Wednesday, May 22, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৫৯।। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী: বিনোদ মন্ডল     

- Advertisement -spot_imgspot_img

মহামহোপাধ্যায়
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বিনোদ মন্ডল                                                   বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মেদিনীপুর শাখার দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনের আমন্ত্রিত সভাপতি ছিলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৯ মার্চ , দোল পূর্ণিমার দিন আয়োজিত এই সভায় তিনি যে মনোজ্ঞ ভাষণ দেন তার বিষয় ছিল মেদিনীপুরের ইতিহাস। ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় সে ভাষণের শুরুতে স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে তিনি বলেন -‘ গরীব ব্রাহ্মণকে এরূপ স্থলে আনা,আমারো বিড়ম্বনা, আর যাঁহারা আনেন, তাঁদেরও বিড়ম্বনা’, কারণ তিনি লাট – বেলাট কাউন্সিলের মেম্বার, হাইকোর্টের জর্জ ইত্যাদিদের মতো ‘দাঁড়াইয়া উঠিয়াই, মুখ খুলিয়াই, লোকজনকে ইচ্ছামতো হাসাইতে……বা, কাঁদাইতে…..পারেননা।’ তিনি ‘অন্যের লিখে দেওয়া ভাষণ গ্রামোফোন রেকর্ডের মতো অনুবৃত্তিতে অক্ষম, এমনকি জলদগম্ভীর গলায় ইংরেজি অথবা সংস্কৃতাশ্রিত বাংলায় কথা বলতেও আদৌ আগ্রহী নন।’

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

দীর্ঘ বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, ‘জাঁকালো বক্তৃতা করিতে পারিব না,’ বাড়িতে ‘বাপ মার সান্নিধ্যে শেখা মাতৃভাষায়’ তিনি বলবেন, আর আপনারা যদি গোলাগুলি চান, অনেক বড় বড় লোকের কোটেশন চান, বৈজ্ঞানিক রীতিতে ইতিহাস চান, আমার মতের যারা বিরুদ্ধবাদী, তাহাদের উপর গালিবর্ষণ চান, তাহাও আমার দ্বারা হইয়া উঠিবে না..। এই অবিস্মরণীয় সুভাষক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (৬ ডিসে. ১৮৫৩ — ১৭ নভে. ১৯৩১)।আদি নাম – শরৎ চন্দ্র ভট্টাচার্য্য। বাল্যে কঠিন অসুখে পড়েন । শিবের পুজোয় অসুখ সারে ,কথিত আছে , তখন নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য্য ।

আদি নিবাস ছিল উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটিতে। তাঁর জন্ম হয় খুলনার কুমিরা গ্রামে। অসাধারণ মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। প্রেসিডেন্সী কলেজের পর (১৮৭৬) সংস্কৃত কলেজে (১৮৭৭) পড়েন। এম. এ.পরীক্ষায় প্রথম হন এবং শাস্ত্রী উপাধি লাভ করেন। বাংলার সারস্বত সমাজ তাঁকে বহুমুখী প্রতিভাধর হিসেবে মনে রাখবে। তিনি ছিলেন সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, পুরাতত্ববিদ, সংরক্ষণবিদ, গবেষক, পুথি সংগ্রাহক এবং অধ্যাপক।

বিচিত্র ছিল তাঁর কর্মজীবন। ১৮৭৮এ হেয়ার স্কুলে ট্রান্সলেশনের শিক্ষক পদে যোগদান করেন। এরপর কিছুদিন লক্ষ্ণৌ ক্যানিং কলেজে অধ্যাপনার পর ১৮৮৩এ কলকাতার সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপক হন। তার পাশাপাশি ১৮৮৬ — ১৮৯৪ পর্যন্ত বেঙ্গল লাইব্রেরিয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। ১৮৯৫ সালে চলে এলেন প্রেসিডেন্সী কলেজে, অধ্যাপনায়।
১৯০০ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন, অবসর গ্রহণ করেন ১৯০৮ এ। কিন্তু যিনি কাজ পাগল মানুষ, তাঁর আবার অবসর হয় নাকি! এবার সরকার বাহাদুর তাঁকে ‘ব্যুরো অফ ইনফরমেশনের’ দায়িত্ব দেন। ১৯২১এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৮জুন) প্রতিষ্ঠিত হল। বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তিনি।

১৯২৪ এর ৩০ জুন অবসর নেন। তবু জনান্তিকে শোনা যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করা হয়নি কখনো। ব্ন্ধু স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সাথে মতান্তর ও বন্ধুত্বছেদের কারণে। তবে ,১৮৮৮ সালে এই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আজীবন ‘ফেলো’ সম্মান প্রদান করেন শাস্ত্রীমশাইকে ।
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্নেহধন্য ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন তাঁর সংস্পর্শে কাটিয়েছেন। তবু জীবনের অভিমুখ নির্ধারণে গুরু মানতেন অধ্যাপক রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়কে (১৮৪৫ — ১৮৮৬)। তাঁর আর এক শুভানুধ্যায়ী ছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র।

