Saturday, May 25, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৭৩ ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

বিজ্ঞানাচার্য্য
সত্যেন্দ্রনাথ বসু বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

” ডারউইন জানালেন , মানুষ অমৃতের সন্তান নয়, পশুর সন্তান। জানালেন জীব জগতের বিবর্তনই সত্য। ঔপন্যাসিকের মনে সংগতভাবেই প্রশ্ন জাগল , আমাদের মৌল বানরত্ব কি আজও অটুট ? এমনতো হতেই পারে যে উপরকার একটা পাতলা আস্তরণকে আমরা মনুষ্যত্ব বলি , একটু আঁচড় লাগলেই ভিতরকার দগদগে পশুত্ব বেরিয়ে পড়বে।” এই প্রজাতিক আত্মবিশ্লেষণ যে মহা মনীষীর,তাঁর নাম সত্যেন্দ্রনাথ বসু (০১ জানুয়ারী ১৮৯৪ — ০৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪) ।

বিজ্ঞানাচার্য্য সত্যেন্দ্রনাথের জন্ম নদীয়ায়। বাবা সুরেন্দ্রনাথ, মা – অামোদিনী দেবী। অত্যন্ত মেধাবী ও মহাস্মৃতিধর ছিলেন তিনি। এন্ট্রান্সএ অঙ্ক পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছিলেন ১১০ নম্বর। ১১টির মধ্যে ১০টি অঙ্ক কষতে বলা হয়। তিনি ১১টি অঙ্কই নির্ভুল উত্তর দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, জ্যামিতির সব অতিরিক্ত উত্তর করেন দু’তিন ধরনের বিকল্পসহ। এন্ট্রান্সএ পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। স্নাতকোত্তরে ৯২% নম্বর পান। সেকালের দিকপাল গণিতজ্ঞ অধ্যাপক দেবেন্দ্রনাথ মল্লিক সত্যেন্দ্রনাথের সার্টিফিকেটে নোট দেন – এরকম ছাত্রের শিক্ষকতার সুযোগ পেয়ে তিনি ধন্য।
তাঁর জীবনীকারগণ লিখেছেন, ছোটবেলায় পাঠ্য বইয়ের পাতা প্রায়শই ছিঁড়ে ফেলতেন । মা বকুনি দিলে মা কে প্রবোধ দিতে বলতেন, ‘ওগুলো আমার পড়া হয়ে গেছে মা’। বিজ্ঞান সাধনায় তখন পাশ্চাত্য অনেক এগিয়ে। ফলে জার্মান ও ফরাসী ভাষা শিখে ফেললেন -মৌলিক বিজ্ঞান চর্চার তাগিদে। বিজ্ঞান কলেজে ক্লাস নিতে যেতেন কোনো বই বা নোট হাতে না নিয়েই। স্মৃতি থেকে লিখে লিখে নিমেষে ভরে ফেলতেন বোর্ড। ছাত্ররা খাতায় তা টুকতে হিমশিম খেত।

কলেজে পড়ার সময় থেকেই অনুশীলন সমিতির গোয়াবাগান কেন্দ্রে যাতায়াত ছিল। পরাধীন দেশকে স্বাধীন করবার জন্য একটা আকুতি ছিল তাঁর। ধনী দরিদ্রের বিষম ফারাক যন্ত্রণাদগ্ধ করতো তাঁকে। লিখেছেন ” ধনে আমাদের দৃষ্টি বিকৃত হয়, ভাবেরও বিকৃতি হয় , দরিদ্রের প্রতি ঘৃণা জন্মে। আপনাকে বড় মনে করিয়া স্বভাব উদ্ধত হইয়া পড়ে।” ১৯০৯ সালে বয়েজ ইন লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি অন্তরের তাগিদে সবার মধ্যে শিক্ষা প্রসারের মহান যজ্ঞে নিজেকে যুক্ত করেন।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পথ চলা শুরু করে। সত্যেন্দ্রনাথ রিডার হিসাবে যোগদান করেন। ১৯২৪ সালে ঢাকায় আসেন ব্ন্ধুপ্রতিম ড. মেঘনাদ সাহা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক হিসেবে। স্বভাবতই ওঠেন তাঁর বাড়িতে। কথা প্রসঙ্গে নানা একাডেমিক সমস্যা নিয়ে মত বিনিময় চলে। একসময় সত্যেন্দ্রনাথ জানান ,’প্ল্যাঙ্কের কোয়েন্টাম তত্ত্ব’ পড়াতে গিয়ে যুক্তির অভাব বোধ করেন তিনি। শুরু হলো যৌথ অনুসন্ধান। যার ফসল প্ল্যাঙ্কের সূত্র ও আলোক প্রতিষ্ঠানের তত্ত্ব।

