Monday, April 15, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৮০, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

বিশ্ববন্দিত দার্শনিক
ব্রজেন্দ্রনাথ শীল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

বিনোদ মন্ডল

পাশ্চাত্য পণ্ডিত প্যাট্রিক সেডেড এক ভারতীয় পণ্ডিতের পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে অকপটে লিখেছেন “Seal was the greatest brain functioning in this planet.” তিনি আচার্য্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল ( ০৩-০৯- ১৮৬৪ — ০৩-১২- ১৯৩৮)। জন্মেছিলেন হুগলী জেলার হরিপালে। বাবা- মহেন্দ্রলাল শীল ছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী। শিল্প সংস্কৃতির নানা অঙ্গনে স্বচ্ছন্দ যাতায়াত ছিল তাঁর। ভালো বেহালা বাজাতেন। অকালে প্রয়াত হন। ব্রজেন্দ্র তখন আট বছরের। চলে যান মা রাধারাণী দেবীও। মামা বাড়িতে আশ্রয় নেন দাদা রাজেন্দ্রনাথের সাথে।
স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি. এ. পাশ করেন। পরে একদিন এখান থেকেই অধ্যাপনার ব্রতে আত্ম নিয়োজিত হয়েছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তাঁর জীবনীকারগণ তাঁর সুতীক্ষ্ণ মেধার নানা ঘটনা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। কিশোরকাল থেকেই বোঝা যায় তিনি ছিলেন বিস্ময় প্রতিভা। জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার অবারিত ক্ষেত্রে মানসযাত্রী ছিলেন তিনি। তাই প্রিয় বিষয় গণিত হওয়া সত্ত্বেও পরীক্ষা দেন দর্শনে। এবং বিশ্বের দিকপাল দার্শনিকের মর্যাদায় ভূষিত হন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত গণিত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক গৌরীশঙ্কর দে ব্রজেনকে যথেষ্ট স্নেহ করতেন। তিনি চেয়েছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ গণিতে মাস্টার্স হোক। কিন্তু বাধ সাধলেন একই প্রতিষ্ঠানের বিখ্যাত অধ্যাপক উইলিয়াম হেস্টি সাহেব। তিনি বলেন দর্শনে আসুক ব্রজেন। এ নিয়ে চমকপ্রদ নাটকীয় কাহিনী প্রচলিত। তবে গবেষণার কাজে দর্শন গণিত বিজ্ঞানকে প্রয়োজন মতো সংশ্লেষণ করেছেন ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি যে গবেষণা পত্রের জন্য পি. এইচ.ডি. ডিগ্রি লাভ করেন তার শিরোনাম দেখে নেওয়া যেতে পারে ‘Mechanical physical and chemical Theories of Ancient Hindus.’

১৮৮১তে অসম সরকারের সরকারি ইঞ্জিনিয়ার জয়গোপাল রক্ষিতের কন্যা ইন্দুমতীর সংগে বিয়ে হয় তাঁর। ইন্দুমতীর বিশেষ আগ্রহ ছিল রোমান্টিক ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি। দু’ জনের সুখী দাম্পত্য ছিল মাত্র ছয় বছরের। অকালে প্রয়াতা হন স্ত্রী। রেখে যান তিন ছেলে এক মেয়েকে। নিজের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা সামলে এই চারজনকে মানুষ করা -সামান্য কাজ নয়। তা করে দেখিয়েছেন তিনি।
কোচবিহার শহরের ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রথম ভারতীয় অধ্যাপক ছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ। যার নাম পরিবর্তিত হয়ে এখন ব্রজেন্দ্র নাথ শীল কলেজ হয়েছে। বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের আধুনিকীকরণে তাঁর ভূমিকা ছিল অসীম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দশ বছর অধ্যাপনা করেছেন বন্ধুবর উপাচার্য্য আশুতোষের অনুরোধে। রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত আগমন উপলক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে একটি পদ সৃষ্টি করা হয়। সেখানেই তিনি আসীন হন। মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য ছিলেন এক দশক (১৯২১ — ১৯৩০)। তার আগে নাগপুরে মরিস কলেজে কিছুদিন অধ্যক্ষ ছিলেন। মোদ্দা কথা, প্রশাসক হিসেবে তাঁর দক্ষতার সাথে প্রজ্ঞা মিশে গিয়ে শিক্ষা প্রসারে অসামান্য সাফল্য এসেছে।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মিলিয়ে দশটি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেছেন তিনি। যখন যে বিষয় নিয়ে চর্চার ইচ্ছে হয়েছে, মেতে উঠেছেন তা নিয়ে। ধর্ম, দর্শন, নৃতত্ব,শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্য , বিজ্ঞান , সমাজতত্ত্ব, রাশিবিজ্ঞান ইত্যাদি ইত্যাদি । তাই তাঁকে চলমান বিশ্ববিদ্যালয় বলা হতো। অফুরন্ত জ্ঞান ভান্ডারের জন্য তাঁকে মহীশূর রাজ্যের পক্ষ থেকে তাঁকে রাজরত্নপ্রবীণ উপাধি প্রদান করা হয়।

