Tuesday, April 16, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল- ১৮৪।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
চিন্ময় দাশরঘুনাথ মন্দির, শ্রীধরপুর
দাসপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

আমোদর, কানা, কংসাবতী, কেঠিয়া, ঝুমি, তারাজুলি, দ্বারকেশ্বর, রত্নাকর, রূপনারায়ণ, শঙ্করী, শিলাবতী—বাংলা বর্ণমালায় সাজানো, এগুলি হোল ছোট বড় কতকগুলি নদীর নাম। এর সাথে আছে অসংখ্য খাল আর নালাও। সেই কোন আদিকাল থেকে ঘাটাল মহকুমার ভূভাগ সিক্ত হয়েছে এগুলির জলধারায়।

এগুলির সুবাদে, সুদীর্ঘকাল থেকে উর্বর পলিমাটি সমৃদ্ধ হয়েছিল চেতুয়া, বরদা, চন্দ্রকোণা ইত্যাদি পরগ্ণাগুলি। এলাকার অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়েছিল কৃষিজ পণ্যের সুবাদে।
কেবল কৃষি নয়, পরিবহনের কাজও সুগম হয়েছিল জলপথগুলির সুবাদে। যাতায়াত আর পণ্য পরিবহনের উপায় ছিল এগুলি। কেবল আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নয়, শিলাবতী আর রূপনারায়ণের বুক বেয়ে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত যোগাযোগের সুযোগ ছিল এই এলাকার।
পূর্বকাল থেকে কৃষিজ পণ্যের চালানি ব্যবসা এই মহকুমার অর্থনীতিকে পুষ্ট করত। পরে, মেদিনীপুর জেলার এই পূর্ব এলাকায়, নীল-চাষ আর রেশম শিল্পের বিকাশ হয়েছিল এক সময়। তার টানে ওলন্দাজ, আর্মেনিয়, ফরাসি বা ইংরেজ বণিকের দল এসে ভীড় করেছিল এই ঘাটাল মহকুমায়।
পণ্য পরিবহনের জন্য, রূপনারায়ণের জলপথকে ব্যবহার করেছিল বিদেশীরা। ‘হোর মিলার কোম্পানি’, বা ‘দি ঘাটাল স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি’ খুলে, স্টিমার চলাচলের প্রচলন করেছিল তারা। প্রবীনদের মুখে আজও সেসকল কোম্পানির নাম শোনা যায়।
নীলচাষ, রেশমশিল্প আর জলপথ পরিবহন—এই তিনের রাজযোটকে বিপুল আর্থিক উন্নয়ন হয়েছিল এই এলাকার। বিদেশী বণিকদের সাথে সাথে, স্থানীয় বহু ব্যক্তি আর পরিবারও বিশেষ অর্থসম্পন্ন হয়ে উঠেছিল। ছোট-বড় জমিদারিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ধনবানদের অনেকেই।
সেকালের চেতুয়া পরগণা, বা পরবর্তী কালের দাসপুর থানা জুড়েও, বহু সম্পন্ন পরিবারের উদ্ভব হয়েছিল। এই থানার শ্রীধরপুর গ্রামের সামন্ত পরিবারও সেই ধনবান পরিবারগুলির অন্যতম একটি।
সেসময় নিম্নবঙ্গে, সারা মেদিনীপুর জেলা জুড়ে, শ্রীচৈতন্যদেব প্রচারিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের গভীর প্রভাব। সামন্তবংশও তাতে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ভগবান বিষ্ণুকে আরাধ্য করেছিলেন। কুলদেবতা রঘুনাথ জীউ-এর জন্য একটি সুদর্শন মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁরা।
