Saturday, April 20, 2024

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল – ১১৩

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ১১৩
রামেশ্বর শিব মন্দির, অযোধ্যা (চন্দ্রকোণা নগরী, মেদিনীপুর)
চিন্ময় দাশ

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

কিংবদন্তি আর লোকশ্রুতি বাদ দিলে, বাকি থাকে মান্য ইতিহাস। সেই ইতিহাস থেকে জানা যায়, পর পর তিনটি রাজবংশ রাজত্ব করেছে চন্দ্রকোণায়– মল্ল বংশ (এঁরাই উৎখাত হয়ে উঠে গিয়ে, বিষ্ণুপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন), কেতু বংশ (এই বংশের রাজা চন্দ্রকেতুর নাম থেকে, পূর্বের ‘মানা’ নগরীর নাম হয়েছিল চন্দ্রকোণা) এবং ভান বংশ।

ভান বংশে জনৈক রঘুনাথ সিংহ যখন রাজা, পার্শ্ববর্তী চেতুয়া-বরদার রাজা ছিলেন ‘বাংলার শিবাজী’ নামে খ্যাত শোভা সিংহ। শোভা সিংহ যখন বর্ধমান আক্রমন ক’রে, রাজা কৃষ্ণরামকে হত্যা এবং বর্ধমান দখল করে নিয়েছিলেন, সেই যুদ্ধে রঘুনাথ সিংহ ছিলেন শোভার সহযোগী। পরবর্তী কালে, যখন শোভা সিংহ নিহত হয়েছেন, বাংলার নবাবের সাহায্য নিয়ে, কৃষ্ণরামের পৌত্র কীর্তিচন্দ্র চন্দ্রকোণা আক্রমন ও রঘুনাথ সিংহকে পরাজিত করে তাঁর রাজ্য অধিকার করে নেন।

সেই ভয়ানক যুদ্ধে অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে বহু দেবালয় একেবারে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। সুখের কথা, যুদ্ধশেষে, কীর্তিচন্দ্র অনেকগুলি মন্দির পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করে দিয়েছিলেন। সেই পর্বেই, চন্দ্রকোণা নগরীতে অযোধ্যা পল্লীর এই ঠাকুরবাড়িটিও গড়ে উঠেছিল। সময় ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিক। কালের আঘাতে মন্দিরগুলি জীর্ণ হয়ে পড়লে, কীর্তিচন্দ্রের পৌত্র তেজচন্দ্র ঠাকুরবাড়ির সংস্কার করে দিয়েছিলেন। মহারাজা তেজচন্দ্র যে এই ঠাকুরবাড়ির সংস্কার করিয়েছিলেন, তা জানা যায়, সেসময় ঠাকুরবাড়িরই মূল ফটকের উপর তাঁরই স্থাপিত ফলকটি থেকে।

সংস্কৃত এবং বাংলা দ্বিভাষিক লিপির, বাংলা বয়ানটি এরকম– “রঘুনাথের শ্রীমন্দির রম্যমনোহর। / লালজীর শ্রীমন্দির হনুমন্ত সর।। / ভোগালয় ধনালয় নাট্য রম্যাগার। /বৃন্দাবেস্ম রাসবেস্ম পাকগৃহ আর।। / বাদ্যগৃহ প্রান্তর প্রাচীর যুগ্মকূপ। / স্নানগৃহ সীতাকুন্ড অট্ট অপরূপ।। / ধনবেস্ম রাসগৃহের বারান্দাযুগল। / দ্বারিগৃহ পড়ি সব প্রভৃতি সকল।। / চন্দ্রকোণায় রঘুনাথ যদুনাথ প্রীতে। / বর্ধমানাবনীনাথ বিষ্ণুতে জগতে।। / নবোজ্জ্বল করিলেন নৃপচক্রবর্তী। / শ্রীলতেজচন্দ্র নৃপ ধরাধৌতকীর্তি।। / শিবাক্ষী শিবাস্য সিন্ধু শশী ইতি শকে। / অঙ্গনায় অংশুমান একবিংশতিকে। সন ১২৩৮। ”

এই ফটক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেই দেখা যায়, ঠাকুরবাড়ির অভ্যন্তরটি উঁচু প্রাচীর দিয়ে পৃথক দুটি ভাগে বিভক্ত। সেই বিভাজক-প্রাচীরে, মাথায় নহবতখানা সহ, একটি ফটক আছে। ভিতরের ভাগে আছে মুখ্য দুই দেবতা রঘুনাথজীউ এবং লালজীউর মন্দির, ভোগমন্ডপ, স্নানবেদী, ধনাগার, তোষাখানা ইত্যাদি। (১০ নং জার্নাল-এ বিশদ বিবরণ দিয়েছি আমরা।)


