Monday, May 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৬৫ ।। মুকুন্দ দাস ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

চারণ কবি
মুকুন্দ দাস বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতিতে রূপান্তরের নমুনা প্রকৃতিতে দেখা যায়। পুরা কথায় দেখি, দস্যু রত্নাকর থেকে মহাকবি বাল্মীকির রূপান্তর। উনিশ শতকের শেষে বিশ শতকের সূচনায় বাংলাদেশ পেয়েছে তেমন এক বিরল নিদর্শন। বরিশাল অতিষ্ঠ করে তোলা যজ্ঞা গুন্ডা রূপান্তরিত হয়ে পরিণত হন চারণ কবিতে। পিতৃদত্ত নাম- যজ্ঞেশ্বর দে। হলেন মুকুন্দ দাস (১২ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৮ — ১৮ মে ১৯৩৪)।
ঢাকার পদ্মা তীরবর্তী বানারী গ্রামে জন্ম তাঁর। বাবা গুরু দয়াল দে। মা – শ্যামা সুন্দরী দেবী। কবির জন্মের পর এক ভয়ঙ্কর বন্যায় পদ্মার করাল গ্রাসে হারিয়ে যায় এই বানারী গ্রাম। ছিন্নমূল গুরু দয়াল সেইসময় নিজের কর্মস্থল বরিশাল শহরে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন। ছেলে যজ্ঞেশ্বর স্থানীয় ব্রজমোহন হাইস্কুলে কিছুদিন পড়াশুনা করেন। তারপর বাবার মুদি দোকানে কাজ করা শুরু করেন। বাবা সামান্য কাজে যুক্ত ছিলেন। এক ডেপুটির আদালতে সহায়তা করতেন। অপ্রতুল বেতনে সংসার চালানো যেত না। তাই বাসায় এই মুদি দোকান খোলেন।

কৈশোর ও যৌবনে নজরদারির অভাবে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠেন। দুষ্টচক্রে পড়ে নিয়মিত মারপিট গুণ্ডামি নেশায় পরিণত হয়। সহজাত প্রতিভা ছিল গান লেখার। কবিতা লেখার। গলাও ছিল সুরেলা। হৃদয়বান জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিটসন সাহেবের সান্নিধ্য তাঁর জীবনে পরিবর্তন আনে। যখন তিনি দোলাচলতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় সেই সময়ে তাঁর মুদি দোকানে হাজির হন এক সন্ন্যাসী। সালটা ১৯০২। পূজার ছুটির এক দুপুরে রামানন্দ অবধূত ( হরিভোলানন্দ ) এসে তাঁদের মুদি দোকানে বিশ্রামের জন্য ওঠেন। তারপর কথায় কথায় ভালো লেগে যায় দোকানিকে। থেকে যান এক সপ্তাহ টানা। সুগায়ক যজ্ঞেশ্বরকে দীক্ষা দেন। দীক্ষান্ত নাম হয় মুকুন্দ দাস।

তখন তিনি নায়েব বীরেশ্বর গুপ্তের কীর্তন দলের সক্রিয় সদস্য। আসরে আসরে কীর্তন গাইতেন। সেকালের সব বিখ্যাত পদকর্তার গান পরিবেশন করতেন। অশ্বিনী কুমার দত্ত, হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় , মনোমোহন চক্রবর্তী প্রমুখের কীর্তনের ফাঁকে ফাঁকে নিজের লেখা দু একটা কীর্তনও পরিবেশন করা শুরু করলেন। মাত্র উনিশ বছর বয়সে একশো গানের সংকলন প্রকাশিত হয় তাঁর। নাম – সাধন সঙ্গীত। ভণিতায় মুকুন্দ নাম ও ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে গবেষকগণ মনে করছেন, দীক্ষান্ত মুকুন্দ দাস নামটিও স্বনির্বাচিত।

বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা নিলেও আজীবন ধর্মীয় গোড়ামির ঊর্ধ্বে ছিলেন এই লোক কবি। এই অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা বাংলার সংস্কৃতিতে ইতিমধ্যেই চাষ করেছেন লালন সাঁই। বঙ্গভঙ্গের উত্তাল প্রেক্ষাপটে অশ্বিনী কুমার দত্তের অনুপ্রেরণায় স্বাদেশিকতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হন মুকুন্দ দাস। বরিশালের হিতৈষী পত্রিকায় নিয়মিত সাহিত্য চর্চা চালিয়ে যান। পাশাপাশি দুঃসাহসের ডানায় ভর করে শুরু করেন যাত্রাপালার গান রচনা ও পরিবেশন। যে সে যাত্রা না, পৌরাণিক বা নিছক ঐতিহাসিক না,স্বদেশী যাত্রা। সর্বার্থে, বাংলাদেশের প্রথম স্বদেশী পালাকার মুকুন্দ দাস।
গ্রাম শহর উত্তাল করে রাতের পর রাত মানুষকে দেশপ্রেমের বীজমন্ত্র দিতে লাগলেন চারণ কবি। অগ্নীক্ষরা ভাষায়, জ্বালাময়ী সংলাপে রোমাঞ্চিত হল দর্শকসমাজ। কী সব গান যেমন সুর তেমনি বাণী ! ‘ভেঙে ফেল রেশমি চুড়ি ,বঙ্গনারী কভু হাতে আর পরোনা।’ কিংবা ‘অগ্নীময়ী মায়ের ছেলে আগুন নিয়েই খেলবে তারা’। এই সব গান মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। স্বভাবতই এখন তার নানা পাঠান্তর লক্ষ করা যায়। এক একটি অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে একটি গানেরই নানা ভাষ্য। এমনই একটি গানের কয়েকটি পংক্তি উদ্ধৃত করা যেতে পারে। যা পড়লে বোঝা যায় সামান্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েই তিনি কত সহজে লক্ষ্যভেদে সফল হয়েছেন ।
“গাইবো কী আর শুনবে কেরে
দেশ বিদেশে ঘুরে ফিরে
আছে কি আর কারো কান?
কত ভাবের গাইনু গান;
পাবো কি রে তেমন ছেলে?
সে গান শুনলে না কেউ,
বুঝলে না কেউ
দেশের তরে দিবে প্রাণ!”

তাঁর মাতৃপূজা যাত্রাপালা ব্রিটিশ শাসকের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। শুধু সাধারণ কৃষক সমাজ নয়, এই যাত্রা তথাকথিত মধ্যবিত্ত বাঙালী, ইংরেজীয়ানায় অভ্যস্ত নব্য বাবু সমাজকেও আলোড়িত করে। রবীন্দ্রনাথ নিজে এই যাত্রাপালা দেখেন এবং চারণ কবির ভূয়সী প্রশংসা করেন ।
সাহাবাজপুর দাদপুর স্টেশন সংলগ্ন নদীতে ভ্রমণের সময় গ্রেপ্তার হন মুকুন্দ দাস। সে যাত্রায় ৫০০০ টাকা জরিমানা দিয়ে নিষ্কৃতি পান (১৫ নভেম্বর ১৯০৮)। মাস খানেক পরে আবার বরিশালের রাস্তায় ভ্রমণরত মুকুন্দ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দেশদ্রোহের অপরাধে আড়াই বছর কারাবাস এবং তিনশো টাকা জরিমানা হয় তাঁর। কথিত আছে মাতৃপূজা গীত সংকলনের জন্য এই কারাবাস। অভিযোগের মূলে ছিল তাঁর যে গান – তার অনন্য পংক্তি হলো —
“ছিল ধান গোলা ভরা,শ্বেত ইঁদুর করলো সারা। ” দিল্লী জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর জানতে পারেন ইতিমধ্যে তাঁর স্ত্রী সুভাষিণী দেবী প্রয়াত হয়েছেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর সংগে দেখা করে সান্ত্বনা দেন এবং পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। কারাবাস এই অদম্য মানুষটিকে থামাতে পারেনি। তাই মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে যখন স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয় তখন বিদেশী পণ্য বর্জনের আহ্বানে গর্জে ওঠেন চারণ কবি ! ‘ছেড়ে দাও কাচের চুড়ি বঙ্গ নারী হাতে আর পরোনা’ গানটি এই সময়ে বাংলার গ্রাম শহরে বিপুল জনপ্রিয়তা (যার অন্য একটি ভাষ্য পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে) লাভ করে।
কর্মক্ষেত্র, সমাজ, পথ, ব্রহ্মচারিণী,আদর্শ, পল্লীসেবা ও সাথী তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। অসংখ্য দামী মেডেল আর অগণিত পুরস্কারে ভূষিত এই মানুষটি বাংলার নিপীড়িত আবাল বৃদ্ধ- বনিতার ভালোবাসা ভরা অভিনন্দনকেই সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি ও আনন্দের বলে স্বীকার করেছেন আজীবন।
তাঁর সময়ের সবচেয়ে শাণিত হাতিয়ার ‘যাত্রাপালা গান’ আজ মুমূর্ষু। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের যুগে নতুন এক চারণ কবির বিবর্তিত হাতিয়ারের প্রতীক্ষায় আমরা।

- Advertisement -
Latest news
Related news