Wednesday, June 19, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৭৮ ।। তরু দত্ত। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

বাংলার কিটস
তরু দত্ত

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

বিনোদ মন্ডল

উনিশ শতকে বাংলার নব জাগরণের ইতিহাসে অনালোচিত অধ্যায় তরুবালা দত্ত বা সংক্ষেপে তরু দত্ত( মার্চ ৪, ১৮৫৬ — আগস্ট ৩০ , ১৮৭৭)। এই ক্ষণজন্মা প্রতিভা ‘নাজুক ফুলের মতো’ স্বল্পবয়সে ভুগে ভুগে প্রয়াত হয়েছেন। কবি তরু দত্তকে কেউ বলেন বাংলার মহিলা কিটস। কেউ বলেন ‘ইন্দো-ইংরেজি সাহিত্যের কিটস’।

পূর্বপুরুষদের বসত ছিল বর্ধমানে। তরু দত্তের বাবা গোবিন চন্দ্র দত্ত কোলকাতায় বাড়ি বানান। অতীতে যার ঠিকানা ছিল ১২, মানিকতলা স্ট্রিট। বর্তমানে ১২, রমেশ দত্ত স্ট্রিট। এই রমেশ দত্ত আসলে বিখ্যাত ঐতিহাসিক, প্রাবন্ধিক, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসক রমেশচন্দ্র দত্ত। প্রশাসক হিসেবে আলিপুর কোর্টে সহকারি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করেছেন। তরু দত্ত ছিলেন রমেশচন্দ্রের খুড়তুতো বোন।
তরুর বাবা ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিক। মা ক্ষেত্রমণি মিত্র ছিলেন সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমী নারী। সেই সেকালে এই শিক্ষিতা নারী The blood of Christ নামক ইংরেজি গ্রন্থের বাংলা তরজমা করেন। স্বভাবত:ই রক্তে সাহিত্য ছিল তরু দত্তের। দুই বোন ও এক ভাই, তারা। তিনজনই ছিলেন স্বল্পায়ু। ভাই আবজু দত্ত মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে মারা যায়। বড় বোন অরু দত্ত প্রয়াত হন ১৮৭৪ এ। যে শোক আজীবন তাড়া করেছে তরুকে। স্থায়ী ছাপ ফেলেছে তার লেখায়।

১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে স্কটিশ চার্চ কলেজের উল্টোদিকে অবস্থিত গির্জাতে গিয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন গোবিনচন্দ্র। তরুর বয়স তখন পাঁচ বছর। ছেলের অকাল প্রয়াণে গোবিন ফ্রান্সে চাকরি করবার সুযোগ পেয়ে ফিরে তাকাননি। সপরিবারে রওনা দেন।
ইউরোপ যাত্রার পেছনে গোবিনের অন্য উদ্দেশ্যও ছিল। কলকাতায় মেয়েদের পড়াশুনার সুযোগ তেমন ছিলনা। প্রথমে ফ্রান্সে পরে লন্ডনে চলে আসেন তরু। ভাষাবিদ বাবার আগ্রহে তরু কেমব্রিজে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নানা সেমিনারে ধারাবাহিক শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থাকতেন। যদি সেসব বক্তৃতার বিষয় হতো নারী, তাহলে তো কথাই নেই। ‘Higher Lectures for Women’ কিংবা ‘Lectures for Ladies’ শীর্ষক বক্তৃতামালায় তার উপস্থিতির স্বাক্ষর গবেষকদের দ্বারা প্রত্যয়িত হয়েছে।
লন্ডনে বসবাসকালে একজন সমবয়সী ব্রিটিশ বান্ধবী জোটে তাঁর। মেরি ই মার্টিন। মেরির বাবা ছিলেন সিডনি সাসেক্স কলেজের রেভারেন্ড জন মার্টিন। এই মেরির প্রভাবে তরু ঐ সময় যথেষ্ট প্রভাবিত হন। যার ফলে ফরাসী ভাষা ও সাহিত্য এবং ইংরেজি সাহিত্যের নেশায় বুঁদ হয়ে যান। গোবিনচন্দ্রের বয়ান — ‘তরু অনেক পড়াশুনা করেছে কিন্তু তার থেকেও মনে হয় সে বেশি ভাবে।’

১৮৭৪ এ বড় মেয়ের প্রয়াণে গোবিনচন্দ্র প্রায় দিশেহারা হয়ে যান। একসময় ফিরে আসেন কলকাতয়। শেকড়ের সন্ধানে। এখানে ফিরে আসার পর তরুর শ্রমসাধনার পট পরিবর্তিত হয়। ফরাসী ও ইংরেজি ভাষার পর অভিমুখ হয়ে ওঠে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য সম্ভার। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, কালিদাস রচনাবলি নিয়ে পড়াশুনা করেন। সঙ্গে লেখালেখির সূত্রপাত।
ইউরোপীয় ভাষায় সাহিত্য রচনায় অগ্রগণ্য যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্ত তেমনি নারীদের ক্ষেত্রে এই প্রসঙ্গে অগ্রগণ্যা তরু দত্ত। অরু দত্ত ও তরু দত্ত দুই বোনই লেখা ও আঁকার ক্ষেত্রে সাফল্যের নিদর্শন রেখে গেছেন। শুধু তাই নয়, দুজনে চমৎকার পিয়ানো বাজিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে দিতেন।