১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে শ্রী মিত্রের মৃত্যুর পর এশিয়াটিক সোসাইটি তাঁকে Director of the operations in search of Sanskrit Manuscripts নিযুক্ত করে। যার ফলশ্রুতিতে বৃহত্তর ভারতের সর্বত্র পুথি সন্ধানে ঘুরে বেড়ান তিনি। রাজস্থান থেকে ভাট ও চারণদের পুথি সংগ্রহ করে আনেন। পুথির সন্ধানে চারবার নেপাল যান। ১৮৯৭, ১৮৯৮, ১৯০৭ এবং ১৯২২। ১৯০৭এ নেপালের রাজপ্রাসাদের রয়াল লাইব্রেরি থেকে চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, কৃষ্ণ ও সরহা বজ্রের দোহা এবং ডাকার্ণব পুথিগুলি সংগ্রহ করে আনেন।
১৯১৬ সালে এই ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ পুথিটি সম্পাদনা করেন। “হাজার বছরের পুরানো বৌদ্ধ গান ও দোহা” নামে প্রকাশ করে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ। গ্রন্থের সম্পাদক প্রমাণ করেন এটাই বাংলা ভাষার আদিতম লিখিত নিদর্শন। এছাড়াও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ, সন্ধ্যাকর নন্দীর ‘রামচরিতম্ ‘, আর্যদেবের চতু:শতক উদ্ধার করে প্রকাশ করেছেন তিনি। প্রায় দশ হাজার পুথির বিবরণাত্মক সূচি প্রণয়নের মতো দুরূহ ও বিরল কাজের কৃতিত্ব তাঁরই। যা পরবর্তী কালে একাদশ খণ্ডে বিধৃত ও প্রকাশিত হয়।

সাহিত্যিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বঙ্কিম যুগের সাথে রবীন্দ্র যুগের সেতু নিবন্ধক। বঙ্গদর্শন পত্রিকায় নবীন প্রাবন্ধিক হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন তিনি। ১২৮২ বঙ্গাব্দে মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র সংখায় তাঁর ‘ভারত মহিলা’ নামে প্রথম গবেষণা মূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। যা ছাত্রাবস্থায় রচিত। এই লেখার জন্য তিনি হোলকার পুরস্কার লাভ করেন। ৩০টি প্রবন্ধ বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয় তাঁর। এছাড়াও তখন আর্যদর্শন, কল্পনা, সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা, নারায়ণ, মর্মবাণী প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল – Magadhan Literature, Sanskrit Culture in India, Discovery of living Buddhism in Bengal, মেঘদূত (ভাবানুবাদ), বাল্মীকির জয়, সচিত্র রামায়ণ, প্রাচীন বাংলার গৌরব ও মানবধর্ম ইত্যাদি। দুটি সুন্দর উপন্যাস লিখেছেন – বেনের মেয়ে (১৯২২) এবং কাঞ্চনমালা (১৯২৩)।
সারাজীবনে বহু উল্লেখযোগ্য সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি। ১৯৯৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার ৬০ তম রাজ্যাঙ্কে প্রবর্তিত উপাধি হিসেবে লাভ করেন ‘মহামহোপাধ্যায়’ সম্মান। ১৯১১ সালে সি. আই. ই. এবং ১৯২১ সালে ইংল্যান্ডের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির অনারারি মেম্বার হন। ১৯২৭এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডি. লিট সম্মানে ভূষিত করে। ১৯২৮এ লাহোরে অনুষ্ঠিত পঞ্চম ওরিয়েন্টাল কনফারেন্সে মূল সভাপতি হন তিনি।
তাঁর মূল কর্মক্ষেত্র ছিল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ।

১৩০০ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানে বহুবার সহসভাপতি এবং ১২ বছর সভাপতি ছিলেন তিনি। তাঁর সাহচর্য্য -এ দীনেশচন্দ্র সেন, মুনশি আবদুল করিম সহ বহু গবেষক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সেবায় আজীবন ব্রতী হয়েছেন। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অন্যতম বড় অবদান হল, বাংলার প্রকৃত ইতিহাস রচনার পথপ্রদর্শক তিনি। তিনি প্রমাণ করেছেন, আর্যরা নয়, বাংলার সংস্কৃতি অনুধ্যানে বৌদ্ধ প্রভাব অনেক বেশি ক্রিয়াশীল।

- Advertisement -
Latest news
Related news