Tuesday, April 16, 2024

Temple Tale: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১৫৮ ।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল চিন্ময় দাশ
কিশোররায় জীউ মন্দির                                   পঁচেটগড় (পটাশপুর, পূর্ব মেদিনীপুর)
রাঢ় বাংলায় পঁচেটগড় রাজবাড়ির খ্যাতি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চার কেন্দ্র হিসাবে। বিষ্ণুপুরের পরেই এর স্থান। এই জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জনৈক কালামুরারী দাস মহাপাত্র। ভাগ্যাণ্বেষণে ওড়িশার পুরী জেলার রথিগ্রাম থেকে মেদিনীপুরে (সেকালের প্রতাপভান পরগণায়) চলে আসেন তিনি। পার্সী ভাষায় সুদক্ষ ছিলেন। সেই সুবাদে তাম্রলিপ্ত এলাকায় বিদেশী বণিকদের সাথে দোভাষী হিসাবে কাজ করে, বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন।
লক্ষ্মী চিরকালই চঞ্চলা। সেকারণে, সম্পদ থেকে সম্পত্তি করেছিলেন কালামুরারী। দেহাত গোকুলপুর, ভোগরাই, কামার্দাচৌর, পটাশপুর এবং প্রতাপভান পরগ্ণাগুলি কিনে নিয়ে, বড় মাপের একটি জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।
পর পর দুটি গড়খাই দিয়ে ঘেরা হয়েছিল প্রায় একশ’ বিঘার বিশাল আয়তনের বাস্তুকে। তার ভিতর প্রাসাদের মত অট্টালিকা গড়ে, নাম হয়েছিল—গড় হাভেলি। গড় হাভেলির সামনে, একটি মন্দির গড়ে, পাঁচটি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেবতার নাম হয়—পঞ্চেশ্বর। পঞ্চ ইষ্ট দেবতা থেকে গ্রামের নাম হয়—পঁচেট। গড়খাই দিয়ে ঘেরা গড় হাভেলির নাম হয়েছিল—পঁচেটগড়। পঞ্চেশ্বর, পঁচেট এবং পঁচেটগড়– তিনটি নাম আজও বহাল আছে।
প্রাথমিক পর্বে শিবের আরাধনা প্রচলিত হলেও, পরে চৈতন্যদেবের প্রেমধর্মের প্রভাবে, বৈষ্ণবীয় রীতিতে দেবার্চনার রীতিতেই আস্থা রাখে এই জমিদারবংশ। শ্রীকৃষ্ণকে কুলদেবতা হিসাবে গ্রহণ করেন তাঁরা। কিশোররায়জীউ নামে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে, সেবাপূজার প্রচলন করা হয়।
নিজেরাই কেবল বৈষ্ণবীয় ধারার অনুসারী হয়ে ক্ষান্ত থাকেননি। পুরী যাওয়ার সময়, পটাশপুর থানার উপর দিয়ে রেমুণা রওণা হয়েছিলেন মহাপ্রভু চৈতন্যদেব। সারা এলাকা জুড়ে গভীর প্রভাব পড়েছিল তাঁর অভিযাত্রার। প্রজাবর্গও যাতে বৈষ্ণবীয় রীতিতে দেবার্চনা করতে পারেন, সেকারণে, নিজেদের মহালের ভিতর, অনেকগুলি বিষ্ণু মন্দির গড়ে দিয়েছিলেন এই জমিদাররা। প্টাশপুর থানারই চক শ্রীকৃষ্ণ গ্রামের রঘুনাথ মন্দির, গোকুল্পুর গ্রামের বিষ্ণু মন্দির, সাতষণ্ডা গ্রামের রাজরাজেশ্বর মন্দির ইত্যাদি তার উদাহরণ।গড় হাভেলির ভিতরেই গড়া হয়েছিল কুলদেবতার বিশাল আকারের মন্দিরটি। কিশোররায়ের এই মন্দির ইটের তৈরি, পূর্বমুখী। তবে, মন্দিরে উঠবার সিঁড়িটি উত্তর দিকে। অন্তরাল এবং গর্ভগৃহের একটি করে অতিরিক্ত দ্বার আছে দক্ষিণ দিকে। মন্দিরের ভিত্তিবেদী চোখে পড়বার মতো উঁচু। একটি প্রদক্ষিণ পথ আছে উপরে।
