Tuesday, April 16, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১৮৫।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
চিন্ময় দাশশ্রীশ্রীরাধাবল্লভজীউ মন্দির,
তালবান্দি,ডেবরা
(পশ্চিম মেদিনীপুর) কংসাবতী নদীর কোল ঘেঁষে, পূর্বকালের কুতবপুর পরগণার একটি গ্রাম তালবান্দি। একসময়ের খ্যাতনামা স্থপতি ঠাকুরদাস শীলের হাতে গড়া ছোট একটি মন্দির আছে সেই গ্রামে।
মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এক বৈষ্ণব গুরুদেব। সেই গুরুদেবের জীবন কাহিনী আবর্তিত হয়েছে দুরাচারী আর সদাচারী—দুই জমিদারের হাতে। গুরুদেবের জীবনের বহু কাহিনীই আজও কিংবদন্তির আকারে মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
দুটি একটি কাহিনী শুনে নেওয়া যেতে পারে।
কাহিনী এক— বর্তমানের মেদিনীপুর ব্লক বা অতীতের কর্ণগড় রাজ্যটি ছিল ভঞ্জভূম পরগণার অধীন। ভঞ্জভূমের এক রাজা একবার পণ্ডিতদের একটি সভা ডেকেছিলেন। সেই সভায় হাজির হয়েছিলেন কিশোরীবল্লভ নামের এক ব্রাহ্মণও।
নিষ্ঠা এবং পাণ্ডিত্যের কারণে, বিশেষ খ্যাতি ছিল মানুষটির। তাঁকে পরীক্ষার জন্য, একটি দুষ্কর্ম করেছিলেন রাজা। ব্রাহ্মণের জন্য নির্দিষ্ট তামাক সেবনের হুঁকোতে, গোপনে সুরা ভরে দিয়েছিলেন তিনি। রাজার চাতুরিতে বিরক্ত হয়ে, ব্রাহ্মণ তামাকু সেবনে অসম্মত হন। বিস্মিত রাজা কারণ জানতে চাইলে, ব্রাহ্মণের উত্তর ছিল—“দুগ্ধ অতি পবিত্র জিনিষ। সেবসেবারও উপাদান। কিন্তু তাম্বুল সেবনে দুগ্ধ অতি অপ্রয়োজনীয় বস্তু।“ পুরো সভামণ্ডলী বিস্মিত ও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
রাজা প্রশ্ন করেছিলেন—হুঁকোতে দুধই আছে, প্রমাণ করতে পারবেন আপনি?তার উত্তরে একজন গোয়ালা ডাকতে বলেছিলেন ব্রাহ্মণ। তার পরের ঘটনা অভাবনীয়। হুঁকোর তরল ঢেলে মুইতে লাগলেন গোয়ালা। তা থেকে মাখন পাওয়া গেল। ঘিও পাওয়া গিয়েছিল মাখন জ্বাল দিয়ে।
ধন্য ধন্য করে উঠেছিল সভামণ্ডলী। মাথা নত করে বসেছিলেন রাজামশাই।
ধীর পদক্ষেপে সভা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন স্থিতধী কিশোরী মোহন। কেবল সভা ছেড়ে নয়, ইষ্টদেবতার বিগ্রহটুকু নিয়ে, দুরাচারী রাজার ভঞ্জভূম পরগণা ছেড়েই চলে গেলেন তিনি।
পূর্বমুখে চলতে চলতে এসে পড়লেন কাপাসটিকরী নামের এক গ্রামে। পূর্বমুখী কংসাবতী সেখানে ভাগ হয়েছে দুটি স্রোতে। ভরা বর্ষায়, সেই ত্রিবেণী সঙ্গম তখন জলভারে টইটুম্বুর। দুই সহকারী ছিলেন তাঁর সাথে। অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা।
কিশোরী মোহন অবিচল। ইষ্টদেবতার নাম নিয়ে, একটি কুটো তুলে বিছিয়ে দিলেন নদীর জলে। খড়ম খটখটিয়ে অকম্পিত পায়ে নদী পার হয়ে গেলেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ।নদীর দু’পাড় জুড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে শত শত মানুষ। তারা বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে দেখল সেই অলৌকিক দৃশ্য। ঘটনা শুনে, তালবান্দি গ্রামের জমিদার হাজির হলেন ঘোড়া হাঁকিয়ে। ব্রাহ্মণকে অনুরোধ করলেন সেই গ্রামে থেকে যেতে।
কিশোরী মোহনের মুখে স্মিত হাসি— “একেবারেই নিঃস্ব অবস্থায় চলে এসেছি আমি। ইষ্টদেবতাকে বাতাসার নৈবেদ্যটুকু সাজিয়ে দেব, সে সামর্থটুকুও আজ সাথে নাই। ঠাঁই পাতবো কী করে?”
