Monday, April 15, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১৬৯।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল চিন্ময় দাশ
কৃষ্ণরায়জীউ মন্দির, বগড়ি-কৃষ্ণনগর            (গড়বেতা, পশ্চিম মেদিনীপুর)
‘বগড়ি’র পূর্ব নাম ছিল—‘বকদ্বীপ’। লোকমুখে সেটি প্রথমে হয়েছিল—‘বকডিহি’। পরে ‘বগড়িডি, অবশেষে ‘বগড়ি’।
অতীত কালে বকদ্বীপ-এর রাজধানি ছিল বেত্রবতী। এই নামটি পরবর্তীকালে হয়েছিল—‘বেতা’। রেনেল সাহেবের মানচিত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘এপিগ্রাফিকা ইণ্ডিয়া’তে বলা হয়েছে, গুপ্তযুগে পঞ্চম শতাব্দীতে কুমারগুপ্ত-এর রাজত্বকালে, কুমারামাত্য বেত্রবর্মা এখানে গড় এবং নগর স্থাপন করেছিলেন। তা থেকেই এর নাম হয়—‘গড়বেতা’।
কালে কালে বগড়ি নামটির যেমন বিবর্তন হয়েছে, ইতিহাসও আছে বগড়ির। ‘মহাভারত’-এ উল্লেখ আছে, পাণ্ডব ভাইগণের বনবাসকালে, এখানেই মধ্যম পাণ্ডব ভীমসেন বকডিহির রাজা বকাসুরকে নিধন করেছিলেন।
বগড়িতে শ্রীকৃষ্ণের একটি মন্দির আছে। সেটির গড়ে ওঠা সম্পর্কে নানান কাহিনী শোনা যায়। আমরা দুটি কাহিনীর উল্লেখ করব। প্রথমটি নেহাতই কিংবদন্তি। বলা হয়, ভীমসেন বকাসুরকে হত্যা করেছেন, এ সংবাদ শুনে, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ এখানে এসেছিলেন। সেই সুবাদে, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজার প্রচলন করেছিলেন। দেবতাকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে একটি জনপদ গড়ে ওঠায়, শ্রীকৃষ্ণের নাম থেকে সেটির নাম হয়েছিল—কৃষ্ণনগর।
দ্বিতীয় অভিমতটি ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায়। এক সময়, স্বনামধন্য রাজা জনৈক গজপতি সিংহ, অর্ধ শতাব্দীর বেশি কাল ধরে, এখানে রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর শাসনকাল ইং ১৩৬৪ থেকে ১৪২০ সাল। তিনিই বগড়িতে কৃষ্ণরায়জীউর মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
বগড়িতে শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ পাওয়া, গজপতি সিংহের মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং নতুন করে ‘কৃষ্ণনগর’ নামটির উৎপত্তি সম্পর্কেও বহুল প্রচারিত একটি কিংবদন্তি শোনা যায়। তা থেকে জানা যায়, বগড়ির রাজা গজপতি সিংহের দেওয়ান ছিলেন জনৈক মুকুন্দরাম বটব্যাল। রাজকার্যে সুদক্ষ মুকুন্দরামকে ‘রাজ্যধর’ খেতাব দিয়েছিলেন গজপতি। তখন থেকে তিনি ‘রাজ্যধর রায়’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন।
রাজ্যধর একবার সস্ত্রীক পুরী গিয়েছিলেন জগন্নাথ দর্শনে। সেখানে ‘জয় পণ্ডা’ নামক এক উৎকল ব্রাহ্মণের কাছে কষ্টিপাথরে নির্মিত একটি সুদর্শন কৃষ্ণমূর্তি এবং শক্তিস্বরূপিনী একটি শ্রীরাধিকা মূর্তি পেয়েছিলেন।
রাধিকা মূর্তিটি গোয়ালতোড় নামক স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। গজপতি সিংহ বগড়ি গ্রামে বিশাল আকারের একটি মন্দির নির্মাণ করে, কৃষ্ণমূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন থেকে গ্রামটির নাম হয়— ‘বগড়ি কৃষ্ণনগর’। পরবর্তীকালে, গজপতির প্রপৌত্র রাজা রঘুনাথ সিংহ (ইং ১৪৭০ থেকে ১৫৪০ সাল) শ্রীরাধিকার একটি মূর্তি গড়িয়ে, মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন থেকে নয়নাভিরাম যুগলমূর্তি এই শ্রীমন্দিরে বিরাজিত আছে।
গজপতি সিংহ যে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটি বহুকাল আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। শিলাবতীর বন্যা গিলে খেয়েছিল মন্দিরটিকে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, ইং ১৮৫৫ সালে, গড়বেতা মুন্সেফি আদালতের জনৈক ধর্মপ্রাণ আইনজীবি, যাদবরাম চট্টোপাধ্যায়, নতুন করে একটি মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। বিষ্ণুপুরের সনাতন মিস্ত্রী ছিলেন মন্দিরের সূত্রধর বা নির্মাতা। একটি প্রতিষ্ঠালিপি থেকেও তথ্যগুলি জানা যায়। সেই মন্দিরটিই এখনও বহাল আছে।
মন্দিরের সেবাইত হিসাবে দেওয়ান রাজ্যধর রায়কেই নিয়োগ করেছিলেন গজপতি সিংহ। এত দিনে রায়বংশটি ১৫/১৬ পুরুষে পৌঁছেছে। আজও রায়বংশই মন্দিরের সেবাইত স্বত্ত্বে বহাল আছে। একটি ‘ট্রাস্ট’ও গঠন করেছেন সেবাইতগণ।
সেবাপূজার জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল পুরোহিত, টহলা, কামিন, মালাকার, বাজনদার, চৌকিদার, ময়রা, গোয়ালা, কাহার প্রমুখ কত না পদের কর্মচারীদের। সেকালের রীতিতে ‘জায়গির সম্পত্তি’ দেওয়া হয়েছিল সকলকেই। মন্দিরের প্রথম পুরোহিত ছিলেন সাধক প্রবর জনৈক উপেন্দ্র ভট্ট। আজও তাঁর উত্তরাধিকারীগণই মন্দিরে পৌরহিত্য করেন।
সম্পূর্ণ বৈষ্ণবীয় রীতিতে সেবাপূজা হয় এখানে। প্রত্যুষকাল থেকে দেবতার শয়ন পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে—অঙ্গসেবা, তিলকসেবা, নিত্যসেবা, জলসেবা, ভোগসেবা, শীতলসেবা— কত নানাবিধ নাম সেসবের!
