Wednesday, May 22, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা- ৭১।। সুভাষচন্দ্র বসু।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

দেশগৌরব
সুভাষচন্দ্র বসু

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

বিনোদ মন্ডল
তুমি চলে যাবার পর /
ছাপান্নটা শীত বর্ষা গ্রীষ্ম উধাও, /তুমিও
সেইথেকে প্রত্যেক জানুয়ারিতে/
পৃথিবীর এপাড়া,ও পাড়া সব মাটিতে/
তোমার অনশ্বর পায়ের ছাপ/
সব রাইফেলের তোমার বুকের বারুদ/
সব কুচকাওয়াজে তোমার সেনার ছন্দ/
পরশপাথরের মত স্বাধীনতাকে খুঁজেছে/
তোমার অন্তরে লুকিয়ে থাকা খ্যাপা……
এই ঋজু উচ্চারণ খ্যাপা কবি শুভ দাশগুপ্তের। অভিমুখ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ( ২৩ জানুয়ারি ১৮৯৭) কবিতার নাম আমি সুভাষ বলছি।
বস্তুত সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে এদেশে লক্ষ লক্ষ লেখা মুদ্রিত হয়েছে। তবু এই মানুষটির মূল্যায়ণ সন্তোষজনক মাত্রা পায়নি আজও। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন কিংবা মানবিক গুণাবলির থই মেলা ভার। সেই যে বিদ্যাসাগর চরিত্রের কোমলতা ও দার্ঢ্যতার ধ্রুপদী নমুনা বহুশ্রুত, সুভাষের ক্ষেত্রেও এই উপমার সাদৃশ্য পাওয়া যায়।

আবেগতাড়িত সুভাষ আলতো অনুষঙ্গে কেঁদে ফেলতেন। তাই তাঁর রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু তাঁকে বলতেন ক্রাইং ক্যাপ্টেন বা ক্রন্দিত অধিনায়ক। দেশবন্ধুর স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে (১৮৮০ — ১৯৭৪) মা বলে ডাকতেন সুভাষ। সুভাষের রত্নগর্ভা মা প্রভাবতী দেবী যথার্থ বলেছেন তাঁকে – ‘তুমিই সুভাষের আসল মা, আমি তো কেবল ধাত্রী। সুভাষের বাবা জানকীনাথ বসু ছিলেন সেকালের জাঁদরেল আইনজীবী। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। সাহেবের সাথে মতান্তর হওয়ায় সরকারি আইনজীবীর লোভনীয় তকমা ত্যাগ করেন। ভিন্ন প্রসঙ্গে ত্যাগ করেন রায়বাহাদুর খেতাবও। যার রেশ ছড়িয়ে যায় সুভাষচন্দ্রের আই. সি. এস. হওয়ার পরেও চাকরি না করার সিদ্ধান্তে।

চিত্তরঞ্জন যখন কলকাতা পৌরসংস্থার মেয়র হলেন সুভাষ হলেন মুখ্য কার্যনির্বাহী অফিসার। তাও বাসন্তী দেবীর অনুরোধে। একবার নয় বার বার নানা বিষয়ে চিত্তরঞ্জনের সাথে মতান্তর হয়েছে তাঁর। অধিকাংশ সময় বাসন্তী দেবী মুখোমুখি বসিয়ে মিটিয়ে দিতেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে সুভাষ বলেছেন – ‘অনেকেই ভাবেন আমরা তাঁকে (চিত্তরঞ্জন) অন্ধভাবে অনুসরণ করি। আমি নিজে অন্তত বলতে পারি যে, অজস্র প্রশ্নে তাঁর সংগে তর্ক করেছি। আমাদের ঝগড়াগুলো মায়ের মধ্যস্থতায় মিটমাট হত।’
বিবেকানন্দের রচনাবলী রাতের পর রাত জেগে আত্মস্থ করেছেন ছাত্র সুভাষ। একসময় অধ্যাত্মগামী হওয়ার কথাও ভেবে বসেন। বেনারস থেকে রামকৃষ্ণের শিষ্য ব্রহ্মানন্দ একবার তো বুঝিয়ে ফেরত আনেন কলকাতায়। অনেকে মনে করেন বিবেক-বাণীর মূর্ত রূপ সুভাষচন্দ্র। ঋষি অরবিন্দের প্রভাবও তাঁর চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়েছে।

রবীন্দ্র স্নেহধন্য সুভাষচন্দ্রের স্বপ্ন ছিল কলকাতার বুকে একটি আদর্শ সভাগৃহ নির্মাণের। প্রাক্তন মেয়রের অনুরোধে ৩৮ কাঠা জমি ১টাকায় নিজে দেয় কলকাতা পৌরসংস্থা। সুভাষের অনুরোধে সেই সভাগৃহের নাম বেছে দেন রবীন্দ্রনাথ। মহাজাতি সদন। শান্তিনিকেতনের স্থপতি নকশা বানান। ১৯৩৯ সালের ১৯ আগস্ট তদানীন্তন জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সুভাষচন্দ্র ও বিধানচন্দ্র রায়ের উপস্থিতিতে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। ঐ সভাতেই নেতাজীকে তিনি ‘দেশগৌরব’ শব্দবন্ধে অভিষিক্ত করেন। বহু ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে স্বাধীন দেশে মহাজাতি সদনের দ্বারোদ্ঘাটন করেন বিধানচন্দ্র রায়( ১৯ আগস্ট ১৯৪৮)।