কলিঙ্গশৈলীর শিখর-রীতির সৌধ। তিনটি অংশ মন্দিরটির— জগমোহন, অন্তরাল ও বিমান। জগমোহনে চার দিকে চারটি দ্বারপথ। প্রতিটির মাথায় পীঢ়-রীতিতে ছাউনি দেওয়া। বাইরের দেওয়ালে বাঢ় এবং গণ্ডী জুড়ে, নব-রথ বিন্যাস করা। গণ্ডী অংশে ঢেউ খেলানো পীঢ়ভাগ। বিমান সৌধের বাঢ়-বরণ্ড-গণ্ডী জুড়ে সপ্তরথ বিন্যাস।
এই এক মন্দির, যার অন্তরাল অংশটি প্রকট। মাথায় আট-চালা ছাউনি এবং শীর্ষক। সারা জেলায় আর দ্বিতীয় নাই। জগমোহন এবং বিমানের মাথায় আমলক, তিনটি করে কলস এবং চক্র স্থাপিত। তিনটি সৌধেরই অভ্যন্তরে সিলিং গড়া হয়েছে আটটি করে খিলানের মাথায় গম্বুজ রচনা করে।
মন্দিরের অভ্যন্তর অংশে উৎকৃষ্ট কিছু পঙ্খের অলঙ্করণ আছে। একটি সুদীর্ঘ লিপিফলক আছে গর্ভগৃহের দ্বারপথের মাথায়। আছে দু’-একটি স্টাকোর কাজও।
মন্দিরের লাগোয়া উত্তরে পৃথক একটি দোল মন্দির আছে দেবতার। তার গর্ভগৃহটিকে বেষ্টন করে চারদিকেই চারটি অলিন্দ। তাতে পাঁচটি করে খিলানের দ্বারপথ। সারা জেলায় এমন দোলমন্দির আর নাই।
দোলমন্দিরের মাথার ছাউনিটি চোখে পড়বার মতো। ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের বেসর-রীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। এই জেলায় দাঁতনের শরশঙ্কা গ্রামের জগ্ননাথ মন্দিরের নাটমন্দিরে এর উদাহরণ দেখা যায়।
পঁচেটগড়ের রাস উৎসব অতি বিখ্যাত। প্রায় চারশ’ বছর আয়ু হয়েছে মেলাটির। দেবতার রাসমঞ্চটি আছে মন্দিরের বাইরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। সেই মঞ্চকে কেন্দ্র করেই মেলার আয়োজন হয়।
সাক্ষাৎকার (২০১৫ সালে): সর্ব চৌধুরী সমরেন্দ্র নন্দন দাস মহাপাত্র, পিনাকী নন্দন দাস মহাপাত্র, দিলীপ নন্দন দাস মহাপাত্র, রবীন্দ্র নন্দন দাস মহাপাত্র, যদু নন্দন দাস মহাপাত্র, সুব্রত নন্দন দাস মহাপাত্র, শ্রীমতি অপর্ণা দাস মহাপাত্র, শ্রীমতি ঋতুপর্ণা দাস মহাপাত্র—পঁচেটগড়, ভূবনেশ্বর, শান্তিনিকেতন ও কলকাতা।
পথনির্দেশঃ মেদিনীপুর-দীঘা রাস্তার এগরা থেকে ৩ কিমি উত্তরে পঁচেটমোড়। এছাড়া, কলকাতা-দীঘা রুটের বাজকুল থেকে পশ্চিমে, কিংবা মুম্বাই রোডের ডেবরা বা বালিচক স্টেশন থেকে দক্ষিণে, এগরা মুখী রাস্তায় পঁচেট্মোড়। এবার ৩ কিমি পূর্বে জমিদারবাড়ি ও মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news