Sunday, April 14, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-১২৩।। অমিয় চক্রবর্তী।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

বিশ শতকের জাগ্রত বিবেক                                      অমিয় চক্রবর্তী বিনোদ মন্ডল                                               প্রবাসী বাঙালি বালক, স্কুলে পড়বার সময়ে নেশা ছিল দেশ বিদেশের মনীষীগণের সাথে পত্রমিতালী করা। লাগাতার চিঠি লিখতেন। পেতেন উত্তরও। কে নেই সেই তালিকায় ? বার্নাড শ’, এইচ. জে. ওয়েলস , রোমা রোলাঁ , হ্যাভলক এলিস, এমন কি রবীন্দ্রনাথ। কবিগুরুকে মুখোমুখি দেখবার আগেই পত্রালাপ সেরে ফেলেছিলেন। তাঁর ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস পড়ে ভালো লাগাবার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি কবি ও অধ্যাপক অমিয় চক্রবর্তী (১০.০৪.১৯০১ -১২.০৬. ১৯৮৬)।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

জন্মেছিলেন হুগলীর শ্রীরামপুরে। সুশিক্ষিত মাতৃকূল ছিল জমিদার। মামা সোমনাথ মৈত্র ছিলেন কৃতী অধ্যাপক। বাবা -দ্বিজেশচন্দ্র ও মা অনিন্দিতা দেবী। বাবা ইংরেজিতে এম. এ. পাশ করে আইনের ডিগ্রি নিয়ে আসামের গৌরীপুর স্টেটে দেওয়ানের কাজ করতেন। গৌরীপুরের রাজা তখন প্রভাতচন্দ্র বড়ুয়া। যাঁর সুপুত্র শিল্পী প্রমথেশ বড়ুয়া। মা অনিন্দিতা সারস্বত অঙ্গনে সুপরিচিতা ছিলেন। নারী শিক্ষা ও নারীমুক্তি আন্দোলন নিয়ে ‘বঙ্গনারী’ ছদ্মনামে একাধিক মননশীল প্রবন্ধ রচনা করেন। প্রবন্ধ সংকলন ‘আগমনী’ প্রকাশিত হয় তাঁর।

বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যে বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠবার উপযুক্ত পরিবেশে জন্মে ছিলেন অমিয়চন্দ্র। বাবা মা দুজনেই সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশে সজাগ সতর্ক ছিলেন। ফ্রান্স ও জার্মানীর জাতীয় সংগীত কণ্ঠস্থ ছিল তাঁর। বাল্য শিক্ষা গৌরীপুর ইনস্টিটিউশনে। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে। ১৯১৭ সালে। পরে হাজারিবাগ আইরিশ মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত সেন্ট কোলম্বা’স কলেজে ইংরেজি দর্শন ও উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯২১এ বি. এ. পাশ করে চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। ১৯২৬এ পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম. এ. পাশ করেন। ১৯৩৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ পেয়ে সেখানে চলে যান। টমাস হার্ডির ‘The Dynasts’ নামক ইতিহাস মূলক তত্ত্বকাব্য নিয়ে গবেষণা করে পি. এইচ. ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম পুরোধা অমিয় চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছের মানুষ। একসময়ের সাহিত্য সচিব। সখা। সফরসংগী। আজীবন মর্মসংগী। শীর্ণকায় ও মৃদুভাষী অমিয় বি. এ. পাশ করেই শান্তিনিকেতনে যোগ দেন। ইংরেজি পড়াতেন আর আশ্রমে আগত বিদেশি অতিথিদের সঙ্গ দান করতেন। এর ফলে তাঁর মনের বিকাশ যেমন ঘটে তেমনি বিদ্যাচর্চাও পায় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট। ফরাসি শিল্পী ও সাহিত্যিক আঁদ্রে কার্পেলের সহযোগিতায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’ ও ‘নালক’ ফরাসিতে অনুবাদ করেন তিনি। ভারতীয় শিল্পকলা বিশেষজ্ঞ ড. স্টেলা ক্রামরিশ -এর কাছে জার্মান ভাষা শিক্ষা তাঁর। ফরাসি ভারত- বিশেষজ্ঞ এফ. বেনোয়ার সঙ্গে বসে রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ নাটকের অনুবাদ করেন।

