Tuesday, June 25, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৭০।। সি.ভি. রমন- বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

আলোক বিজ্ঞানী
সি. ভি. রমন বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

তখনকার মাদ্রাজ শহর।প্রেসিডেন্সি কলেজের একটি ছাত্র আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন। দেখান কলেজের স্যারকে। শিক্ষক তেমন গুরুত্ব দেননি। বিরক্ত অথচ আত্মবিশ্বাসী ছাত্রটি পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল philosophical magazine এ তা পাঠিয়ে দেন। ডাক মারফত। প্রকাশিত হয় সযত্নে। লেখাটির শিরোনাম ছিল- Unsymmetrical diffraction -bands due to a rectranguler aperture. ছাত্রটির নাম চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন ( ০৭ নভেম্বর ১৮৮৮ — ২১ নভেম্বর ১৯৭০)
বিশিষ্ট ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এবং নোবেল বিজেতা ড. র‍্যালে এই লেখা পড়েন। অসাধারণ মেধাবী রমন পরের লেখায় কিছু তাত্ত্বিক জটিল সমস্যা সমাধানের পথ নির্দেশ করেন। ড. র‍্যালে সেগুলো পড়ে অভিনন্দন জানিয়ে তাঁকে একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি প্রাচ্যের কোনো অধ্যাপক ভেবে ‘প্রফেসর’ সম্বোধন করেন ‘ছাত্র’ রমনকে।

মাদ্রাজের ত্রিচিনাপল্লীতে এক পণ্ডিত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম রমনের। বাবা চন্দ্রশেখর ছিলেন শিক্ষক ও অধ্যাপক। মা পার্বতীর ছিল সংস্কৃতের প্রতি অগাধ আকর্ষণ। স্থানীয় একটি ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে পাঠের পর প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে বিশাখাপত্তনমে কলেজে ভর্ত্তি হন রমন। সেখান থেকে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে পদার্থবিদ্যায় বি. এ. এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এ.পাশ করেন। সব পরীক্ষাতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন রমন।
ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে আই সি এস দিতে ইংল্যান্ড পাঠানো গেলনা। তখন রমন কলকাতায় এসে সর্বভারতীয় ফাইনান্স সার্ভিস পরীক্ষায় বসেন। এখানে বিষয় ছিল সংস্কৃত , ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি। সব বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বরই পান তিনি। স্মৃতি চারণায় লঘু পরিহাসচ্ছলে বলেছেন – ‘পরীক্ষা দিতে যারা এসেছিল, আমি তাদেরকে দেখেই বুঝেছিলাম , আমি প্রথম হবো ।’                                       মাত্র উনিশ বছর বয়সে চন্দ্রশেখর সহকারী প্রধান হিসাব পরীক্ষকের পদে আসীন হন। পরের বছর (১৯০৮) হন ডেপুটি অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল। কিন্তু মন পড়ে আছে যার বিজ্ঞানে তাকে কতদিন এভাবে আটকে রাখা যায়? তীব্র যন্ত্রণায় পথ খুঁজছেন রমন।

এই ফাঁকে কলকাতা আসার আগেই স্বনির্বাচিত পাত্রীকে বিয়ে করেছেন। ১৯০৭এর ৬ মে। লোক সুন্দরী আম্মাল তাঁর স্ত্রী। স্থানীয় একটি অনুষ্ঠানে বীণাবাদনরতা আম্মালকে দেখে পছন্দ হয়ে যায় তাঁর। তাঁদের দুই যশস্বী সন্তান বিজ্ঞান সাধনায় ব্রতী হন। রমনের ভাতুষ্পুত্র সুব্রহ্মন্যন চন্দ্রশেখর ১৯৮৩ সালে এই পদার্থবিজ্ঞানেই নোবেল জয়ী হন।
কলকাতায় চাকরি ও সংসারের গোলোকধাঁধায় বিবিক্ত মন নিয়ে পথে পথে হাঁটতেন আর পথ খুঁজতেন। এমন সময় একদিন অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটি সাইনবোর্ডে চোখ আটকে যায় রমনের। ২১০, বৌ বাজার স্ট্রিটের সেই সাইন বোর্ডে লেখা ছিল -‘ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’। বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার পরাধীন দেশে বিজ্ঞান গবেষণার জন্য এই প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন পুত্র অমৃতলাল সরকার। কার্যকারিতা হারিয়ে তখন ধুঁকছে সে অফিস। এমন সময় রমনের প্রবেশ ।

অমৃতলাল এমনই একজন মেধাবী গবেষকের অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি সাদরে গ্রহণ করেন রমনকে। এখান থেকে রমনের গবেষণাকর্ম প্রাণ শক্তিতে মুখর হয়ে ওঠে।
কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি দেশি বিদেশী নানা পত্র পত্রিকায় প্রায় ত্রিশখানি মৌলিক গবেষণার ওপর প্রবন্ধ লিখে পাঠান। পরিচিতি দ্রুত ও ব্যাপক বাড়তে লাগলো রমনের। এমন সময় অমৃতলালের মৃত্যু হয়। প্রতিষ্ঠানের অবৈতনিক সচিব হন সি. ভি. রমন।
আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসু সহ সেকালের কলকাতায় সারস্বত সমাজে পরিচিতি বাড়ে। স্যার রাসবিহারী ঘোষ, ড. নীলরতন সরকার, স্যার তারকনাথ পালিত প্রমুখের দানে গড়ে ওঠে বিজ্ঞান কলেজ।

