Friday, April 19, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-১৫০।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
                   চিন্ময় দাশ                                        লক্ষ্মীজনার্দন মন্দির, হরিহরপুর (ডেবরা)

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

শিরোনামে মন্দির বলা হোল বটে, প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে যেটি এখনও টিকে আছে, তাকে মন্দিরের খণ্ডহর বলাই সঙ্গত। একেবারে কবিগুরুর সেই তালগাছের গল্প, যে আছে– ‘এক পায়ে দাঁড়িয়ে’।
কম করে শ’তিনেক বছর আগের কথা। নিজের ভাগের জমিদারী অংশ বিক্রি করে, বর্ধমানের জন্মভিটে ছেড়ে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন এক উদ্যমী পুরুষ। দামোদর আর দ্বারকেশ্বর দুই নদী পার হয়ে মেদিনীপুরের ভূখণ্ডে তাঁর প্রবেশ।
সেই পুরুষকারের নাম ছিল—আত্মারাম দত্ত। গড় মান্দারণ, ক্ষীরপাই, চন্দ্রকোণা প্রাচীন সব নগরী পার হয়ে, সেকালের কেদারকুণ্ড পরগণায় এসে থেমেছিল তাঁর পথচলা। বহুকালের প্রাচীন আর খ্যাতনামা মহাদেব চপলেশ্বর শিবের আসন পাতা সেখানে। মনস্থির করে, নিজের আসন পেতেছিলেন পাশেই হরিহরপুর গ্রামে।
সেকালে বাংলার নবাবের হয়ে নিম্নবঙ্গে খাজনা আদায় করত বর্ধমানের রাজবংশ। তাঁরা বেশ কিছু পত্তনিদার নিযুক্ত করেছিলেন। কেদারকুণ্ড পরগণায় তাঁদেরই এক দর-পত্তনিদার ছিল ঘোষবংশ।
ঘোষবংশের জমিদার জ্যোতীশ চন্দ্র ঘোষের কাছ থেকে পুরো একটা তালুক কিনে নিয়েছিলেন আত্মারাম। নিজের একটি জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি।
জমিদারীটি গড়েছিলেন বেশ বড় মাপেই। কাছারিবাড়ি, অতিথিশালা, সদাব্রত কত কিছুই না প্রতিষ্ঠা আর প্রচলন করেছিলেন তিনি। হাতি আর উটের কাফেলা সাজিয়ে, উত্তর আর মধ্য ভারত থেকে তীর্থ পরিক্রমায় আসতেন যে সাধু-সন্তের দল, তাদের বিশ্রাম আর আহারের ঢালাও বন্দোবস্ত ছিল জমিদারবাড়িতে। নিত্য দিন ১ মণ চালের বরাদ্দ ছিল। সাধু-সন্তরা ছাড়া, অতিথি-অভ্যাগত, দীন-দুঃখী প্রজা, কাঙ্গালী-ভিখারি সকলেই দু’-বেলা আহার পেতেন দত্তবাড়ির সদাব্রতে।
কুলদেবতা হিসাবে শ্রীকৃষ্ণকে আশ্রয় করেছিলেন আত্মারাম। নিজের বৈভবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, বিশাল আকারের একটি মন্দির গড়েছিলেন নিজের অট্টালিকার সাথে। মন্দিরের সামনে আলাদা করে নাটমন্দির, দুর্গাদালান, গড়া হয়েছিল। নিত্য পূজা ছাড়াও, বারো মাসে তেরো পার্বণের আয়োজন হোত ঘটা করে।
কিন্তু দিন তো চিরকাল সমান যায় না। জমিদারী ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার সাথে সাথে, ভাটার স্রোত বইতে শুরু করেছিল। তার সাথে যোগ হয়েছিল সামাজিক আর রাজনৈতিক টানাপোড়েন। দেবতার সেবাপূজাটুকু চালিয়ে রাখাই দায় হয়ে উঠেছিল দিন দিন। সে সময় সোনা-রূপার অলঙ্কারাদি সহ বিগ্রহটিও চুরি হয়ে যায় একদিন।
পরে নতুন করে বিগ্রহ স্থাপন করা হলেও, পূর্বের শৃঙ্খলা আর ফিরে পাওয়া যায়নি। অগত্যা অন্যত্র একটি দেবমন্দিরে রেখে আসতে হয়েছে বিগ্রহ দুটিকে।
তখন থেকে বিগ্রহহীন পরিত্যক্ত মন্দিরটি প্রতিদিন খসে খসে পড়ছে একটু একটু করে। এখন যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তা কেবল মন্দিরের মূল কাঠামোটুকু। প্রথম তলের গর্ভগৃহ, তার মাথায় দ্বিতলের গর্ভগৃহ, সেটির মাথায় কেন্দ্রীয় রত্নটির টিকে থাকা কিছুটা অংশ— সামান্য এটুকুই মাত্র আছে এখন।
দক্ষিণমুখী ইটের মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল নব-রত্ন রীতিতে। ফুট দুয়েক উঁচু পাদপীঠের উপর। মন্দিরের ভূমি নকশাটি বেশ বড় পরিসরের। হবে নাই বা কেন? চারটি অলিন্দ ছিল গর্ভগৃহের চারদিকে। প্রতিটিতে খিলান-রীতির তিনটি করে দ্বারপথ। দ্বিতলেও অনুরূপ চারটি অলিন্দ ছিল, যার একটি মাত্র কেবল টিকে আছে। এমন আটটি অলিন্দ যুক্ত মন্দির বড় একটা দেখা যায় না।

