Saturday, April 20, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল— ১৬১।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
চিন্ময় দাশরঘুনাথ মন্দির, চক শ্রীকৃষ্ণ                    (পটাশপুর, পূর্ব মেদিনীপুর)পটাশপুর থানায় পঁচেটগড় জমিদারী মেদিনীপুর জেলায় বিশেষ পরিচিত নাম। কয়েকশ’ বছরের শাসনকাল তাঁদের। সুশাসনের জন্য, নবাব দরবার থেকে ‘চৌধুরী’ খেতাব পেয়েছিল এই বংশ। মার্গ সিঙ্গীতের চর্চায় বিশেষ খ্যাতি ছিল এই বংশের। মল্লভূমি বিষ্ণুপুরের পরেই এঁদের নাম করা হয়।
এক সময় মারাঠা শক্তি বর্গী বাহিনীর আধিকারে গিয়েছিল পটাশপুর পরগ্ণা। উনিশ শতকের গোড়াতেও সেই অবস্থা বহাল ছিল। ১৮০৩ সালে দ্বিতীয় মারাঠা যুদ্ধে, পরগ্ণাটি মারাঠাদের হাত থেকে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অধিকারে এসেছিল। সেসময়ে জমিদার ছিলেন চৌধুরানি রেণুকা দেবী। কোম্পানি তাঁর সাথেই চিরস্থায়ী বন্দোস্ত করেছিল।
পঁচেটগড় জমিদারবংশের পত্তন হয়েছিল জনৈক কালা মুররী মোহন দাস মহাপাত্রের হাতে। ওভিশা রাজ্যের পুরী জেলার রথিপুর গ্রাম থেকে মেদিনীপুর জেলায় এসেছিলেন তিনি। পার্সীভাষায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তাম্রলিপ্ত বন্দরে বিদেশি বণিকদের সাথে কাজ করতেন। তা থেকেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন।
লক্ষ্মী চিরকালই চঞ্চলা। তাই, সম্পদ থেকে সম্পত্তি করেছিলেন কালা মুরারী। বেশ বড় মাপের একটি জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। সেকালে পটাশপুর পরগণা গঠিত ছিল ১৮টি মহাল নিয়ে। তার ভিতর দেহাত গোকুল্পুর ছিল সবচেয়ে বড়। সেই মহাল তাঁর অধিকারে ছিল।
এসকল বৈষয়িক কথা আর নয়। এখন বরং মন্দিরের বিষয়ে আলোচনা করা যাক। একবার জমিদারী মহাল পরিক্রমার সময় একটি শিবলিঙ্গ উদ্ধার করেছিলেন কালা মুরারী। সেই মূর্তির সাথে, আরও চারটি শিবলিঙ্গ যোগ করে, একটি মন্দির গড়ে, পাঁচটি বিগ্রহ স্থাপন করেছিলেন। পঞ্চ ইষ্ট প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা থেকেই গ্রামের নাম হয়েছিল—পঁচেট।
চৈতন্যদেব জগন্নাথক্ষেত্র পুরী গমণের সময়, প্রথম বার পটাশপুর থানার উপর দিয়ে গিয়েছিলেন। গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের বিপুল প্রভাব পড়েছিল সমগ্র থানা জুড়ে। বিষ্ণু আর রাধাকৃষ্ণ আরাধনার ঢেউ বয়ে গিয়েছিল সমগ্র পরগণা জুড়ে। জমিদারবংশও তার অনুসারি হয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণকে বরণ করেছিল কুলদেবতা হিসাবে। বিশাল আকারের একটি শিখর দেউল নির্মাণ করা হয়েছিল ‘কিশোররায়জীউ’র জন্য।
পঁচেটগড়ের এই জমিদারবংশের খ্যাতি কেবল সঙ্গীত নাটক চর্চার জন্য নয়। ধর্মাচরণও ছিল এই বংশের আর এক বৈশিষ্ট। নিজেরা পূজার্চনা করেই ক্ষান্ত থাকেননি জমিদাররা। প্রজাবর্গও যাতে দেবসেবার সুযোগ পান, সেজন্য নিজেদের মহালের বিভিন্ন স্থানে দেবালয় গড়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। বর্তমান আলোচ্য চক শ্রীকৃষ্ণ গ্রামের রঘুনাথ মন্দিরটি তাঁদেরই হাতে গড়া একটি মন্দির।
ওড়িশী শৈলীর শিখরদেউল রীতিকে অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছে মন্দিরটি। তবে, সামনের জগমোহন এবং পিছনের বিমান—দুটি সৌধই বাংলা চালা-রীতিতে নির্মিত হয়েছে। জগমোহনটি চার-চালা আর বিমান আট-চালা রীতির। দ্বারপথগুলি খিলান-রীতিতে নির্মিত হয়েছে। শীর্ষক বা চুড়া দুটিতে বেঁকি, আমলক, কলস, বিষ্ণুচক্র শোভিত।