এবার হাসি ফুটল জমিদারের মুখেও। নিজের ঘোড়ায় বসিয়ে দিলেন ব্রাহ্মণকে। এক চাবুকের ঘায়ে, ৮৪ বিঘা সম্পত্তি পাক খেয়ে, ফিরে এসেছিল ঘোড়া। ৮৪ বিঘার ‘নিষ্কর’ সম্পত্তি দিয়ে বসত করানো হয়েছিল কিশোরী মোহনকে। পারিয়াল’পদবী ছেড়ে, নতুন করে ‘মোহান্ত’ পদবী হয়েছিল তাঁর।শেষ বয়সে বৃন্দাবন চলে গিয়েছিলেন কিশোরী মোহন। যাবার কালে একটি অশ্বত্থ গাছ দেখিয়ে, বলে গিয়েছিলেন—“যেদিন এই গাছের কোন ডাল ভেঙে পড়বে, জানবে, আমি আর নাই। তখন যেন একটি মহোৎসবের আয়োজন করা হয়।“
একদিন সত্যই একটি ডাল ভেঙে পড়ল গাছের। সেদিন অগ্রহায়ণ মাস। কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথি। সেদিনই বৃন্দাবনে দেহরক্ষা করেছিলেন মোহান্ত। বৃন্দাবন থেকে তাঁর দেহাস্থি এনে অশ্বত্থের তলায় সমাধিস্থ করা হয়েছে। পরে, আরও তিনজন মোহান্তের সমাধি হয়েছে সেখানে। একেবারেই নিরাভরণ, তিনটি মাটির বেদী। কোনও আড়ম্বর নাই। কিন্তু নিত্যদিন গোবরজলে নিকানো হয় বেদীগুলি। ধূপ দীপ জ্বলে। মন্দিরের পূজার প্রসাদ এনে, নৈবেদ্য সাজিয়ে দেওয়া হয় প্রয়াত মোহান্তদের। দেবতার মতই পূজা পান তাঁরা।
অগ্রহায়ণের কৃষ্ণা চতুর্দশী মোহান্তের প্রয়াণ তিথি। নিয়মিত ভক্ত সমাবেশ আর ৩ দিনের মহোৎসবের আয়োজন হয় সেই উপলক্ষে। এছাড়া, দোল পূর্ণিমায় রাধাবল্লভজীউর রথযাত্রা এবং কংসাবতীর জলে নৌকায় চড়ে ‘কালীয় দমন’ উৎসব হোত একসময়। বর্তমানে সেগুলি আর প্রচলিত নাই। তবে, নিত্যদিন পঞ্চব্যঞ্জন সাজিয়ে দেবতাকে অন্নভোগ নিবেদন করা হয় মন্দিরে।
মন্দিরটির পাদপীঠ সামান্যই উঁচু। ইটের তৈরি দক্ষিণমুখী মন্দিরটি পঞ্চ-রত্ন হিসাবে নির্মিত হয়েছে।
মন্দিরে একটি প্রতিষ্ঠালিপি আছে। সংক্ষিপ্ত লিপি। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতার উল্লেখ নাই বটে, প্রতিষ্ঠার সালটি জানা যায়। আর জানা যায়, মন্দির নির্মাতার নামটিও। বানান যথাযথ রেখে, লিপির হুবহু বয়ান—“শ্রীশ্রী রাধাবল্লভজীউ। সকাব্দা ১৭৮১। সন ১২৭০ সাল তাং ১৫ আসাড়। শ্রী ঠাকুরদাস সিল সাং দাসপুর।“এই লিপিতে, শকাব্দ ও বঙ্গাব্দের হিসাবের মধ্যে, ৪ বছরের একটি গরমিল আছে। বাংলা ১২৭০ সনকে মন্দির প্রতিষ্ঠার সঠিক সময়কাল ধরে হিসাব করলে, জানা যায়, ইং ১৮৬৩ সালে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। তখন ছিল ১৭৮৫ সকাব্দ।
