Saturday, May 25, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৬৭, দাদা ঠাকুর।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

কিংবদন্তী
দাদা ঠাকুর বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

কোলকাতার রাজপথে এক হকারকে হেনস্থা হতে দেখে গাড়ি থেকে নেমে তাকে উদ্ধার করেন তৎকালীন মেয়র সুভাষচন্দ্র বসু। পথে ছড়িয়ে পড়া পত্র পত্রিকা তুলে প্রদান করেন প্রবীণ হকারের হাতে। প্রণাম করেন মহা নাগরিক। জিতে নেন হকারের হৃদয়। তিনি সামান্য হকার নন। সম্পাদক, সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক কিংবদন্তি দাদা ঠাকুর (১৮৮১ — ১৯৬৮)।

প্রমথ নাথ বিশী তাঁকে ‘এযুগের শ্রেষ্ঠ হিউমারিস্ট’ আখ্যা দিয়েছেন। বাস্তবিক, তিনি বাঙালী মননে অমর হয়ে আছেন বাক-কলা-বিদ হিসেবে। জন্মেছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার দরফপুর গ্রামে। ২৭ এপ্রিল। প্রয়াণ দিবসও অভিন্ন। জঙ্গিপুর হাই স্কুল থেকে পাশ করে বর্ধমান রাজ কলেজে ভর্তি হন এফ. এ. ক্লাসে। অর্থাভাবে মাঝপথে ছেড়ে দেন লেখাপড়া। পিতৃদত্ত নাম শরৎচন্দ্র পণ্ডিত।

স্বভাবকবি এই মানুষটি এক সাহেবের কাছে ছেচল্লিশ টাকা দিয়ে একটি পুরনো প্রেস কেনেন রঘুনাথ গঞ্জে। নাম দেন পণ্ডিত প্রেস। সেখান থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রকাশিত হতে শুরু করে জঙ্গিপুর সংবাদ। তখন বয়স একুশ বছর। শুরু হয় ‘বিদূষক’ পত্রিকা। রঙ্গব্যঙ্গ মূলক রচনায় সাজানো। বোতলপুরাণ নামে গ্রন্থ সিরিজও। ক্রমে খ্যাতি প্রসারিত হয় কোলকাতা পর্যন্ত। খালি পা,গায়ে ফতুয়া বা উড়নি। হাঁটুর ওপর তোলা মোটা ধুতি পরনে। যা দেখে মুগ্ধ হন সুভাষচন্দ্র। সরলতার সংগে বলিষ্ঠতার মিশেল। তাই খালি পা নিয়ে লোকে ব্যঙ্গ করলে তিনি নিজেকে ‘খলিফা’ অভিহিত করতেন।

পণ্ডিত প্রেসে কোনো স্থায়ী কর্মচারী ছিলোনা। ব্ন্ধু ও গুণগ্রাহীদের সহায়তা নিয়ে সস্ত্রীক চালাতেন এই প্রেস। দাদাঠাকুরের ভাষ্য – ‘আমার ছাপাখানার আমিই প্রোপ্রাইটার, আমি কম্পোজিটার, আমি প্রুফরিডার, আর আমিই ইঙ্কম্যান। কেবল প্রেস ম্যান আমি নই, সেটি ম্যান নয় -উওম্যান অর্থাৎ আমার অর্ধাঙ্গিনী। ছাপাখানার কাজে ব্রাহ্মণী আমাকে সাহায্য করেন, স্বামী – স্ত্রীতে মিলে আমরা ছাপাখানা চালাই।’

অর্থস্বাচ্ছন্দ্য ছিলনা বলে সমাজে কৌলিন্য লাভে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে তাঁকে। বাবু কৃষ্ণকুমার মিত্রের উদ্যোগে Editor’s Association এর সদস্য পদ লাভ করেন। খেপে যায় অভিজাত গোষ্ঠী। অভিযোগ আনা হয় : Sarat Chandra Pandit is a dancing singing and hawking editor of a litile magazine. As he is spoiling the prestige of an editor, he should be expelled from Editor’s Association.

কোলকাতা বেতার কেন্দ্রে যুক্ত ছিলেন দাদা ঠাকুর। বিখ্যাত সব সহকর্মী। নৃপেন্দ্র কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, রাইচাঁদ বড়াল, কাজী নজরুল ইসলাম, পঙ্কজ কুমার মল্লিক ,বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভক্ত। দীর্ঘ দিন যুক্ত থেকে জনচিত্ত জয় করেন। একবার রেডিওতে ফ্যাশান নিয়ে বলতে গিয়ে ফ্যাসাদে পড়েন। আধুনিক মাতৃসমাজের পোষাক নিয়ে কিঞ্চিত কটাক্ষ করেছিলেন। সমালোচনার ঝড় ওঠে। বেতার-অধিকর্তা স্টেপলটন সাহেব অফিসে ডেকে পাঠান।

সময়সচেতন দাদাঠাকুর যথাসময়ে সাহেবের সামনে হাজির হন। ধুতি-চাদর শোভিত, নগ্নপদ দাদাঠাকুরের আপাদমস্তক জরিপ করে সাহেব বলেন – ‘দিস ইজ ইওর ফ্যাশন?’ তারপর তাঁর কাছে ফ্যাশনের সংজ্ঞা জানতে চান। সাহেবকে দাদা ঠাকুর যে লিখিত উত্তর দেন ,তা এখনো আকাশবাণীর মহাফেজখানায় সংরক্ষিত আছে – “ফ্যাশন ইজ দ্য থিং দ্যাট এরাউজেজ প্যাশন ওফ দি আদার সেক্স।”

