Saturday, April 20, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল— ২০১ ।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
চিন্ময় দাশজগন্নাথ মন্দির, মোহনপুর
(মোহনপুর থানা, পশ্চিম মেদিনীপুর) ওড়িশায় তখন হরিচন্দন মুকুন্দদেবের শাসনকাল। ‘কর মহাপাত্র’ পদবীর এক সেনাপতি ছিলেন রাজার বাহিনীতে। বীরত্ব আর আনুগত্যের গুণে, সেনাপতিকে একটি জমিদারীতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুকুন্দদেব। ওড়িশার সরকার (পূর্বকালে জেলার তুল্য) জলেশ্বর  মেদিনীপুর জেলার লাগোয়া। সেখানেই পুরুষোত্তমপুর, কুরুলচৌর, বুড়াইচৌর ইত্যাদি পরগ্ণার অনেকগুলি মৌজা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল সেনাপতিকে।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

সেনাপতির নামটি আজ আর উদ্ধার করা যায় না। পুরী থেকে চলে এসে, বুড়াইচোর পরগণার মোহনপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন তিনি। পূর্বকালে এই জমিদার বংশটি ’ক্রৌড়ী’ উপাধিতে ভূষিত হোত। সেকালের হিসাব অনুসারে, ৫ পয়সায় হোত ১ দেম। ১ কোটি দেম-এর মালিককে ‘ক্রৌড়ী’ বলা হোত। উল্লেখ করা যায়, ইংরেজ শাসনকালে, এই বংশ ‘চৌধুরী’ খেতাব লাভ করেছিল। আজও তাঁরা ‘চৌধুরী বংশ’ নামে পরিচিত আছেন।
যাইহোক, কেউ কেউ বলেন, এই জমিদার বংশটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় ক্রৌড়ী। তাঁর দুই পুত্র—রামপ্রসাদ এবং লক্ষ্মণপ্রসাদ। যদিও, জমিদারবংশ রামপ্রসাদকেই তাঁদের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে মান্য করেন। রামপ্রসাদের পরবর্তী দুই পুরুষের নামোদ্ধার সম্ভব হয়নি। চতুর্থ পুরুষ ছিলেন স্বনামধন্য পরশুরাম ক্রৌড়ী। পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন ওড়িশা থেকে। জগন্নাথ ভাবনা ছিল তাঁদের রক্তে। সেকারণে, মোহনপুর গ্রামেই জগন্নাথ আরাধনার আকাঙ্ক্ষায়, একটি মন্দির গড়েছিলেন পরশুরাম।
মন্দিরের গর্ভগৃহে একটি উঁচু সিংহাসন। তাতে বলরাম, সুভদ্রা, জগন্নাথ-এর সুদর্শন তিনটি দারুমূর্তি অধিষ্ঠিত। তিন দেবতার প্রণাম মন্ত্র– “বলভদ্র জগন্নাথ সুভদ্রা চক্ররূপীণে। দারুব্রহ্ম স্বরূপায় চতুর্ধামূর্তয়ে নমঃ”।।
উঁচু প্রাচীরে ঘেরা বিশালাকার একটি প্রাঙ্গণের ভিতর মন্দিরটি স্থাপিত। এই মন্দিরের সংলগ্ন আরও কয়েকটি মন্দিরও আছে—১. উত্তরে লক্ষ্মীদেবীর আট-চালা মন্দির। ২. অগ্নিকোণের একটি আট-চালা মন্দিরে আছেন—সাবিত্রী এবং নৃসিংহদেব। ৩. অন্য একটি মন্দিরে আছেন বিমলা এবং মঙ্গলা দুই দেবী। ৪. একটি মন্দিরে তুলসী এবং মহাদেব শিব অধিষ্ঠিত। এছাড়া, ৫. প্রাঙ্গণটির চার কোণে চার মূর্তি মহাদেব বিরাজিত আছেন। এই দেবদেবীগণকে বলা হয় ‘বাহার দেওলা’ বা বাইরের দেউলের দেবতা।
মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা পরশুরাম-এর সময় থেকে, বিগত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত, জমিদার চৌধুরীবংশই মন্দিরের সেবাইত ছিলেন। পরবর্তীকালে, মন্দিরের পরিচালনার ভার মোহনপুর গ্রামবাসীদের হাতে গিয়েছে।
মন্দিরটিতে কোন প্রতিষ্ঠালিপি নাই। তবে, লক্ষ্মীদেবীর মন্দিরে লক্ষ্মীমূর্তির পায়ে, ওড়িয়া অক্ষরে, ‘১০৬০ সাল’ খোদাই করা আছে। সেটিকেই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা বাংলা সন হিসাবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ সন-তারিখের হিসাবে, বাংলা ১০৬০ সন, ১৫৭৫ শকাব্দ বা ইং ১৬৫৩ সালে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
পাতলা চাটি ইটে তৈরি মূল মন্দিরটি এক-রত্ন রীতির। বর্গাকার গর্ভগৃহের দৈর্ঘ-প্রস্থ ২৫ ফুট হিসাবে, উচ্চতা আনুমানিক ৬০ ফুট। ছাউনির চালার জোড়মুখগুলি বিষ্ণুপুরী রীতির। মাথার শিখর রত্নটিতে সপ্ত-রথ বিভাজন এবং পঞ্চদশ পীঢ়-ভাগ করা আছে।
নীচে গর্ভগৃহের সংলগ্ন মুগশালা, ভোগশালা, চন্দন অড়গলি—বেশ অভিনব। বেশ বোঝা যায়, ওড়িশী স্থাপত্যের গভীর প্রভাব এই মন্দিরের সর্বাঙ্গে।
মূল মন্দিরের সামনে, উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত, ২৫ ফুট উঁচু একটি আয়তাকার জগমোহন। মাথায় দো-চালা ছাউনি।
মন্দিরে অলঙ্করণ ছিল টেরাকোটার—নৌকাবিলাস, গোষ্ঠলীলা ইত্যাদি। বিষ্ণুর নাভিপদ্ম থেকে উদ্ভূত ব্রহ্মামূর্তি ফলকটি বেশ অভিনব।
অন্যান্য কিছু ফলকও আছে। যেমন—নৃত্যরতা দেবদাসীদের সারিবদ্ধ মূর্তি, অশ্বরোহী যোদ্ধা, জিপসী মূর্তি, বন্দীসহ রাজপুরুষ ইত্যাদি। দ্বারপাল ও নগরপালের কয়েকটি মূর্তি এবং পবন নন্দন হনুমানের মূর্তিও আছে।
সামনের বিশালাকার নাট্মন্দিরটি পরবর্তী কালের সংযোজন। দক্ষিণ ভারতের দুর্গ-মন্দিরের আদলে, উঁচু প্রাচীরে ঘেরা বিশাল প্রাঙ্গণ। মূল ফটকটিতেও দক্ষিণের ছাপ। সিংহমূর্তি, ময়ূর, দ্বারপাল ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হয়েছে জমকালো দেউড়িটিকে।
মোহনপুরের জগন্নাথের রথযাত্রার বিপুল খ্যাতি। ওড়িশা থেকেও দর্শক ও যাত্রী সমাগম হয়। মন্দির থেকে কিছু দূরে, একটি মাসীবাড়ি আছে এখানে।
সাক্ষাতকারঃ শ্রী অপু নারায়ণ কর মহাপাত্র — মোহনপুর।
পথ-নির্দেশঃ মেদিনীপুর, খড়গপুর, বালিচক কিংবা কাঁথি থেকে এগরা। সেখান থেকে শোলপাট্টাগামী পথে, ১৬ কিমি দূরত্বে, মোহনপুর।

- Advertisement -
Latest news
Related news