কার্ণিশের নীচে, একটি টানা প্যানেলে, মাঝখানে সিদ্ধিদাতা গণেশের বড় মূর্তি রেখে, দু’দিকে মহাদেব, পার্বতী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিকেয় প্রমুখের এক সারি মূর্তি রচিত আছে। মুর্তিগুলি ‘বা-রিলিফ’ রীতির। এছাড়া, তেমন কোন অলঙ্করণ নাই।
মন্দিরের পা-ভাগ এবং বন্ধন অংশের গড়ন চোখে পড়বার মতো। ওড়িশীয় শৈলীতে নির্মিত একটি তুলসিমঞ্চও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
রঘুনাথ নামের শালগ্রাম শিলা পূজিত হন মন্দিরে। এছাড়াও আছে রাধা-কৃষ্ণের চারটি যুগলমূর্তি। এবং এক মূর্তি বালগোপালও। এক সময় ঘটা করে পূজার আয়োজন হত মন্দিরে। বিশেষ আড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হত জন্মাষ্টমী, রাধাষ্টমী, ঝুলন, দোল, রাসযাত্রা ইত্যাদি। কিন্তু জমিদারী উচ্ছেদের পর পরই, সেসকল একে একে অন্তর্হিত হয়ে যায়। ভয়ানক সঙ্কটের সূচনা হয়েছিল। দেবোত্তর জমিজমা সবই প্রায় বেহাত হয়ে গিয়েছিল রাজনেতিক ডামাডোলে। ধূপ-দ্বীপটিও আর জ্বলত না মন্দিরে।
অত্যন্ত সুখের কথা, প্রায় এক দশক আগে থেকে মন্দিরটিকে রক্ষার একটি প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। এই কাজে এগিয়ে এসেছিলেন গ্রামেরই অধিবাসী মানস জানা। পরে পরে ধর্মপ্রাণ ও উদ্যমী এই মানুষটির সাথে আর কয়েকজন গ্রামবাসীও এসে যোগ দিয়েছিলেন। দেখা যায়, সেই উদ্যোগের ফলে, মন্দিরে দেবতার পূজার্চনাগুলি আবার শুরু হয়েছে। স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা হয়েছে পুরোহিতের। একদিন নমো নমো করে পূজাটুকুও হোত না যে মন্দিরে, সেখানে এখন নিত্য দু’বেলা অন্নভোগ নিবেদন করা হয় দেবতাকে। তার কারণে, চক শ্রীকৃষ্ণ বা কাজলা গ্রাম তো বটেই, আশপাশের গ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষজনও, নতুন করে মন্দিরমুখী হয়ে উঠছেন। আবারও ভক্ত সমাগমের সূচনা হয়েছে দেবালয়টিতে।
কিন্তু প্রাচীন এই মন্দিরটিকে পূর্বের গরিমায় ফিরিয়ে নিতে আরও বেশি প্রয়াস দরকার। একক উদ্যোগে তা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আরও সহযোগিতার। দেবোত্তর জমি আছে রঘুনাথজীউর। কিন্তু সেগুলি অনাবাদী। সেখানে বনসৃজন করা যায়। তার উপসত্ত্ব থেকে অর্থাগম হতে পারে। উন্নয়নের কাজে লাগতে পারে সেই অর্থ। গ্রামের ঢালাই রাস্তা থেকে, দেবালয়টিতে পৌঁছুবার রাস্তাটির উন্নতি করাও জরুরি প্রয়োজন। পঁচেটগড়ের জমিদারবাড়িকে ঘটা করে ‘হেরিটেজ’ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদেরই প্রতিষ্ঠিত মন্দিরসৌধটির দিকে কারও দৃষ্টি নাই।
প্রাচীন মন্দির মাত্রেই একটি জাতির ঐতিহ্য সম্পদ। তাকে রক্ষার দায় আমাদের সকলের। জীর্ণ এই দেবালয়টিকে সুরক্ষা এবং উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, কোন অরাজনৈতিক বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা ব্যক্তিবিশেষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন, এমনই প্রত্যাশা করি আমরা।
সাক্ষাতকারঃ শ্রী মানস জানা—চক শ্রীকৃষ্ণ, পটাশপুর।
পথনির্দেশঃ ডেবরা বাজার, বালিচক স্টেশন, বাজকুল কিংবা এগরা—যে কোনও দিক থেকে পটাশপুর পৌঁছে, কিমি দেড়েক পশ্চিমে চকশ্রীকৃষ্ণ গ্রাম এবং রঘুনাথের এই মন্দির।
মন্দিরের ভৌমিক অবস্থান—২২.০১৪২ / ৮৭.৫১৭৪।

- Advertisement -
Latest news
Related news