আরও একটি বৈশিষ্ট আছে এই মন্দিরের। ন’টি রত্নই নির্মিত হয়েছিল আট-কোণা (অক্টাগোনাল) আকারে। সারা মেদিনীপুর জেলায় এমন নির্মাণ দ্বিতীয়টি নাই। ন’টির ভিতর কেবল কেন্দ্রীয় রত্নের নীচের অংশটুকুর অস্তিত্বই আছে এখনও। তা থেকে দেখা যায়, আট দেওয়ালে, একটি অন্তর একটিতে, মোট চারটি দ্বারপথ রচিত ছিল। রত্নগুলির শীর্ষক অংশের গড়ন কেমন ছিল, তার বিবরণ দেওয়ার সুযোগ নাই আজ আর।
বিবরণ দেওয়া যাবে না মন্দিরের অলঙ্করণের বিষয়েও। কেন না, দ্বিতলের দক্ষিণেরটি ছাড়া, সামনের দেওয়ালগুলির প্রায় সবই বিলুপ্ত। তবে, উপর নীচ দুটি গর্ভগৃহের দেওয়ালে টেরাকোটার কয়েকটি ফলক বিন্যাস দেখা যায়। তবে, সেগুলি শতদল পদ্ম ছাড়া অন্য কিছু নয়।
দেওয়ালে আর আছে পঙ্খের কিছু ফুলকারি নকশার কাজ। কিন্তু টেরাকোটায় কোন মূর্তিবিন্যাস করা হয়েছিল কি না, তা বলা যায় না।
পূর্ববর্তী পুরাবিদগণ তারাপদ সাঁতরা, অধ্যাপক প্রণব রায়, ড. গঙ্গাধর সাঁতরা—কারও কোন গ্রন্থেই এই বিশিষ্ট মন্দিরটির উল্লেখটুকুও নাই। সম্পূর্ণ বিলীণ হয়ে যাওয়ার পর, বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবে এই সৌধ আর তার প্রতিষ্ঠাতার অস্তিত্বও। সেজন্য, সব কিছু হারিয়ে যাওয়ার পূর্বে, আমরা সাধ্যমত সামান্য দু’চারটি কথা বলে রাখলাম মাত্র।
সাক্ষাৎকারঃ শ্রীমতী মধুমিতা দত্ত। সর্বশ্রী তারাকিঙ্কর দত্ত, রবীন্দ্রনাথ দত্ত, উৎপল দত্ত, অমিয় দত্ত—হরিহরপুর।
পথ-নির্দেশঃ দ. পূ. রেলপথের বালিচক স্টেশন থেকে দক্ষিণের পথে ৩ কিমি উজিয়ে হরহরপুর। সেখানে নিমতলায় নেমে, কয়েক পা হেঁটে দত্তদের বাড়ি এবং এই মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news