ফরাসী ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই ছোট ছোট কবিতা লিখেছেন তরু দত্ত। সে সব কবিতায় গীতিধর্মিতা সময়ের বিচারে যথেষ্ট আধুনিক ছিল। ছোট ছোট এক একটি কবিতা দৈনন্দিন জীবনের কান্না হাসির জলছবি, চলমান সমাজের জ্বলন্ত নানা সমস্যাকে চিত্রায়িত করেছে, চমৎকার। ইংরেজিতে লেখা তাঁর সর্বাধিক পঠিত ও চর্চিত কবিতা হলো Our Casurina Tree. ফরাসী ভাষায় রচিত প্রখ্যাত কবিদের ১৫০টি পছন্দের কবিতার তিনি ইংরেজি তরজমা করেন। গ্রন্থ নাম – A Sheaf Gleaned in French Field. ‘ফরাসী ক্ষেতে কুড়ানো এক আঁটি ফসল ‘গ্রন্থ নামেই কবি তরু দত্তের জাত চেনা যায়।
ফরাসী ভাষায় লেখা উপন্যাসের ডাক নাম ‘লা জার্নাল’। পুরো নাম ” La Jaurnal de mademoiselle d’Arvers. বাংলা করা যায় ‘শ্রীমতী দ্যারভারের দিনপঞ্জি’। এটা শুধু প্রথম কোনো বাঙালীর বললে ভুল হবে। এখনো পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের সুবাদে বলা যায় কোনো ভারতীয় লেখকের কলমে রচিত প্রথম ফরাসী উপন্যাস। বসুমতী পত্রিকায় লা জার্নালের (অনুবাদ করেন পৃথ্বীন্দ্র মুখার্জী) ধারাবাহিক প্রকাশ ঘটে। বিশ শতকের মধ্যভাগে এটি গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয়। যার ভূমিকা লেখেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। ফরাসী ভাষায় লেখা উপন্যাসটি পড়ে পাশ্চাত্যের সমালোচক এডমন্ড গুজ লিখেছেন ‘ তরু ওয়াজ আ বেটার ফ্রেঞ্চ দ্যান ইংলিশ স্কলার’।

আবার তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘Biyanka’ বা ‘Young Spanish Maiden’ কে বলা হয় প্রথম ভারতীয় মহিলার সৃষ্ট ইংরেজি উপন্যাস। তাঁর মৃত্যুর পর মুদ্রিত অন্য একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো ‘Ancient Ballads and Legends of Hindusthan’. এই গ্রন্থের ভূমিকা লেখেন গুজ সাহেব। যার শেষ অংশে তিনি লিখেছেন – ‘যখন আমাদের দেশের সাহিত্যের ইতিহাস রচিত হবে, তখন সেখানে একটি পৃষ্ঠা এই নাজুক ভিনদেশি ফুটন্ত ফুলের গানের জন্য উৎসর্গ করা হবে’। তাঁর শেষ লেখা ‘আ মন পেরে ‘(A mon pere) বিশ্ব জুড়ে উচ্চ প্রশংসায় অভিনন্দিত।
গবেষক হরিহর দাস তাঁর চিঠিপত্রগুলিকে একটি গ্রন্থে সংকলিত করেছেন। যার নাম Life and Letters of Taru Dutt. এই সব চিঠির শৈলী পাঠককে বিমোহিত করে। যক্ষ্মায় শয্যাশায়ী তরু নিত্য শুনতে পান মৃত্যুর পদধ্বনি। তবু ফ্রান্সে কাটানো একটা বছর এবং ব্রিটেনে কাটানো তিন তিনটি স্বপ্নিল বছর তাঁকে স্মৃতিমেদুর করে তোলে। তরু লেখেন — ‘হয়তো কোনও দিন একদিন ফিরব। হয়তো আর কোনদিনই ফেরা হবে না।’ না ফিরতে পারেননি। মানিকতলা সেমিটরিতে ভাই বোনের কাছে সমাধিস্থ রয়েছেন তিনি।
তরু দত্তের লেখায় সরাসরি প্রভাবিত হয়েছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যেন্দ্রনাথ। সমাজ সচেতন তরু ছিলেন স্পষ্ট ভাষিণী।১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রিন্স ওয়েলস ভারত ভ্রমণে আসেন। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে কলকাতায় যে জাঁকজমক আয়োজন করা হয়, তার জোরালো প্রতিবাদ করেন তিনি।

প্রাচ্য সাহিত্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যের সার্থক মেল বন্ধন ঘটিয়েছেন তরু দত্ত। তাঁর মধ্যে ভারতীয় ঐতিহ্য ও পরম্পরা, ফরাসীয় শিষ্টাচার ও কোমলতা এবং ইঙ্গ জৌলুস ও আভিজাত্যের ত্রিবেণি সংগম পরিলক্ষিত হয়। তাঁর রচিত অনুপম চারটি পংক্তি উদ্ধৃত করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই –
This answer at least may be given
That grace marked her figure, her action, her speech.
And such as lived near her, blameless might teach.
That life is the best gift of heaven.
(The young Captive)★

- Advertisement -
Latest news
Related news