স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদার আহ্বানে মোটা মাইনের চাকরী হেলায় ছেড়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগের দায়িত্ব নেন রমন। ১৯১৭ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন। অকপটে বলেছেন – আমার জীবনে যাবতীয় সাফল্যের মূলে আছে দুটি ঘটনা। এক ড. মহেন্দ্রলাল সরকারের ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’ গবেষণায় সুযোগ পাওয়া এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষের সংস্পর্শ পাওয়া।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েই তিনি পুরনো বাসা ছেড়ে দিয়ে অ্যাসোসিয়েশন সংলগ্ন একটি বাড়িতে উঠে আসেন। দুটো বাড়ির মাঝখানে দেওয়াল ভেঙে দরজা বসিয়ে দেওয়া হয়। ফলে, দিনের বেলায় বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাতে গবেষণাগারের কাজে সময় দিতে পারলেন নিরন্তর।

রমনের বিষয় ছিল মূলতঃ কম্পনতত্ত্ব ও আলোক বিজ্ঞান। বেহালাতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন নিজে। ড্রাম বাজাতেন সুন্দর। এর থেকেই শ্রুতিবিদ্যার (Acoustic) প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। সাথে ছিল লোকসুন্দরীর বীণা বাদন। যে রমন স্ক্যাটারিং বা রমন এফেক্টের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কারে (১৯৩০) ভূষিত হন – সেই আবিষ্কারের পেছনেও বিশাল কোনো যন্ত্রপাতি ছিলনা। মার্কারি ল্যাম্প, বেনজিন এবং একটি আলোকবীতন যন্ত্র ছিল প্রধান হাতিয়ার।
আসলে ড .রালের এই সংক্রান্ত কিছু গবেষণাপত্র পড়ে এ বিষয়ে আগ্রহ বাড়ে তাঁর। ১৯২১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান কংগ্রেসে যোগদানের আমন্ত্রণ পান রমন। জাহাজে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরের সুনীল জলরাশি তাঁকে চঞ্চল ও জিজ্ঞাসু করে তোলে। করপুটে নিলে নীল বর্ণ হারিয়ে যায় কোথায়? দেশে ফিরে শুরু হয় গবেষণা।

এই উত্তরই আসলে রামন এফেক্ট। তিনি দেখালেন, আলোর তরঙ্গের যদি কোনো কঠিন তরল অথবা গ্যাসীয় অণুর সাথে সংঘাত হয় এবং এর ফলে যদি আলোক তরঙ্গের কম্পন সংখ্যা বেড়ে যায় অথবা কমে যায়, তবে এর ফলে আলোর বিকিরণের সৃষ্টি হয়। সূর্যের আলোক তরঙ্গ ও সমুদ্রের জলরাশির সংঘাতের ফলে যে আলোক বিকিরণ ঘটে তার ফলে সমুদ্রের জল নীলাভ দেখায়।

তাঁর নানা গবেষণা চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজে বিরাট অবদান রেখেছে। এক্সরের ওপর আল্ট্রাসোনিক ও হাইপোসোনিক শব্দের প্রভাব, শরীরে রোগাক্রান্ত কোষ নির্ণয়ে কাজ করে রমন স্পেকট্রোস্কপি ,ইত্যাদি। ১৯২৬ সালে জার্নাল অব ফিজিক্স পত্রিকাটি সম্পাদনা শুরু করেন। ১৯৪৩এ প্রতিষ্ঠা করেন ত্রিবাঙ্কুর কেমিক্যাল এন্ড ম্যানুফ্যাকচারিং কম্পানি লিমিটেড। যারা দেশলাই কাঠির জন্য পটাশিয়াম ক্লোরেট উৎপাদন করত।
বিজ্ঞানে প্রথম এশীয় এবং অ -শ্বেতাঙ্গ হিসেবে নোবেল অর্জন করেন তিনি। একইভাবে ১৯৩৩ এর ব্যাঙ্গালোরের Indian Institute of Science তে প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞানী হিসেবে ডিরেক্টরের পদে আসীন হন। ১৯৩৩এ তৈরী করেন Indian Academy of Sciences এবং বসু বিজ্ঞান মন্দিরের আদলে ১৯৪৮ সালে তৈরী করেন Raman Research Institute.
১৯২৯ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের ১৬ তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তিনি। অসংখ্য পুরস্কারে বিশ্ব জুড়ে বন্দিত হয়েছেন রমন। পেয়েছেন ভারতরত্ন (১৯৫৪), যদিও নেহেরুর বিজ্ঞান নীতির প্রতিবাদে তা ত্যাগ করেছেন। ১৯৫৭ সালে পেয়েছেন লেনিন শান্তি পুরস্কার। তিনিই স্বাধীনদেশে প্রথম জাতীয় শিক্ষকের মর্যাদা লাভ করেন। তাঁর রমন এফেক্ট আবিষ্কারের দিনটিকে (২৮ফেব্রুয়ারী) জাতীয় বিজ্ঞান দিবস হিসাবে পালন করা হয়।
সহজ সরল পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান এই মানুষটির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর নিজের বাগানে শেষ শয্যায় শায়িত হন ।★

- Advertisement -
Latest news
Related news