কেমব্রিজ থেকে দেশে ফিরে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার ফাঁকে তরুণ সুভাষ শিক্ষকতা করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যক্ষের। ওয়েলিংটন স্কোয়ারে (আজকের সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে) ফরবস ম্যানসনে প্রতিষ্ঠিত কলিকাতা বিদ্যাপীঠে। ১৯২১ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা ও নিকটবর্তী এলাকার কলেজ পড়ুয়াদের জন্য গড়ে ওঠে এই প্রতিষ্ঠান। প্রশাসনিক কাজ ছাড়াও এখানে নিয়মিত ইংরেজি, ভূগোল ও দর্শন শাস্ত্রের ক্লাস নিতেন সুভাষ। ১০ ডিসেম্বর ১৯২১ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখের সাথে তাঁকেও অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। শেষ হয় সুভাষের শিক্ষকতা জীবন।
জেলে বন্দি অবস্থায় কলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ১৯২৪ এর ১৪ এপ্রিল। সারাজীবনে কারারুদ্ধ হয়েছেন আটবার। আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, বহরমপুর জেল, প্রেসিডেন্সি জেল। এমনকি ব্রহ্মদেশের মান্দালয় জেলেও নির্বাসিত হয়েছেন তিনি। ১৯২৭ এর ১৪ মে খুব অসুস্থতার জন্য শর্তাধীন মুক্তি পান। গভর্নর স্যার স্ট্যানলির রাজত্ব তখন। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, তাঁর শেষ জীবন কেটেছে সাইবেরিয়াতে রুশদের হাতে বন্দি হয়ে। কেউ কেউ বলেন, ব্রিটিশরা তাঁকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে কোনো অজ্ঞাত স্থানে বন্দি রেখেছিলেন।
জাতীয় কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির সভাপতি ছিলেন ১৯২৭ — ১৯২৯ পর্যন্ত। ১৯২৯ — ১৯৩১পর্যন্ত নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সভাপতিত্ব করেছেন। ১৯৩৮এ হরিপুরা কংগ্রেসে প্রথম সর্বভারতীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৩৯ এ ত্রিপুরী কংগ্রেসে ২০৩ ভোটের ব্যবধানে গান্ধীজী মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাস্ত করে দ্বিতীয়বার সভাপতি নির্বাচিত হন। অনিবার্য কারণে ৩ মে ১৯৩৯ এ নতুন দল গঠন করেন ফরোয়ার্ড ব্লক নামে। তিনি হন তাঁর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

নানা বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে গান্ধীজীর মতাদর্শের সাথে তাঁর সংঘাত হয়েছে বার বার। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন ভগৎ সিংয়ের ফাঁসির ঘটনায় (২৩ মার্চ ১৯৩১)। আন্তরিক ভাবে চেষ্টা করলে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা ভগৎ সিংকে বাঁচাতে পারতেন বিশ্বাস ছিল সুভাষের। ক্ষুব্ধ সুভাষ গান্ধী-আরউইন চুক্তি বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। ফলস্বরূপ আবার কারাবাস। নির্বাসন ।
কংগ্রেস যখন অধিরাজ্য মর্যাদা বা ডোমিনিয়ান স্টেটাসের দাবি রাখছে, তিনি তখন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী করছেন। ঐতিহাসিক লাহোর অধিবেশনে তা গৃহীত হচ্ছে। জহরলালের সম্মতিতে। তাঁর দেশত্যাগ ,ছদ্মবেশ ধারণ, আজাদ হিন্দ ফৌজের মাধ্যমে লড়াকু নেতৃত্বদান রূপকথার চেয়েও বর্ণময়।

সুভাষচন্দ্রের মতো বীরের মৃত্যু নেই। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের হৃদ স্পন্দন। তাঁর মৃত্যুদিন আজও রহস্যে আবৃত। যদিও সুভাষ গবেষক এবং উত্তর সাধিকা কৃষ্ণা বসু বলেছেন -‘ সায়গন থেকে মাঞ্চুরিয়া যাচ্ছিলেন উনি। কিন্তু যে প্লেনে উনি উঠেছিলেন, সেটা তখন তাইপের বিমানবন্দরে একটি দুর্ঘটনায় পড়ে। উনি খুবই অগ্নিদগ্ধ হয়েছিলেন এবং যে ডাক্তার দেখেছিলেন, তিনি আমাদেরও বলেছেন যে,গভীর ভাবে পুড়ে যাবার ফলে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ১৯৪৪ এর ১৮ আগস্ট সন্ধ্যেবেলা।’ (১৯৭১ সালে রচিত প্রবন্ধের সম্পাদনা করেন সুমণ্ত্র বসু/আনন্দ বাজার পত্রিকা/১৭.০১.২০২১ অনলাইন) ।

- Advertisement -
Latest news
Related news