বাইরের ভাগে পূর্বদিকে আছে একটি রাসমঞ্চ, পশ্চিমে ছোট আকারের দুটি সমাধি-মন্দির। এদের মাঝখানে আমাদের বর্তমান আলোচ্য শিবের এই মন্দিরটি অবস্থিত। বিশেষ লক্ষণীয় বিষয় হোল, শিবের এই মন্দিরটি শেষ ভান রাজা রঘুনাথ সিংহের হাতে নির্মিত তো নয়ই, এমনকি, বর্ধমানরাজ কীর্তিচাঁদ বা তেজচন্দ্রের হাতেও নয়। রাজসম্পত্তির ঘেরাটোপের ভিতরেই মন্দিরটি গড়ে উঠেছিল চতুর্থ এক ব্যক্তির হাতে।


ভয়ানক রকম জীর্ণ এই মন্দিরে একটি প্রতিষ্ঠা-ফলক এখনও টিকে আছে। তার বয়ানটিই আমাদের জানিয়ে দেয় এক অপরিচিত প্রতিষ্ঠাতার নামটুকু– ” শ্রীরামঃ।। শকাব্দে শন নাগাদ্ধি রজনীপতিতি ম্মিতে।। পঞ্চানন পদাম্ভোজে পঞ্চরত্ন মিদং দদৌ।। শাকং ১৬৮৭/৫/৯ সেবকঃ শ্রীখোষালচন্দ্রঃ “।

অর্থাৎ কি না, ১৬৮৭ শকাব্দ বা ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ৯ ভাদ্র তারিখে শ্রীখোষালচন্দ্র নামক জনৈক সেবক পঞ্চাননের পাদপদ্মে এই পঞ্চরত্ন মন্দিরটি দান করেছিলেন। সেই হিসাবে, মন্দিরটির বর্তমান আয়ু আড়াই শ’ বছর অতিক্রম করেছে।


ল্যাটেরাইট বা মাকড়া পাথরের উত্তরমুখী মন্দির। পঞ্চ-রত্ন রীতিতে নির্মিত হয়েছে। বর্গাকার মন্দিরটির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ১৬ ফুট, উচ্চতা আনু. ৩০ ফুট। মন্দিরকে ঘিরে প্রদক্ষিণ-পথ সহ একটি অনুচ্চ ভিত্তিবেদী। সামনে উত্তর দিকে ‘ইমারতি-রীতি’র থাম আর ‘দরুণ-রীতি’র খিলান যুক্ত তিনটি দ্বারপথের একটি অলিন্দ। পূর্ব দিকে একটি এক-দ্বারী আবৃত অলিন্দ আছে। দুটি অলিন্দ থেকে গর্ভগৃহে প্রবেশের একটি করে দ্বারপথ। গর্ভগৃহের মাথায় চালা-রীতির গড়ানো ছাউনি।


দুটি অলিন্দের ভিতরের ছাদ বা সিলিং হয়েছে চার-কোণা ভল্ট-এ, আর দুটি খিলানের মাথায় গম্বুজ স্থাপন করে হয়েছে গর্ভগৃহের সিলিং।মন্দিরের পাঁচটি রত্নেই রথ-বিভাজন করা হয়েছে। কোণের চারটি রত্নে ত্রি-রথ এবং কেন্দ্রীয় রত্নে পঞ্চ-রথ বিভাজন করা। রত্নগুলির মাথায় পীঢ়-রীতিতে থাক কাটা হয়েছে।
কোনও অলংকরণের কাজ নাই মন্দিরটিতে। সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী রামকৃষ্ণ ব্যানার্জী– অযোধ্যা। গণেশ দাস– পুরুষোত্তমপুর, চন্দ্রকোণা শহর।
সমীক্ষা-সঙ্গী : শ্রী সুগত পাইন, গবেষক ও প্রাবন্ধিক– দাসপুর।
পথ-নির্দেশ : মেদিনীপুর কিংবা চন্দ্রকোণা রোড থেকে ঘাটাল মুখী পথে চন্দ্রকোণা। হাওড়ার দিক থেকে, পাঁশকুড়া ও ঘাটাল হয়ে চন্দ্রকোণা। এই নগরীর অলিতে গলিতে প্রাচীন মন্দিরের সমাবেশ। নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে টোটো বা অটো নিয়ে অযোধ্যা ঠাকুরবাড়ী এবং অন্যান্য মন্দিরও দেখে নেওয়া যায়।

- Advertisement -
Latest news
Related news