ডি এসসি এবং নাইট ছাড়াও আচার্য্য অভিধায় ভূষিত হন ব্রজেন্দ্রনাথ। ইংরেজ পণ্ডিতগণ তাঁকে গ্রীক দার্শনিক অারিস্টট্ল ও ভারতের নাগার্জুনের সাথে তুলনা করেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলির দিকে তাকালেই বৈদগ্ধ্যের দ্যুতি উপলব্ধ হবে কয়েকটি গ্রন্থের নাম হলো :৷ 1. A Memoir on the Co- efficient of numbars: A Chapter on the theory of Numbers(1891). 2. Neo-Romantic Movement in Bengali Literature (1890 -91) . 3. A comparative Study of Chrastianity and Vaishnuavism(1899). 4. New Essay in Criticism (1903). 5.Introduction of Hindu Chemistry (1911). 6.Possitive Science of the Ancient Hindus (1915). 7.Race Origin (1915). 8.Syllabus of Indian Philosophy (1924). 9. Rammohan Roy :The Universal Man (1933). 10. The Quest Eternal(1936).

দুই বিশ্বমানের বিরল প্রতিভার একই সাথে একই ক্লাসে সহপাঠী হওয়ার নজির নেই বললেই চলে। নরেন্দ্র নাথ দত্ত ছিলেন তাঁর সতীর্থ, অকৃত্রিম ব্ন্ধু। ইতিহাসে আছে, রামকৃষ্ণ সন্দর্শনে যেদিন প্রথম যান নরেন্দ্রনাথ, তাঁর সহযাত্রী ছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ। কিন্তু ধর্ম যাপনে নিজেকে ব্রাহ্ম পরিচয়ে আবদ্ধ রেখেছেন তিনি। বিশ্ব জুড়ে বিবেকানন্দের পাশাপাশি তিনিও হিন্দু দর্শন ও ভারতবাণীর প্রচার করেছেন। তাই রামকৃষ্ণ জন্মশতবর্ষে আয়োজিত সর্বধর্ম সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণ প্রদানের জন্য আমন্ত্রিত হন যোগ্যতম ব্রজেন্দ্রনাথ শীল।
১৮৯৯ সালের ১৫ অক্টোবর রোমে অনুষ্ঠিত Congers International Des Orientalists এর অধিবেশনে তিনি খ্রিস্ট ধর্ম ও বৈষ্ণব ধর্মের তুলনা মূলক প্রবন্ধ পাঠ করেন। ইতিহাসের দর্শন ও ঐতিহাসিক তুলনামূলক পদ্ধতির আলোচনা বিশ্ব বুধ-মন্ডলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯১১ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ব জাতি কংগ্রেসে তিনি জাতিতত্ত্ব নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন। একবার কলকাতা থেকে মুম্বাইগামী ট্রেনে প্রখ্যাত পাশ্চাত্য ঐতিহাসিক এডোয়ার্ড থম্পসনের সাথে দেখা হয় ব্রজেন্দ্রনাথের। শ্রী শীল এলাহাবাদ স্টেশনে তাঁর সহযাত্রী হন। সাহেবের সাথে নানা বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি। মূলতঃ তিনিই কথা বলে যান। থম্পসন ছিলেন নীরব শ্রোতা। মুম্বাই স্টেশনে নেমে যাওয়ার আগে থম্পসন বলেন – ‘আপনার নাম জানতে চাইছিনা । ভারতবর্ষে একজনই আছেন, যাঁর প্রজ্ঞা এমন প্রসারিত। আমি নিশ্চিত আপনিই সেই ব্রজেন্দ্রনাথ শীল।’
ব্ন্ধুভাগ্য ঈর্ষণীয় ভাবে ভালো ছিল তাঁর। বাড়িতে প্রায়শ যাঁরা সান্ধ্য আড্ডায় যোগ দিতে আসতেন তাঁরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে দিকপাল। আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, পণ্ডিত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার, প্রখ্যাত চিকিৎসক নীলরতন সরকার প্রমুখ। তবে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল রবীন্দ্রনাথের সংগে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি নিয়ে তাঁর অকপট আলোচনা বা মন্তব্যকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন স্বয়ং বিশ্বকবি ।

১৯২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর বিশ্বভারতীর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতির আসন অলংকৃত করার জন্য গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ, আচার্য্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলকে আমন্ত্রণ জানান। স্বাগত ভাষণে বলেন – ‘বিশ্বের প্রতিনিধি রূপে আমাদের হাত থেকে একে (বিশ্বভারতীকে) গ্রহণ করে বিশ্বের সম্মুখে স্থাপন করুন।’
প্রাচ্যের এই মানুষটি তাঁর সময়ে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানতপস্বী হিসেবে পরিচিত হতেন। ম্যাক্স মুলার, রবীন্দ্রনাথ, রমা রোলাঁ, স্যাডলার, বিবেকানন্দের সাথে তাঁর নামও শ্রদ্ধার সংগে আলোচিত হয়। তাঁর প্রয়াণের পর কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত যথার্থ বলেছেন সক্রেটিসের পরিবারের শেষ প্রদীপ নিভে গেল। ‘সক্রেতেস বংশের শেষ কুলপ্রদীপ।’

- Advertisement -
Latest news
Related news