মন্দিরে কোন প্রতিষ্ঠালিপি নাই। ক্ষেত্রসমীক্ষার সময় সামন্তবংশের প্রবীনদের কাছ থেকে জানা গিয়েছে, তাঁদের পূর্বপুরুষ, এই বংশের জনৈক রামমোহন সামন্ত মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
দক্ষিণ্মুখী ইটের মন্দিরটি পঞ্চ-রত্ন রীতিতে নির্মিত হয়েছে। ভিত্তিবেদিটি বেশ উঁচু। মন্দির দক্ষিণমুখী হলেও, মন্দিরে উঠবার সিঁড়িটি রচিত হয়েছে পূর্বদিকে।
প্রথমে খিলান-রীতির তিনটি দ্বারপথ পার হয়ে, একটি সঙ্কীর্ণ অলিন্দ। স্তম্ভগুলি ৮টি করে গোলাকার থামের গুচ্ছ। অলিন্দের ভিতরের ছাদ বা সিলিং হয়েছে টানা-খিলান রীতিতে।
অলিন্দটির পিছনে গর্ভগৃহ। একটিই দ্বারপথ তাতে। গর্ভগৃহের সিলিং হয়েছে দু’দিকে খিলানের মাথায় গম্বুজ স্থাপন করে। বাইরে পাঁচটি রত্ন। সেগুলিতে কলিঙ্গশৈলীতে রথ-ভাগ করা হয়েছে।
সামন্তবংশের এই রঘুনাথ মন্দিরের গরিমা এর অলঙ্করণের কারণে। সামনের দেওয়াল জুড়ে টেরাকোটা ফলক সাজানো। ফলকের মোটিফ নির্বাচিত হয়েছে মূলত রামায়ণ এবং কৃষ্ণকথা থেকে।
রামায়ণ কাহিনী থেকে, দুটি ফলক বিশেষভাবে উল্লেখ করবার মত— ১. লক্ষণের শক্তিশেল ও হনুমানের গন্ধমাদন পর্বত আনয়ন। আর, ২. কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ।
কৃষ্ণকথা থেকে অনেকগুলি ফলক আছে—১. শিশুকৃষ্ণ কর্তৃক পুতনা রাক্ষসী বধ, ২. গোপিনীগণের সাথে শ্রীকৃষ্ণের ঝুলন যাত্রা, ৩. শ্রীরাধিকার ন’জন সখীর সমাহারে ‘নবনারীকুঞ্জর’ রচনা, ৪. ১টি রাসমণ্ডলচক্র, ৫. দধিভাণ্ড বহনরত গোপ ইত্যাদি।
সামাজিক বিষয় নির্ভর ফলকও আছে মন্দিরে— ১. বৃদ্ধের কাঁধে বৃদ্ধাকে বহন, ২. শিশুসন্তান কোলে জননী, ৩. অশ্বারোহী শিকারীর বাঘ শিকার।
পঙ্খের তেমন কোন কাজ নাই এখানে। তবে, পশ্চিমের দেওয়ালে ব্যাদিত-বদন দুটি সিংহমূর্তি রচিত আছে।
বিশেষভাবে উল্লেখের বিষয় হোল, এই মন্দিরের দরজার পাল্লায় দারুতক্ষণ বা কাঠখোদাই কাজ। সারা জেলায় এর কোন তুলনা নাই। দুটি পাল্লা জুড়ে বড় বড় প্যানেলে কতকগুলি ফলক লাগানো হয়েছে।
লঙ্কাযুদ্ধে রত রাম এবং রাবণের ২টি পৃথক ফলক, কদম্বতলে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানি, ঘোড়ায় চড়া শিকারীর বাঘশিকার ইত্যাদি। ২টি ফলকের কথা বিশেষভাবে বলা যায়—একটি হোল ষড়ভূজ গৌরাঙ্গ মূর্তি এবং অপরটি একটি মিথুনদৃশ্য। সারা জেলায় কাঠখোদাই কাজে এই দুটির অন্য কোথাও দৃষ্টান্ত নাই।
সাক্ষাৎকারঃ সর্বশ্রী নীহার রঞ্জন সামন্ত, সমীর সামন্ত, সুশান্ত সামন্ত, প্রদীপ সামন্ত, তিমির বরণ সামন্ত—শ্রীধরপুর।
সহযোগিতাঃ রিমা সামন্ত– শ্রীধরপুর।
পথনির্দেশঃ পাঁশকুড়া স্টেশন থেকে ঘাটালগামী পথের বেলতলা স্টপেজ। সেখান থেকে পূর্বমুখে কিমি তিনেক দূরে শ্রীধরপুর গ্রাম। গ্রামের সামন্তপাড়ায় সুদর্শন মন্দিরটি অবস্থিত।

- Advertisement -
Latest news
Related news