Tuesday, April 16, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১৭৩।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণালচিন্ময় দাশ
লক্ষ্মীজনার্দন মন্দির, আজুড়িয়া                     (দাসপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর)

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

মেদিনীপুর জেলার পূর্ব সীমানার অনেকখানিই রূপনারায়ণ নদের জলরেখা দিয়ে তৈরি। চেতুয়া-বরদা পরগ্ণা দুটি সেই নদের তীর ঘেঁষা। এক সময় তার অধিপতি ছিলেন জনৈক শোভা সিংহ। শৌর্যে বীর্যে স্বাধীনতাপ্রিয়তায় ইতিহাসে তিনি ‘বাংলার শিবাজী’ নামে চিহ্নিত হয়েছিলেন।
প্রজাকল্যাণেও প্রভূত কাজ করেছিলেন শোভা। পথ-ঘাট নির্মাণ, নদী-নালা-খাল সংস্কার, পুষ্করিণী খণন ইত্যাদি তার ভিতর উল্লেখযোগ্য।
শোভার অধীনে উল্লেখযোগ্য একজন পত্তনিদার ছিলেন দাসপুর মহালের বঙ্গরাম চৌধুরী। শোভা এবং বঙ্গরামের উদ্যোগে, গ্রামীণ হস্তশিল্পের প্রভূত বিকাশ হয়েছিল। রেশম শিল্পও বিশেষ বিস্তারলাভ করেছিল সেসময়। উৎপাদিত পণ্যের বেচাকেনার জন্য হাটের পত্তন করা হয়েছিল।
রূপনারায়ণ, শিলাবতী আর কংসাবতী—তিন নদীর জলপথের সুবাদে, ব্যবসা-বাণিজ্যে আমদানি-রপ্তানির পথ বেশ বিস্তৃত। আর্মেণীয়, ওলন্দাজ ফরাসি আর ইংরেজ বণিকের দল এসে ঘাঁটি গেড়েছিল এই এলাকায়। জলপথ পরিবহনের অনেক উন্নতি সাধন করেছিল সেই বিদেশি বণিকের দলও। দাসপুর থানার গ্রামীণ অর্থনীতি পুষ্ট হতে পেরেছিল এসবের সুবাদে।
ছোট-বড় নানা মাপের জমিদারের মত, বেশ কিছু সম্পন্ন গৃহস্থেরও উদ্ভব হয়েছিল সেসময়। দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এঁদের অনেকেই। ‘চরণ’ পদবীর তেমনই একটি বর্ধিষ্ণু পরিবারের বসবাস ছিল আজুড়িয়া গ্রামের পূর্বপাড়ায়।
উনিশ শতকের শেষ পর্ব শুরু হয়েছে তখন। পূর্বকাল থেকে দুটি শিব মন্দির প্রতিষ্ঠিত ছিল চরণবংশে। জনৈক ভজহরি চরণ তখন পরিবারের কর্তা। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে অবগাহন করেছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষটি। বিষ্ণুর আরাধনায় ব্রতী হয়েছিলেন নতুন করে।
ভজহরি লক্ষ্মীজনার্দন নামের শালগ্রাম শিলা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কুলদেবতা হিসাবে। নব-রত্ন রীতির একটি সুদর্শন মন্দির, আর তার সাথে অলঙ্কৃত একটি রাসমঞ্চও স্থাপন করেছিলেন দেবতার জন্য।
একটি প্রতিষ্ঠালিপি আছে মন্দিরে। তার বয়ান থেকে জানা যায়, মন্দিরটি ১৭৯৩ শকাব্দ বা ১২৭৮ বঙ্গাব্দে নির্মিত হয়েছিল। সাল-তারিখের হিসাবে অনুসারে, দেড়শ’ বছর আয়ু হয়েছে, ইং ১৮৭১ সালে তৈরি এই মন্দিরের।
ইট-চুন-সুরকির পূর্বমুখী মন্দির। নব-রত্ন হিসাবে নির্মিত। উপর ও নীচের দুটি তলেই, সামনে ৮টি করে কলাগেছ্যা-রীতির গুচ্ছ-থাম আর দরুণ-রীতির খিলানের তিনটি দ্বারপথ যুক্ত একটি অলিন্দ। পিছনের গর্ভগৃহটি একদ্বারী। একটি সিঁড়ি আছে দ্বিতলে উঠবার।