উত্তর দেখে বিস্মিত সাহেব শরৎচন্দ্রের পারিশ্রমিক দশ টাকা বাড়িয়ে দেন। প্রতিমাসে ন্যূনতম চারটি অনুষ্ঠানের বরাত পান তিনি। হাওড়া স্টেশন থেকে গস্টিন প্লেসে বেতার কেন্দ্র পর্যন্ত চিরদিন খালি পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেছেন দাদাঠাকুর।
প্যলিন্ড্রোম বা উভমুখী শব্দ বা আস্ত বাক্য নির্মাণে বাংলদেশে জুড়ি মেলা ভার ছিল তাঁর। ভাষায় অনন্য দখল ছিল বলে তাৎক্ষণিক কথার পিঠে কথা সাজিয়ে চমৎকার উত্তর দিতে পারতেন। বোতলের আকারে সংকলিত বোতলপুরাণে তাঁর ছড়া কবিতা গানগুলি সংকলিত হতো। তিনি নিজেই নেচে গেয়ে সেসব বিক্রয় করতেন।
রঙ্গ ব্যঙ্গ এবং তীব্র সমাজবোধ তাঁর সৃষ্টিকে ক্ষুরধার করে তুলতো। তাঁর জীবন নিয়ে ১৯৬২ সালে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচিত্র নির্মিত হয়েছিল। নাম ভূমিকায় অভিনয় করে ছবি বিশ্বাস জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হন। সহ অভিনেতা ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় , বিশ্বজিৎ, তরুণ কুমার। সংগে সুলতা চৌধুরী। নিজে সে ছবি দেখে ছবি বিশ্বাসের তারিফ করেছেন দাদা ঠাকুর।

জঙ্গীপুর সংবাদের আয়ের মূল উৎস ছিল মুন্সেফ কোর্টের বিজ্ঞাপণ। তাই বলে মহকুমা হাকিমের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দ্বিধা করেননি তিনি-
চোরে চোরে মাসতুতো ভাই
হাকিমে মুন্সেফে কেসতুতো ভাই।

বহরমপুর পৌরসভা নির্বাচনের একটি ঘটনা তো মিথ হয়ে আছে। নির্বাচনে টাকার খেলা শুধু একালে নয়, সেকালেও প্রবল চালু ছিল। সেবার রমণী মোহন ও নীলমণি ভট্টাচার্য মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। দাদাঠাকুরের প্রাক নির্বাচনী ঘোষণা মিলে যায়। রমণী মোহন জয়লাভ করেন। সাংবাদিক ও ঘনিষ্ঠ মহল তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এটা তো জানাই ছিল। রমণী জিতবে। নীলমণি(NIL MONEY) কখনো রমণীর (RAW MONEY)-র সাথে টক্কর দিতে পারে?
এমনই নানা সরস ঘটনা তাঁর দীর্ঘ দিনের সাথী নলিনীকান্ত সরকার রচিত ‘দাদাঠাকুর’ এবং তরুণ চক্রবর্তী রচিত ‘কথা সাগরেষু’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যে কবিতাটি লিখেছিলেন তার থেকে দুটো পংক্তি উদ্ধৃত করা যাক
‘এই আমাদের কোণের মানুষ দাদাঠাকুর
এই আমাদের মনের মানুষ দাদাঠাকুর।’
এহেন রবীন্দ্রনাথকে জড়িয়ে তাঁকে একজন প্রশ্ন করেন -আপনি কখনো রবীন্দ্রনাথকে দেখেছেন? দাদাঠাকুর সহাস্যে উত্তর দেন ‘না দেখিনি, তবে দেখা হলে বলতুম আপনি যেমন ঠাকুর, আমিও তেমন পণ্ডিত।’

শরৎচন্দ্রের সংগে বাক বিন্যাস ও কম মজাদার নয়। তখন সবে চরিত্রহীন প্রকাশিত হয়েছে। বিপুল চাহিদা। এক সাহিত্য সভায় দাদা ঠাকুরের আগে উপস্থিত হন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ‘বিদূষক’ সম্পাদককে স্বাগত জানাতে তিনি হেসে বলেন – ‘বিদূষক শরৎচন্দ্র’। উত্তরে দাদাঠাকুর তাঁকে সর্ব সমক্ষে ‘চরিত্রহীন শরৎচন্দ্র’ সম্বোধন করেন। কাজী নজরুল ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ শুভেচ্ছা পাঠান ‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু/ আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু’। দাদাঠাকুর লেখেন ‘ধুমকেতুর প্রতি বিষহীন ঢোড়ার অযাচিত আশীর্বাদ।’
জনৈক ব্যক্তির প্রশ্ন ছিল তাঁর পদবী পণ্ডিত কেন? ছড়ায় তাৎক্ষণিক উত্তর দেন- হবে নাই বা কেন? বস্তু যখন খণ্ড খণ্ড হয়/ তখন তাকে বলি খণ্ডিত/ আমি যেখানেই যাই সব কাজ করি পণ্ড/ তাই আমি পণ্ডিত।
নিবিড় দুঃখেও ভেঙে পড়তেন না। বরং সরসতার চাদরে জড়িয়ে দিতেন কথা মুখ। ৬৪ দিনের রোগ ভোগের শেষে যেদিন প্রিয় পুত্র প্রয়াত হলো পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি রক্ষায় সেদিনই কল্লোল দপ্তরে হাজির হন দাদাঠাকুর। ব্ন্ধুদের সমবেদনার উত্তরে ব্যক্ত করেন – ‘৬৪ দিন অনেক কষ্টে ড্র রেখেছিলুম। কিন্তু আজ গোল দিয়ে গেল’।

- Advertisement -
Latest news
Related news