Sunday, April 14, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল – ১৫৩।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল চিন্ময় দাশ
পঞ্চেশ্বর শিব মন্দির, পঁচেটগড় (পটাশপুর, পূর্ব মেদিনীপুর)

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

পঁচেটগড়—নিম্নবঙ্গে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চার এক তীর্থভূমি। মেদিনীপুর জেলায় একমাত্র রাজবাড়ি, সঙ্গীতচর্চায় বিষ্ণুপুরের পরেই যার দেশজোড়া খ্যাতি। ইংরেজ আমলেও, দীর্ঘদিন মারাঠাশক্তি বা বর্গীদের অধীনে থেকেছে এই রাজবাড়ি।
মহাদেব শিব হলেন তাঁদের ইষ্টদেবতা। জমিদারী প্রতিষ্ঠার সময়েই, গড়হাভেলির ভিতরে প্রাচীন শিবলিঙ্গ পেয়ে, মন্দির প্রতিষ্ঠা করে, পূজার প্রচলন করেছিলেন জমিদার। পরবর্তী কালে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে, শ্রীকৃষ্ণকে কুলদেবতা হিসাবে বরণ করেছিল এই রাজবাড়ি। কিন্তু শিবের সেবাপূজায় ঘাটতি হয়নি কোন দিন। মন্দিরটিও বেশ সযত্ন রক্ষিত। আজকের জার্ণালে এই পঞ্চ শিব আর তাঁর দেবালয়টিকে নিয়ে কয়েকটি কথা।
পঁচেটগড় জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জনৈক কালামুরারী দাস মহাপাত্র। তাঁর আদি নিবাস ছিল ওড়িশা রাজ্যের পুরী জেলার রথিগ্রাম। ভাগ্যসন্ধানে সেখান থেকে তিনি বাংলায় চলে আসেন। ফার্সি ভাষায় সুদক্ষ ছিলেন কালা মুরারী। সেই সুবাদে, তাম্রলিপ্ত এলাকায় বিদেশি বণিকদের এজেন্ট হিসাবে কাজ করতেন। তা থেকে প্রভূত অর্থাগম হোত তাঁর।
মোগল আমলের প্রতাপভান, ভোগরাই, কামার্দাচৌর এবং দেহাৎ গোকুলপুর– চারটি পরগণা কিনে, নিজের জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কালামুরারী। পঁচেটগড় হয়েছিল তাঁর রাজধানি।
জঙ্গল হাসিল করে অট্টালিকা তৈরির সময়, প্রাচীন কালের একটি শিব মন্দিরের ভিত্তিবেদী এবং সুদর্শন একটি শিবলিঙ্গও দেখা গিয়েছিল। সেদিনই মহাদেবের স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন জমিদার– মন্দির গড়ে, বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয় যেন।
দেবতার আদেশ অমান্য করেননি কালামুরারী। দক্ষিণ ভারতীয় রীতিতে, একটি দুর্গ-মন্দির (ফোর্ট টেম্পল) গড়েছিলেন। চোখে পড়বার মতো উঁচু ভিত্তিবেদী। মজবুত প্রাচীর দিয়ে ঘিরেছিলেন বেদীটিকে। তার ভিতরে অঙ্গণের একেবারে মাঝখানটিতে মূল মন্দিরটি স্থাপিত। প্রাচীরের চার কোণে তৈরি করেছিলেন আরও চারটি মন্দির। শিবলিঙ্গ আনিয়েছিলেন একেবারে কাশীধাম থেকে। পঞ্চ-শিব প্রতিষ্ঠা করায়, তা (পঞ্চ+ইষ্ট+গড়) থেকেই নাম হয়েছিল—পঁচেটগড়।
এই বংশের পঞ্চম পুরুষের জমিদার ছিলেন নিত্যানন্দ। তিনি নবাব দরবার থেকে “চৌধুরী” খেতাব পেয়েছিলেন। পরে কিন্তু এই বংশ বৈষ্ণবীয় রীতিতে দেবার্চনার অনুসারী হয়েছিল। শিখর-দেউল রীতির কিশোররায় জীউর মন্দির, দালান-রীতির দোল মন্দির, শিখর-রীতির মহাপ্রভু মন্দির এবং রত্ন-রীতির একটি শীতলা মন্দিরও নির্মাণ করা হয়েছে জমিদারদের পক্ষ থেকে। সেসকল মন্দিরের কথা পৃথক জার্নালে জানাব আমরা।
পঞ্চেশ্বরের আলোচ্য এই মন্দিরসৌধটি শিখর-দেউল রীতির। উঁচু পাঁচিলে ঘেরা অঙ্গণের ভিতর চার দিক জুড়ে টানা অলিন্দ। তাতে সাধু-সন্ত, যাত্রীদের বিশ্রামাগার। সেই অলিন্দের চার কোণে চারটি মন্দির। প্রত্যেকটির গর্ভগৃহে একটি করে শিবলিঙ্গ স্থাপিত– চন্দ্রশেখর শিব, গঙ্গাধর শিব, নীলকন্ঠ শিব এবং পশুপতি শিব। পঞ্চশিবকে নিয়েই, কেন্দ্রীয় মন্দিরের বিগ্রহের নাম—পঞ্চেশর মহাদেব।
এছাড়াও, উত্তরের অলিন্দে আরও একটি পৃথক মন্দির আছে। সেখানে নারায়ণ প্রতিষ্ঠিত আছেন। সে বিষয়ে পরে আলোচন করব আমরা।
পাঁচটি মন্দিরই কলিঙ্গশৈলীর শিখর রীতির একক সৌধ। প্রতিটিই পঞ্চরথ বিভাজন করা। মাথায় বেঁকি, আমলক, পিতলের রাজকীয় কলস আর ত্রিশূল।
ন’ধাপ সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠতে হয় মন্দিরে। তিনটি খিলানে তৈরি হয়েছে উঁচু সিঁড়িটি। মন্দিরে ঢোকার মূল ফটকটি দ্বিতল বিশিষ্ট। ফটকের মাথায় একটি উন্মুক্ত কক্ষ। সেটি চতুর্দ্বারী—প্রকৃতপক্ষে সেটি নহবতখানা। তার ছাউনির চালার জোড়মুখগুলি বিষ্ণুপুরী রীতির।
সমগ্র সৌধটিতে অলঙ্করণের উল্লেখযোগ্য কোন কাজ নাই। কিছু নিদর্শন আছে পঙ্খ এবং স্টাকোর কাজের। তবে মন্দিরটির গম্ভীর রাজকীয় গড়ন চেয়ে দেখবার মতো।
সাক্ষাৎকার(২০১৫ সালে)ঃ সর্ব চৌধুরী পিনাকী নন্দন দাস মহাপাত্র, দিলীপ নন্দন দাস মহাপাত্র, রবীন্দ্র নন্দন দাস মহাপাত্র, সুব্রত নন্দন দাস মহাপাত্র, শ্রীমতি অপর্ণা দাস মহাপাত্র, শ্রীমতি ঋতুপর্ণা দাস মহাপাত্র—পঁচেটগড় ও শান্তিনিকেতন।
পথনির্দেশঃ মেদিনীপুর-দীঘা রাস্তার এগরা থেকে ৩ কিমি উত্তরে পঁচেটমোড়। এছাড়া, কলকাতা-দীঘা রুটের বাজকুল থেকে পশ্চিমে, কিংবা মুম্বাই রোডের ডেবরা বা বালিচক স্টেশন থেকে দক্ষিণে, এগরা মুখী রাস্তায় পঁচেটমোড়। এবার ৩ কিমি পূর্বে জমিদারবাড়ি ও মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news