রীতিও কতই না! ভোগসেবার আয়োজন হয় পাকশালেই, মন্দিরে নয়। কৃষ্ণরায়জীউ সেখানে যান না। ভোগ স্বীকারের জন্য ২৭টি শালগ্রামকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। আর একটি বিশেষ নিয়ম হোল, এখানে কেবল মাত্র গুড়ের তৈরি ‘নিযুক’ নামের নির্দিষ্ট একটি মিষ্টিই স্থান পায় দেবতার নৈবেদ্যের থালায়। অন্য কোনও মিষ্টিই দেবতাকে দেওয়া যায় না।
কৃষ্ণরায়জীউ– দেবতা একজন। কিন্তু গুণে গুণে তিনটি মন্দির তাঁর। বর্ষায় শিলাবতী ফেঁপে উঠতে শুরু করলে, তিনি চলে যান কৃষ্ণনগর থেকে খানিক তফাতে, মায়তা গ্রামে।
রথযাত্রা, বকুলকুঞ্জ, পুনর্যাত্রা সবই মায়তার মন্দিরেই আয়োজন করা হয়। ঝুলন, রাস, জন্মাষ্টমী, অন্নকূট উৎসবগুলিও আয়োজিত হয় সেখানেই। রথ, ঝুলন মন্দির, রাসমঞ্চ সবই আছে মায়তা গ্রামে। দেবতার দালান-রীতির মন্দিরটিও সংস্কার করে নেওয়া হয়েছে কিছুকাল পূর্বে।
২। শিলাবতী নদীর দক্ষিণ কোলে রঘুনাথবাড়ি নামের একটি গ্রাম। দোল উৎসবের সময় মায়তা থেকে সেই গ্রামের একটি প্রাচীন মন্দিরে চলে আসেন দেবতা। দোল উপলক্ষে পক্ষকাল ধরে একটি মেলা বসে শিলাবতীর পাড়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত হয় সেই মেলার।
রঘুনাথবাড়ির ঐতিহাসিক মন্দিরটি অতি প্রাচীন। নব-রত্ন রীতির মন্দিরটি ভারি বিশিষ্ট রীতির। পরে এই মন্দির সম্পর্কে পৃথক আর্টিকেল প্রকাশ করব আমরা।
৩। কৃষ্ণনগর গ্রামের মূল মন্দিরটি দক্ষিণমুখী পঞ্চ-রত্ন রীতির। উঁচু ভিত্তিবেদী। ৪০ ফুট উঁচু মন্দিরটি ২৭ ফুট বাহুর বর্গাকার। দক্ষিণ এবং পূর্বে তিন-দুয়ারী সঙ্কীর্ণ অলিন্দ। গর্ভগৃহের দ্বারপথ আছে দু’দিকেই।
পাঁচটি রত্নের প্রতিটিতেই, বাঢ়-বরণ্ড-গণ্ডী জুড়ে, রথ-বিন্যাস এবং গণ্ডী অংশে পীঢ়-ভাগ করা। শীর্ষকগুলি বেঁকির উপর আমলক, ঘন্টা, কলস এবং সুদর্শন চক্রে সুসজ্জিত।
বিষ্ণুপুরী শৈলীর ছাপ আছে এই মন্দিরে। তবে, অলঙ্করণের তেমন কোন কাজ নাই।
বগড়ি পরগ্ণা বা গড়বেতা থানার বুক চিরে গিয়েছে শিলাবতী। এ নদী চিরপ্রবহমানা। বর্ষায় তার উন্মত্ত চেহারা। কুল খেয়ে খেয়ে, বর্তমান মন্দিরটির একেবারে দোরগোড়ায় এসে হাজির হয়েছে নদী। প্রায় পৌনে দু’শ বছর আয়ুর এই মন্দিরেরও ধ্বংসের দিন যে এগিয়ে আসছে পায়ে পায়ে, বেশ বোঝা যায়।
অত্যন্ত সুদর্শন এই মন্দির প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের মূল্যবান নিদর্শন। এছাড়া, সারা বছরই যাত্রী সমাগম থাকে মন্দিরে। কিন্তু নদীর ছোবলে বড় বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে যে কোন সময়। মন্দিরটিকে রক্ষার জন্য, অবিলম্বে সরকারি বা অসরকারি প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপ খুব প্রয়োজন।
সাক্ষাতকারঃ সর্বশ্রী বিকাশ কুমার রায়, আলোকময় রায়, বিশ্বনাথ রায়, সমীর রায়, আনন্দ কাউড়ি।
পথ-নির্দেশঃ মেদিনীপুর – বাঁকুড়া রুটে বাস কিংবা ট্রেনযোগে গড়বেতা। এবার, জোগারডাঙামুখী রাস্তায়, ঝাড়বনি ও শিলাবতী অতিক্রম করে, মায়তার উপর দিয়েই, ১২ কিমি দূরে বগড়ি-কৃষ্ণনগর গ্রাম এবং মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news