Monday, May 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৬১ ।। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

দেশব্ন্ধু
চিত্তরঞ্জন বিনোদ মন্ডল
“এনেছিলে সাথে করে  মৃত্যুহীন প্রাণ                              মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান” — রবীন্দ্রনাথ
১৯২৩। বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার ভোটে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে এক তরুণ চিকিৎসক লড়াই করছেন। তাঁর হয়ে প্রচারে এসেছেন সেকালের নামজাদা বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার।ব্যারাকপুরে। ঝাঁঝালো বক্তব্যের মাঝে উড়ে এল ঢিল। আঙুলে চোট পেলেন বক্তা। থামালেন না ভাষণ। গলা তুলে বললেন ” সাহস থাকলে সামনে এসে মার না কেন, ভাই? কেন কাপুরুষ নামের কলঙ্ক বহন করছ?” সেবার জেতেন তাঁর প্রার্থী বিধানচন্দ্র রায়। আর বক্তা হলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ (৫, নভেম্বর ১৮৭০ — ১৬, জুন ১৯২৫)।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বজনবন্দিত অধিনায়ক ছিলেন দেশবন্ধু। জন্মেছিলেন পটলডাঙা স্ট্রিটের বাড়িতে। কিন্তু শিকড় ছিল বিক্রমপুরের। সেখানকার তেলির বাগে আদি বাড়ি। আজীবন নিজেকে ‘বিক্রমপুরবাসী’ বলতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন। বাবা-ভুবন মোহন দাশ এবং মা-নিস্তারিণী দেবী। প্রেসিডেন্সী কলেজের এই কৃতী ছাত্র আই .সি. এস. হওয়ার লক্ষ্যে লন্ডনে পাড়ি জমান। ‘রাভেনা’ নামের জাহাজে চেপে পার হন কালাপানি। কিন্তু দু দুবার চেষ্টা করেও সিভিলিয়ান হওয়া হলনা তাঁর। কোনো কোনো গবেষক বলেছেন খুঁতখুঁতে স্বভাবের জন্য যখনই কোনো পেপারে দু একটি প্রশ্নের উত্তর মনোমতো হয়নি, তখনই রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে আপাতত লাভই হয়েছে। মিডল টেম্পল থেকে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরেছেন ।

এই বিলেতেই আলাপ হয় দাদাভাই নৌরজীর সংগে। তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে পেশা হিসেবে আইন ব্যবসাকে গ্রহণের পাশাপাশি দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৩৯ সালে আলিপুর বোমা ষড়যন্ত্র মামলায় অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে সওয়াল করে তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করেন এবং তাঁর মুক্তি ছিনিয়ে আনেন। রাতারাতি খ্যাতির চূড়ায় ওঠেন তিনি। নোয়াখালি নোট চুরি’ ভূকৈলাশ জমিদারির নোট চুরি, ডুমরাওন, ঢাকা ষড়যন্ত্র, লছমীপুর, বন্দেমাতরম প্রভৃতি মামলায় তিনি উল্লেখযোগ্য জয় পেয়েছেন। তিনি যখন আইন ব্যবসায় ঢুকছেন তখন তাঁর বাবা ঋণের ফাঁদে ‘দেউলিয়া’।অনেক টাকা চাই। রাতদিন পরিশ্রম করেছেন। পাশাপাশি সিটি কলেজে আইনের অধ্যাপনা করেছেন। ১৯১৩ সাল নাগাদ সমস্ত ঋণ শোধ করে দেউলিয়া অপবাদ মোচন করেছেন।

বিলেত থেকে ফিরে বিয়ে সেরেছিলেন বাসন্তী দেবীর সাথে। বিয়েতে ব্রাহ্ম বনাম হিন্দু মতের কচকচানি,নানা বাদবিসম্বাদ ইতিহাস হয়ে আছে। ১৮৯৭ সালের ৩রা ডিসেম্বর ঘোষণা পত্রে সই করে বিয়ে সারেন -” আমি হিন্দু নই।” যোগ্য পত্নী হিসেবে বাসন্তীদেবীর সাহচার্য্য চিরস্মরণীয়। চিত্তরঞ্জন সম্পাদনা করেছেন ‘নারায়ণ’ পত্রিকা। বাসন্তী দেবী সম্পাদনা করেছেন – বাঙলার কথা পত্রিকা। যেখানে নজরুলের কারার ঐ লৌহ কপাট গান তথা কবিতাটি প্রকাশিত হয়। ১৯২৫এ স্বামীর মৃত্যু এবং ১৯২৬ এ ছেলে চিররঞ্জনের মৃত্যু তাঁকে ব্যথায় ক্লিণ্ণ করেছে। তবু স্বামীর উত্তরাধিকার বহন করেছেন আজীবন। ১৯৭৪ পর্যন্ত। স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেল খেটেছেন। স্বাধীনতার পর দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন বাসন্তী দেবী। অর্জন করেছেন ভারত সরকার প্রদত্ত “পদ্মবিভূষণ” সম্মান ।

রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বছর দশেকের ছোট হলেও সখ্য ছিল আজীবন। ১৯১১ সালে যখন তিনি লন্ডনে ,সেবার এক সন্ধ্যায় তাঁর লন্ডনের বাসায় হাজির হন রবীন্দ্রনাথ। সংগে দুই বিখ্যাত সাহেব। কবি ডব্লিউ. বি. ইয়েটস এবং সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী উইলিয়াম রোদেনস্টাইন। জমে ওঠে মজলিস। ‘সোনার তরী’ কবিতাটি পরিবেশন করেন কবি। স্বরের জাদুতে বাড়ির পাশের পথে জমে যায় লোকজন। সেবার চিত্তরঞ্জনের অনুরোধে কবি শোনান ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে।’ রবীন্দ্র প্রতিভার প্রতি মুগ্ধতা থাকলেও কবির সব লেখা যে তাঁর পছন্দ হত না, তাও স্বীকার করেছেন নানা সময়ে। স্বদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে দুজনের মতান্তর কখনো মনান্তরে রূপ নেয়নি অবশ্য।

কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক অধিবেশনে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেন চিত্তরঞ্জন। ১৯১৭ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিক ভাবে সেটাই ছিল তাঁর রাজনীতিতে অভিষেক। রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের মতকে খন্ডন করে কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনে জেল বন্দী চিত্তরঞ্জন লিখিত বক্তব্য পত্র মারফত পেশ করেন। তাতে তিনি বলেন -‘ আমাদের নিজেদের একটি বাড়ি থাকা দরকার , তার পরেই অতিথিকে গ্রহণ করা সম্ভব।’ আবার এই মানুষটি গয়া অধিবেশনে (১৯২২) বলেছেন ‘জাতীয়তাবাদকে চরমে নিয়ে গেলে যে বাড়াবাড়ি ঘটে তারই পরিণাম ‘ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। মাত্র নয় বছরের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে থাকার সময়ে প্রাদেশিক অধিবেশনে ৬ বার এবং ১১ বার বিভিন্ন অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন।

১৯২০ সাল নাগাদ স্ত্রী বাসন্তী দেবী এবং ছেলে চিররঞ্জনের সাথে পরামর্শক্রমে পরিবারের সম্মতিতে সুবিশাল কেরিয়ার ছেড়ে সর্বক্ষণের জন্য রাজনীতিকে সংগী করেন। নাগপুর কংগ্রেসের পরে মহাত্মা গান্ধীর উদার আহ্বানে ঝাঁপিয়ে পড়েন অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনে। ৬০ ইঞ্চি বহরের অভিজাত ঢাকাই ধুতি ছেড়ে অঙ্গে তুলে নেন মোটা খাদির ধুতি। ফিনফিনে গিলে করা ধপধপে সাদা পাঞ্জাবীর বদলে পরিধান করেন খাদির মোটা ফতুয়া। আগে গোটা কামরা ভাড়া নিয়ে রেলে ভ্রমণ করতেন যে মানুষটি, তিনিই পান্থজনের সখা হয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে আপামর পরাধীন দেশবাসীর সাথে ভ্রমণ করেছেন সানন্দে।

গান্ধীজীর সাথে শেষ অবধি পথ চলা সম্ভব হয়নি। যেমন সম্ভব হয়নি অনেক চেষ্টা করেও চরকায় সুতো কাটার পদ্ধতি আয়ত্ত করা। গান্ধীজী দেখে শুনে বলেন ‘একাজে তুমি একেবারেই অযোগ্য।` হাসিমুখে সমালোচনা স্বীকার করেন। মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে তিনি নতুন দল গঠন করেন। নাম দেন স্বরাজ দল। ১৯২৩ সালে বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচনে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সমর্থন পক্ষে যায়। দেশব্ন্ধু দু ‘দু বার মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব কৌশল হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন। ইংরেজদের উসকানিতে গড়া ‘ডায়ার্কি’ প্রথার স্বরূপ উদঘাটন করেন।

এদিকে তাঁকে আদর্শ মেনে ১৯২১এ সুভাষচন্দ্র আই সি এস হয়েও চাকরি না নিয়ে দেশ সেবায় ব্রতী হয়েছেন। এই একুশেই দুজন এক সাথে কারারুদ্ধ হয়েছেন। ১৯২৪এ কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র হন চিত্তরঞ্জন। তাঁর C E O হন সুভাষচন্দ্র বসু। বেঙ্গল অর্ডিনেন্স জারি করে সুভাষচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করা হলেও আলোড়িত হন চিত্তরঞ্জন। প্রতিক্রিয়ায় বলেন — এবার গভর্নমেন্টকে কাঁপিয়ে ছাড়ব।

দানধ্যানে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। সতীর্থ থেকে গৃহশিক্ষক, চেনা- অচেনা সবার আর্থিক অনটনে পাশে থেকেছেন। প্রাক্তন গৃহশিক্ষক পূর্ণ হালদারের বাড়ি নিলামের হাত থেকে রক্ষা করতে সে বাজারে ছয় হাজার টাকা দিয়েছিলেন। পূর্ণবাবু টাকাটা ধার নিতে চাইলে ছাত্র সহাস্যে বলেন – মাস্টারমশাই ও কথা তুলবেন না। ওতে আমার পাপ হবে। পিতৃঋণের মতো গুরুঋণও তো একটা আছে!’ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের জন্য পুথি সংগ্রহে আসেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তিনি পুথির আলমারির চাবি তুলে দেন তাঁর হাতে। নিজের স্বপ্নের বসতবাটি জাতির সেবায় বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি যা অাজকের চিত্তরঞ্জন সেবা সদন।

দার্জিলিংএ থাকার সময় কয়েকদিনের জ্বরে আচমকা প্রয়াত হন চিত্তরঞ্জন। মান্দালয় জেলে বন্দী সুভাষ সে খবর শুনে শোকে স্তব্ধ হয়ে যান। পূর্ববঙ্গ সফররত মহাত্মা গান্ধী ছুটে আসেন কলকাতায়। শেষ শ্রদ্ধা জানান। শেষ যাত্রায় পা মেলান প্রায় দুলক্ষ দেশবাসী। কেওড়াতলা মহাশ্মশান তাঁর নশ্বর দেহ ধারণ করে ইতিহাসের ওকালতি করছে যুগে যুগান্তরে!

- Advertisement -
Latest news
Related news