রত্নগুলি কলিঙ্গশৈলী অনুসরণ করে নির্মিত। সেগুলির বেদী, বাঢ়, গণ্ডী—তিন অংশ জুড়ে রথ-বিভাজন করা। দ্বিতলের রত্নগুলিতে ত্রি-রথ এবং প্রথম তলের চারটি ও কেন্দ্রীয় রত্নে পঞ্চ-রথ বিন্যাস। ন’টি রত্নেরই গণ্ডী অংশ পীড় বিভাজন করা। এই দুটি কাজের ফলে, সুন্দর লাবণ্যময় হয়ে উঠেছে মন্দিরটি।
মন্দিরে স্নিগ্ধ সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছে টেরাকোটার ফলক বিন্যাস করে।
ফলকের মোটিফ নেওয়া হয়েছে পুরাণকথা, কৃষ্ণলীলা, রামায়ণ, মঙ্গলকাব্য আর সামাজিক বিষয় থেকে। মন্দিরে মন্দিরে পুরাণকথার বহুল ব্যবহৃত ফলক হোল ভগবান বিষ্ণুর দশাবতার রূপ। এই মন্দিরেও, সেটি রূপায়িত হয়েছে। কৃষ্ণ্লীলা থেকে পুতনা রাক্ষসী বধ, গোপিনীদের বস্ত্রহরণ, কৃষ্ণের দ্বারকাযাত্রা ও সে সংবাদ শুনে গোপিনীদের মূর্ছা প্রাপ্তি ইত্যাদি। রামায়ণ থেকে রাবণের সীতাহরণ, জটায়ুর যুদ্ধ, কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ ইত্যাদি। মঙ্গলকাব্য থেকে একটি ফলক আছে, সেটি কমলে কামিনী দর্শন। কয়েকটি ফলক আছে সামাজিক বিষয় থেকেও—মৃদঙ্গ বাদনরত কীর্তনীয়া, রাজপুরুষ, মুক্তবক্ষ লোলচর্ম বৃদ্ধা, সিংহের গাভী আক্রমণ, শিকারীর সিংহ শিকার ইত্যাদি।কয়েকটি ফলকের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার—১. দুটি দ্বারবর্তিনী মূর্তি। ভিনীশীয় রীতির অর্ধোন্মুক্ত দরজার প্রান্তে দাঁড়ানো। মূর্তি দুটির পরিধানে ঘাগরা-চোলি, পায়ে অলঙ্কার হিসাবে মল। একটির হাতে চামর, অন্যটির হাতে শঙ্খ। মূর্তি দুটি রচিত হয়েছে গর্ভগৃহের প্রবেশদ্বারের দু’পাশে।
২. দুটি দ্বারপাল মূর্তিও আছে। কিন্তু হাতে কোন অস্ত্র-শস্ত্র নাই। ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমায় দাঁড়ানো, দুটি মূর্তিই মালাজপরত।
৩. মন্দিরের দ্বিতল অংশে, উত্তরের দেওয়ালে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বরের তিনটি দেবমূর্তি। এগুলি স্টাকোর কাজ।
৪. সুন্দর একটি রাসমণ্ডল চক্র।
১০ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের একটি নব-রত্ন রাসমঞ্চ আছে দেবতার। উচ্চতা আনুমানিক ২৫ ফুট। ন’টি চুড়াই ‘বেহারী রসুন’ রীতির।
উঁচু বেদীর উপর স্থাপিত মঞ্চে আটটি স্তম্ভের সাহায্যে রচিত আটটি দ্বারপথ। প্রত্যেক দ্বারপথের দু’পাশে দু’টি করে দণ্ডায়মান বাদিকামূর্তি। সকলের হাতেই বেহালা, বীণা, মৃদঙ্গ, খঞ্জনী ইত্যাদি।
মূর্তি সন্নিবেশ করা হয়েছে দ্বারপথগুলির মাথায় আটটি প্যানেলেও। তার ভিতর অর্জুনের লক্ষ্যভেদ দৃশ্যটি উল্লেখ করবার মত। এছাড়াও, পৃথক পৃথক প্যানেলে কৃষ্ণ, রাধা, গো-পালক, গাভী দোহন ছাড়া, কয়েকটি মিথুন ফলকেরও সন্নিবেশ হয়েছে।
মন্দিরটি ভারি সযত্ন রক্ষিত। তবে, জীর্ণতার গ্রাস শুরু হয়েছে মন্দিরে।
সাক্ষাৎকারঃ সর্বশ্রী সুদর্শন চরণ, সুধাংশু শেখর চরণ, সুরজিৎ চরণ—আজুড়িয়া।
পথনির্দেশঃ পাঁশকুড়া স্টেশন থেকে ঘাটাল্মুখী রাস্তায় গৌরা। সেখান থেকে পূর্বমুখে পলাশপাই খালের পাড় ধরে, আজুড়িয়া ঢালে পৌঁছে, সামান্য উত্তরে মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news