পুরাবিদ ত্রিপুরা বসুও, তাঁর ‘সূত্রধর শিল্পঃ দাসপুর’ গ্রন্থে, উল্লেখ করেছেন যে ঠাকুরদাস শীল তালবান্দি গ্রামের রাধাবল্লভ মন্দির ইং ১৮৬৩ সালে নির্মাণ করেছিলেন।
ঠাকুরদাস ছিলেন তাঁর সময়কালের অগ্রগণ্য শিল্পী। ১৮৪৬ সাল থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত মোট ৮টি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন তিনি। তালবান্দি গ্রামের এই মন্দির তাঁর শেষ বয়েসের কাজ।
পরিতাপের কথা, মন্দিরের অবয়বটুকু ছাড়া, ঠাকুরদাসের শিল্পকর্মের প্রায় কিছুই আর এই মন্দিরে অবশিষ্ট নাই। সংস্কার কাজের ফলে, অধিকাংশই বিনষ্ট হয়ে গিয়েছে।যাইহোক, দুটি অংশ মন্দিরটির—সামনে একটি সঙ্কীর্ণ অলিন্দ। তাতে খিলানের তিনটি দ্বারপথ। সিলিং হয়েছে টানা-খিলান করে।
গর্ভগৃহে একটি বাঁধানো বেদী। তার উপর দারু-সিংহাসনে দেবতার অধিষ্ঠান। কক্ষটির সিলিং হয়েছে চাপা-খিলানের উপর গম্বুজ রচনা করে।
রত্নগুলি শিখর রীতির। প্রতিটিতে কলিঙ্গ স্থাপত্যধারায় রথবিন্যাস করা। কোণের চারটি রত্নে ত্রি-রথ এবং কেন্দ্রীয় রত্নে পঞ্চ-রথ বিন্যাস। চুড়াগুলিতে বেঁকি, আমলক, কলস এবং বিষ্ণুচক্র রচিত।
কার্ণিশের নীচ বরাবর একটি সমান্তরাল সারিতে কিছু টেরাকোটা ফলক দেখা যায়। সেগুলি ছোট ছোট খোপে স্থাপিত। পূর্ববর্তী পুরাবিদগণের বিবরণে জানা যায়, দশাবতারের ভিন্ন ভিন্ন ফলক, কৃষ্ণলীলার নানাবিধ ফলক ছিল। ঠাকুরদাসের সেসকল শিল্পকাজগুলি সংস্কারকাজের সময় মুছে গিয়েছে বলে অনুমান করা যেতে পারে।
সাক্ষাৎকারঃ সর্বশ্রী শ্যামপদ মোহান্ত, বাঁশরী মোহন মোহান্ত— তালবান্দি। লক্ষ্মীকান্ত মোহান্ত—ডেবরা। মদন মোহন মোহান্ত, পুষ্পেন্দু মোহান্ত এবং উদয় নারায়ণ জানা (ভূমি বিভাগের আধিকারিক)—মেদিনীপুর শহর।পথনির্দেশঃ ৬নং জাতীয় সড়ক মুম্বাই রোডের ডেবরা বাজার থেকে উত্তরে, টাবাগেড়িয়ায় নদী পার হয়ে, নদী বাঁধ ধরে কিমি পাঁচেক দূরত্বে তালবান্দি গ্রাম। এছাড়া, মেদিনীপুর শহর থেকে বাসে হারাতলা পৌঁছে, নদীর অপর পারে তালাবান্দি।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ ৬, ৮ এবং ১০ নং—৩টি ছবি শ্রী পুষ্পেন্দু মোহান্ত তুলে দিয়েছেন।

- Advertisement -
Latest news
Related news