Monday, June 17, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৬৮ ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

কথাশিল্পী
শরৎচন্দ্র বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

দেশব্ন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ‘নারায়ণ’ পত্রিকার জন্য একটি গল্প চেয়ে তাঁকে চিঠি লেখেন। সংগে একটি ব্ল্যাঙ্ক চেক, সম্মান দক্ষিণা। চিঠিতে লিখেছিলেন ‘আপনার মতন শিল্পীর অমূল্য লেখার মূল্য স্থির করবার স্পর্ধা আমার নেই, টাকার ঘর শূন্য রেখে চেক পাঠালুম,এতে নিজের খুসি মত অঙ্ক বসিয়ে নিতে পারেন’। নিরাশ করেননি কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র(১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬ — ১৬ জানুয়ারী ১৯৩৮)। গল্প দেন এবং পারিশ্রমিক নেন ১০০ টাকা।

হুগলী জেলার ব্যান্ডেল, দেবানন্দপুরে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের ঘরে জন্ম তাঁর। বাবা মতিলাল, মা ভুবনমোহিনী। মা আদর করে ‘ন্যাড়া’ নামে ডাকতেন। কৈশোরে ওটাই ছিল ডাকনাম। দুরন্ত কিশোর ন্যাড়া কিছুদিন পিয়ারী পণ্ডিতের পাঠশালায় যাতায়াত করে। পরে ১৮৮৬ সাল নাগাদ আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজে সংস্কৃতি পাগল মতিলাল শ্বশুরালয়ে সপরিবারে চলে যান ।ভাগলপুরে। বছর তিনেক পর আবার পৈত্রিক ভিটেতে ফিরে আসেন। প্রবেশিকা পাশ করলেও এফ. এ.উত্তীর্ণ হননি শরৎচন্দ্র।

মতিলাল ছিলেন গ্রন্থকীট। বই পত্র পুথি-পাঁচালীতে ডুবে থাকতেন। যাত্রাপালা লিখতেন। যদিও কোনো লেখাই শেষপর্যন্ত পূর্ণতা পায়নি। তাঁর ইচ্ছে পূরণ করেন শরৎচন্দ্র। প্রথমে আত্মপ্রকাশে তীব্র অনীহা ছিল। তাই অনিলা দেবী ছদ্মনামে কিছু কিছু লেখা পাঠান। বিশেষত যমুনা পত্রিকায়। এখানে তাঁর ‘রামের সুমতি’ প্রকাশ পায়। পরে বিন্দুর ছেলে, পথনির্দেশ উপন্যাস ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়। প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ হল -বড়দিদি। অনিলা দেবী ছদ্মনামে। অনেকে পড়ে বিস্মিত হন। এ নিয়ে সাহিত্যিক মহলে নানা মজার খবর চালু আছে। কেউ কেউ ভাবেন রবীন্দ্রনাথই অনিলা দেবী ছদ্মনামে এই উপন্যাস লিখেছেন। যমুনা পত্রিকায় এই নামে বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় তাঁর। নারীর লেখা, নারীর মূল্য, কানকাটা , গুরু-শিষ্য সংবাদ ইত্যাদি।

প্রধানতঃ কথাসাহিত্যিক ছিলেন তিনি। তাঁর গল্প ও উপন্যাস নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন ওঠে পাঠক মহলে। শুধু চরিত্রহীন যেদিন প্রকাশ পায়, সেইদিনই সাড়ে চারশো কপি বিক্রি হয়ে যায়। দাম ছিল সে বাজারে কম নয় -সাড়ে তিন টাকা। এই বিক্রির রেকর্ড ভাঙেন তিনি নিজেই পরে। পথের দাবী উপন্যাস একদিনে বিক্রিতে চরিত্রহীনকে ছাপিয়ে যায়। তাঁর শ্রীকান্ত উপন্যাস চার খণ্ডে বিধৃত।
বোহেমিয়ান শরৎচন্দ্রের ৬১ বছরের জীবনের বর্ণময় নানা পর্ব কেটেছে নানা জায়গায়। দেবানন্দপুর থেকে ভাগলপুর পর্বে তাঁর হয়ে ওঠা। শ্রীকান্ত উপন্যাসে যে জীবনের জলছবি প্রতিভাত। গান গেয়েছেন। গুরুর চ্যালা হয়ে ঘুরেছেন। অনিশ্চিত বেকার জীবনে নানা বাঁক মোড় অতিক্রম করেছেন। ২৭ বছর বয়সে মেসোমশায়ের কাছে বর্মায় পাড়ি জমিয়েছেন। সেখানে ১৯০৩ থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত থেকেছেন। বর্মী ভাষা রপ্ত করেছেন। ৭৫ টাকা বেতনে চাকরিতে ঢুকেছেন বার্মা রেলওয়ের হিসাব দপ্তরে। কেরানিগিরির অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম নয় অবশ্য। এর আগে বনেলি স্টেটে সেটেলমেন্ট অফিসারের সহকারি ছিলেন কিছুদিন। দাসত্বের চাকরিতে মন ভরেনি। ছেড়ে এসেছেন ।

ব্রহ্মদেশে থাকবার সময় শান্তি দেবীকে বিবাহ করেন। পরে স্ত্রী বিয়োগ হয়। এখানে থাকার অভিজ্ঞতা প্রতিভাত হয়েছে ‘পথের দাবী’ উপন্যাসে। এখানেই তিনি তাঁর বিখ্যাত তৈল চিত্র ‘মহাশ্বেতা’ অঙ্কন করেন। এদিকে মেসোমশায় অঘোর বাবুর মৃত্যু হলে মাসীমা সপরিবারে কলকাতায় চলে যান। ১৯১৬ সালে শরৎচন্দ্র ফিরে আসেন হাওড়ার শিবপুরে। পানিত্রাসে বাড়ি তৈরী করেন। জীবনের শেষ পর্ব কাটে সামতাবেড় ও কলকাতায়।

