারী হিসেবে পথ চলা শুরু বিমল রায়ের। এই সময় নজরে পড়েন বীরেন সরকারের। দুটো তথ্য চিত্র নির্মাণের দায়িত্ব পান। ‘হাউ কোরোসিন টিন আর মেড’ এবং ‘গ্রান্ট ট্রাংক রোড’। এখন অবশ্য দুটোই নিশ্চিহ্ন। ক্রমে নীতীন বসু ব্যস্ত হয়ে পড়লেন চিত্র পরিচালনায়, এদিকে বিমল রায় হয়ে উঠলেন ক্যামেরার বেতাজ বাদশা ।

ক্যামেরাম্যান হিসেবে স্বাধীন দায়িত্ব পালন করেন ‘গৃহদাহ’ ছবিতে। দ্বিতীয় ছবি ‘মায়া’।তবে তাঁর কাজের উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি এল ‘মুক্তি’ ছবি প্রকাশের পর। সারা দেশের চলচিত্র রসিকের মন কেড়ে নিলেন তিনি। আলোর অনন্য ব্যবহার, কম্পোজিশন অনুযায়ী লেন্সের পরিবর্তন তাক লাগিয়ে দিল সবাইকে। একের পর এক ছবি। তখন নিউ থিয়েটার্সের স্টুডিও সিস্টেম ভেঙে পড়ছে। বিখ্যাত বিমল রায়কে হাতছানি দিচ্ছে বোম্বাই। তবু অতীতের আশ্রয় দাতা বীরেন সরকারকে তিনি ছেড়ে যাননি। এই সময় উদয়ের পথে , অঞ্জনগড় (১৯৪৮), মন্ত্রমুগ্ধ (১৯৪৯) প্রভৃতি ছবি করেছেন ।

ধীরে ধীরে কলকাতা থেকে অর্থনীতির বাজার ও বাজারের অর্থনীতি সরে গেল বোম্বাই অভিমুখে। সদ্য স্বাধীন দেশ। চলচিত্রের আঙিনাতে বাংলার ঘোর দুর্দিন। অনেকটা বাধ্য হয়ে বোম্বাই পাড়ি দিলেন বিমল রায়। সঙ্গে নিয়ে গেলেন একদল তরুণ প্রতিভাকে । হৃষিকেশ মুখার্জী , সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক সহ অনেকে । সবাই গণনাট্যের কর্মী সংগঠক – প্রায় বেকার তরুণের দল। সেদিনের গণনাট্য ভাঙাচোরা দিশাহীন , গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে মুখর রণদিভে তত্ত্বের প্রকোপে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ।বিমল রায় নিজে কখনো সরাসরি গণনাট্য আন্দোলনে যুক্ত হননি। তবে বরাবর এঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন ।

কলকাতার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ বিমল রায়ের পরিচালক জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হল। ১৯৫৩ সালে মুক্তি পেল ‘দো বিঘা জমিন’। উৎস –রবীন্দ্র কবিতা দুই বিঘা জমি। ভারতে গরীব কৃষকের উপর জমিদার জোতদারের নির্মম শোষণের বাস্তব শিল্পকর্ম। সলিল চৌধুরীর অসাধারণ সংগীত পরিচালনা এবং বলরাজ সাহনির তুখোড় অভিনয়। সম্পাদনায় হৃষিকেশ মুখার্জী। বলিউডের প্রথাসিদ্ধ ছকের বাইরে এক প্রচন্ড অভিঘাত সৃষ্টি হল ভারতীয় সিনেমায়। এই প্রথম কোন ভারতীয় ছবি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার অর্জন করল।
কান , ভেনিস, কার্নোডিভেরি ,মেলবোর্ন চলচ্চিত্র উৎসবে উচ্চ প্রশংসিত হল। দর্শক অভিনন্দিত হল ব্রিটেন , চিন , সোভিয়েতে ।

প্রথম ছবি ‘পহেলা আদমি’ (১৯৫০) পরিচালনা ও প্রযোজনা করে বোম্বাইতে অগ্রগণ্য পরিচালকের আসন দখল করেছিলেন। এরপর সবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেলেন। সমাজ বাস্তবতার আদর্শে অবিচল থেকে নির্মাণ করেন পরিণীতা (১৯৫৩), বিরাজ বহু (১৯৫৪), নৌকরি (১৯৫৪), দেবদাস (১৯৫৫), মধুমতী (১৯৫৮), সুজাতা (১৯৫৯) প্রভৃতি হিন্দি ছবি। শরৎচন্দ্র , সুবোধ ঘোষ , জরাসন্ধ প্রমুখ সাহিত্যিকের কালজয়ী সৃষ্টিকে অমর করে তুললেন রূপালি পর্দায়।

এখানে উল্লেখ করতে হয় মধুমতী প্রসঙ্গ। কথিত আছে , এই ছবির কাহিনি নির্মাণে ঋত্বিক ঘটক নাকি ঈর্ষাবশতঃ বিমল রায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন অলৌকিকতা ও জন্মান্তরবাদের অবৈজ্ঞানিক কাহিনি। তবে মূল বক্তব্য ছিল ধনীর প্রবল লালসা। অসামান্য সংগীত পরিচালনা করেছেন সলিল চৌধুরী। তথ্যচিত্র নির্মাণেও তিনি সমান সাফল্য পেয়েছেন। ১৯৬৫ তে মুক্তি প্রাপ্ত তথ্যচিত্র ‘গৌতম বুদ্ধ’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় ।

ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম আন্তর্জাতিক মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে (১৯৫৯) জুরির আসন অলংকৃত করেন। সুচিত্রা সেনের মামা- শ্বশুর ছিলেন তিনি। বলা হয়, রমা নাম পালটে সুচিত্রা নাম দেন তিনিই। পরিচালক বাসু ভট্টাচার্য ছিলেন তাঁর জামাতা। বোম্বাই এর বলিউডকে তিনি বাঙালিটোলায় রূপান্তরিত করেন। সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক, হৃষিকেশ মুখার্জী, বাসু ভট্টাচার্য, কমল বসু, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ শিল্পী তাঁর হাত ধরেই বলিউডে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন ।

চলচ্চিত্র এক জটিল মিশ্র শিল্প মাধ্যম। এখানে চাম্পিয়ন হতে হলে বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী হতে হয়। সত্যজিৎ রায়কে বাদ দিলে তিনিই প্রথম সর্বগুণান্বিত চিত্র পরিচালক। তিনি অসাধারণ শিক্ষকও বটে। একথা মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছেন দিলীপ কুমার , নিরুপা রায় , বলরাজ সাহনি, অশোক কুমার, ধর্মেন্দ্র, কামিনী কৌশল প্রমুখ দিকপাল শিল্পী । শেষ জীবনে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয় তাঁকে।

স্বতন্ত্র ধারায় একের পর এক ছবি নির্মাণ করেও বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেছেন বিমল রায়। তাঁর অন্যতম আবিষ্কার দিলীপ কুমার বলেছেন — “আমাদের সময়ে অভিনয় শেখার কোন প্রতিষ্ঠান, স্কুল ছিলনা। কিন্তু বিমল রায়ের মত পরিচালকরা ছিলেন। তাঁর মোহন স্টুডিওর ভিতরের অভিনয় জীবন আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ করেছিল। এমনকি অভিনয়ের সময়েও , যখন আমি অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তখনো তাঁর কাছে আমি শিখেছি।”★

- Advertisement -
Latest news
Related news