আইনস্টাইনের সাথে বৌদ্ধিক যোগাযোগ ঘটল। সত্যেন বাবুর সাথে যোগাযোগের পর জার্মান ভাষায় তিনি তা অনুবাদ করেন। ছাপা হয় Zeitscrift Fur physik পত্রিকায়। সত্যেন্দ্রনাথের গণনা পদ্ধতিতে তাঁর আলোক -কণিকাবাদ আরো নিবিড় গবেষণার দরজা খুলে দিল। আইনস্টাইন ফুট নোট দিলেন – ‘আমার মতে বসু নির্ধারণ পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, আমি অন্যত্র দেখাব যে , এখানে যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে তার থেকে আদর্শ গ্যাসের কোয়েন্টাম তত্ত্ব পাওয়া যায় ‘। যদিও পরবর্তী প্রজন্মের বাঙালী পদার্থ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ফুট নোট প্রয়োগ করে আইনস্টাইন সত্যেন্দ্রনাথের অব মূল্যায়ণ করেছেন।

ইউরোপ যাত্রা করলেন দু’ বছরের জন্য। গবেষণার টেবিলে তখন পদার্থ বিজ্ঞানের চার দিকপাল। আইনস্টাইন, মারি কুরি, লুই ডি ব্রগলি এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু। সাত মাসের মধ্যেই আইনস্টাইন প্রমাণ করলেন , সত্যেন্দ্রনাথের গণনা পদ্ধতি শুধু আলোক কণিকাদের ক্ষেত্রে নয় বস্তু কণিকাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সেই জন্য প্রথমদিকে এই পদ্ধতি বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন নামে অভিহিত হলেও পরবর্তীকালে বোস সংখ্যায়নের গরিমা লাভ করে। ১৯১৫ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আহ্বানে নব প্রতিষ্ঠিত কলকাতা বিজ্ঞান কলেজে প্রভাষক পদে যোগ দেন। ক্লাস নিতেন গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞানের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রথম অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৪৫ পর্যন্ত ঢাকায় থাকার পর দেশ ভাগের প্রাক্কালে ফিরে আসেন কলকাতায়।কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে আনুষ্ঠানিক অবসরের পরও এখানে এমিরেটাস অধ্যাপক হিসেবে তাঁকে কাজ করে যেতে হয়।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন আজীবন। তিনি তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘বিশ্বপরিচয়’ উৎসর্গ করেন শ্রী বসুকে। এখানে ৫টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। ১৯৩৭ সাল নাগাদ প্রকাশিত এই গ্রন্থটির প্রুফ দেখে দেন অন্য এক বিজ্ঞানী সাহিত্যিক -রাজশেখর বসু। এই গ্রন্থটির ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ প্রীতিভাজন সত্যেন্দ্রনাথের প্রতি সম্ভাষণ জানানোর পর গ্রন্থটির রচনার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতীর উপাচার্য্য পদ অলঙ্কৃত করেছেন আচার্য্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৯৫৬ -৫৮)। এই বিশ্বভারতী তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ সম্মানে ভূষিত করেছে।

স্বদেশে বিজ্ঞান গবেষণার ভিত তৈরীর প্রশ্নে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। অনেকে মনে করেন, সমকালের চারজন কৃতী বাঙালী বিজ্ঞানীই যদি ইউরোপে স্থায়ীভাবে বসবাস করে গবেষণা কার্য চালাতেন তাহলে অনেক বেশী সাফল্য আসত। এই চারজন হলেন জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
বিজ্ঞান গবেষণার পরিকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ (১৯৪৮)। ১৯৫৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক ঘোষণা করেন। যদিও ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর জাতীয় অধ্যাপক ভাতা বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়। এই দেশে অসম্ভব বলে কিছুই নেই। তবে ১৯৮৬ সালে কলকাতায় “সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌলিক বিজ্ঞান কেন্দ্র” স্থাপিত হওয়ার ফলে জাতি সামান্য হলেও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার করেছে ভেবে গ্লানিমুক্ত হওয়া যায়।

সারা জীবনে নানা স্বীকৃতি ও সম্মান লাভ করেছেন তিনি। পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ, অর্জন করেছেন। ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হয়েছেন। কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডক্টরেট’ সম্মানমূলক ডিগ্রি লাভ করেছেন। তবু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন তাঁর যা গবেষণা তাতে নোবেল পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য ছিল, যা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন।
মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন যোদ্ধা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের লক্ষ্যই ছিল তাই। ফলে পরিষদের মুখপত্র ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ প্রকাশনা শুরু হয়। এই পত্রিকার ‘রাজশেখর বসু সংখ্যা’ প্রকাশ করে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন – বাংলা ভাষাতেই বিজ্ঞানের মৌলিক প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশ সম্ভব। এই প্রসঙ্গে তাঁর সুভাষণ স্মর্তব্য – ‘যাঁরা বলেন বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব নয়, তারা হয় বাংলা জানেন না অথবা বিজ্ঞান বোঝেন না।’

- Advertisement -
Latest news
Related news