জাতীয় কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্বে দিয়েছেন শরৎচন্দ্র। হাওড়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি থেকেছেন। পরে সক্রিয় রাজনীতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে সরে গেছেন। তবে লেখালেখিতে রয়ে গেছে স্থায়ী ছাপ। পথের দাবীর সব্যসাচী সে কথাই বলে। স্বদেশী আন্দোলনের প্রভাবে এই উপন্যাস সমকালীন রাজনীতি ও সমাজ জীবনের শিল্পরূপ হয়ে উঠেছে। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারী ব্রিটিশ সরকার এই গ্রন্থটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ও বই দোকান থেকে বাজেয়াপ্ত করে । এছাড়াও তাঁর রাজনীতি সচেতন মানসিকতার পরিচয় মেলে ‘তরুণের বিদ্রোহ’ প্রবন্ধে।
সঙ্গপ্রিয় শরৎচন্দ্র আজীবন নানা সভা সমিতিতে সক্রিয় থেকেছেন। যৌবনে ‘সাহিত্য চক্র’, ‘কুঁড়ি সাহিত্যিক’ প্রভৃতি সাহিত্য সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। হাতে লেখা পত্রিকা ‘ছায়া’ সম্পাদনা করেছেন। পরবর্তীকালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সদস্য হয়েছেন। নানা নন্দনতাত্ত্বিক বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সংগে মতান্তর হয়েছে কখনো কখনো। নিজেই বলতেন, সাহিত্যে গুরুবাদ চলেনা। অথচ রবীন্দ্রনাথকে আজীবন গুরুত্ব দিয়েছেন সশ্রদ্ধ।
সমাজের অন্ত্যজ মানুষের দুঃখ বেদনা, নারী সমাজের বুক ফাটা আর্তনাদ তাঁর কলমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শরৎচন্দ্র সহজ সরল ভাষ্যে পাঠকের হৃদয় নিবিড়ভাবে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই শুধু সেকালে নয়,একালে ও তাঁর বই বেস্ট সেলারের মর্যাদা পায়, কলেজ স্ট্রিটে, বইমেলায়। শুধু নতুন নতুন পাঠক সৃষ্টি নয়, তিনি বাংলা থিয়েটারে প্রাণ সঞ্চার করেন। তাঁর বিরাজ বৌ কাহিনীর নাট্যরূপ দেন ভূপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। স্টার থিয়েটারে তা অভিনীত হয়। দেনা পাওনা নাট্য রূপ দেন শিবরাম চক্রবর্তী । শিশির কুমার ভাদুড়ী অভিনয় করেন। এ ছাড়াও রমা, চরিত্রহীন ,অচলা ,বিজয়া প্রভৃতি নাটকের মধ্যে বাংলা রঙ্গ মঞ্চের ইতিহাসে কালজয়ী আসন দখল করে থাকবেন তিনি ।

নাটকের পাশাপাশি চলে আসে চলচ্চিত্র প্রসঙ্গ।আঁধারে আলো, দেবদাস, শ্রীকান্ত, বিজয়া, পণ্ডিত মশাই প্রভৃতি ছবি নির্মিত হয়েছে। দেবদাস তো নানা ভাষায় নানা ভাবে চলচ্চিত্রায়িত হয়ে চলেছে। ফকির থেকে সাহিত্য সেবার মাধ্যমে ধনাঢ্য হয়েছিলেন তিনি। জীবদ্দশাতে সেকালেই হিন্দি সহ দেশের নানা আঞ্চলিক ভাষায় তাঁর জনপ্রিয় গল্প উপন্যাস অনূদিত ও মুদ্রিত হয়েছে।
দ্বিতীয়বার পাণি গ্রহণ করেন হিরণ্ময়ী দেবীর। সন্তানহীন জীবনে গাছগাছালি,পাখ পাখালি এবং জীব জন্তুকে যত্ন করে সময় কাটিয়েছেন। শেষ সময়ে যকৃতের ক্যান্সারে কষ্ট পেয়েছেন নিদারুণ। জ্বর ও ব্যথা উপশমের আশায় পাকস্থলিতে অস্ত্রোপচার করান। ১২জানুয়ারী ১৯৩৮। চারদিনের মাথায় ইহলোক ত্যাগ করেন। বিশাল শোভাযাত্রায় শোকস্তব্ধ বাঙালী তাদের প্রিয় সাহিত্যিককে নিয়ে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সমবেত হন ।

জনচিত্তজয়ী মানুষটি সাহিত্য গবেষক এবং ইতিহাসকারদের একাংশের কাছে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পাননি। পাননি বড় কোনো সম্মানও। ১৯২৩ এ জগত্তারিণী পদকে সম্মানিত করে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৩৬ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডি. লিট. উপাধি প্রদান করে। তার মধ্যে ব্যতিক্রমী ঘটনা হলো পাশ্চাত্যের সাহিত্য সমালোচক ও মনীষী রমাঁ র‍্যঁলা তাঁর শ্রীকান্ত উপন্যাস পাঠের পর মহা গ্রন্থটিকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার যোগ্য বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। ★

- Advertisement -
Latest news
Related news