সেকালের বিশ্ববন্দিত পণ্ডিতদের সঙ্গে সখ্য ছিল তাঁর। ড. উইন্টার নিৎজ, চেক পণ্ডিত ভি.লেসনি ,আরবি -পারসি বিশারদ গের মানুস ,বগদানভ ,এডওয়ার্ড টমসনের স্মৃতি ধরা আছে তাঁর লেখায়। পৃথিবীর পাঁচটি মহাদেশে ঘুরে ফিরে যাওয়া আসা করেছেন কবি।

অধ্যাপনা করেছেন বহু বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে। বার্মিংহামে উডব্রুক কলেজে ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন। লাহোরের ফরম্যান কলেজ, কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় (১৯৪০-৪৮), ওয়াশিংটন এর হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে করেছেন অধ্যাপনা। এছাড়া ইয়েল, ক্যানসাস ,বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়, স্মিথ কলেজ ,নিউইর্য়কের স্টেট ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।

পৃথিবী চষে বেড়ালেও মন পড়ে রয়েছে আজীবন -শান্তিনিকেতনে। শেষ নিঃশ্বাসও ত্যাগ করেছেন এখানেই। রবীন্দ্রনাথের সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯২৬-এ যোগ দেন। তাঁকে কবির চিঠি পত্রের উত্তর দিতে হত। এছাড়া কবিতার কপি করা ,পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করা ,প্রুফ দেখা ,অতিথি আপ্যায়ন করার দিকটি সামলাতে হত। ১৯২৬ সালে ডেনমার্কের তরুণী হিওডির্স সিগো প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করেন এবং রথীন্দ্র -প্রতিমার পালিত কন্যা নন্দিনীকে ফরাসি ভাষা শেখানোর দায়িত্ব নিয়ে শান্তিনিকেতনে আসেন।

১৯২৭ সালে রবীন্দ্র-দৌত্যে অমিয় চক্রবর্তীর সাথে বিবাহ হয় তাঁর। কবিগুরু নতুন নাম দেন হৈমন্তী। ১৯৩১এ বার্মিংহামে থাকবার সময় কন্যা সন্তান লাভ করেন তাঁরা। ফিরে আসেন শান্তিনিকেতনে।

আশ্রমে বারবার এসেছেন, জীবিকার টানে বিদেশে চলে গেছেন। এনিয়ে আশ্রমিকদের মধ্যে নানা জল্পনা থাকলেও অমিয় চক্রবর্তী স্পষ্ট লিখেছেন -‘ মহাপুরুষের ছত্রতলে বিরাজ করার মধ্যে একটা অলীকতা আছে -ঐ রকম আশ্রয় মানুষের আত্মার পক্ষে ক্ষতিকর যদিও প্রেরণার দিক থেকে যা পেয়েছি তাও অসীম। আমার ধারণা ছিল (এবং এখনও তাই )সব রকমের ‘গুরুবাদের’ উল্টো। আত্মজীবন, আধ্যাত্মিক জীবন মহাপুরুষের আশ্রয়ে অবসন্ন হয়।’ এই স্বীকারোক্তিতেই ব্যক্তিত্ববান এবং শ্রদ্ধাশীল অমিয় চক্রবর্তীকে খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া গুরুদেবও মেনে নিয়েছিলেন এই গতায়াত -“তোমার সঙ্গে এমন একটা নিবিড় যোগ হয়ে গিয়েছিল যে এই বয়সে তার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা সহজ নয়। কিন্তু তরুণ জীবনকে এমন করে আঁকড়ে থাকা অত্যন্ত নিষ্ঠুর, অত্যন্ত অন্যায়। একান্ত মনে কামনা করি তুমি স্বাধীনতার ‘মুক্ত আলোকে’মনের পূর্ণ বিকাশ লাভ করে ধন্য হবে।”
কবিগুরুর সাথে জার্মানি ,ডেনমার্ক ,রাশিয়া ও আমেরিকা সফর করেছেন তিনি। বার্লিনে দেখেন আইনস্টাইন এবং ফ্রাংকফুর্ট -এ টমাস মান কে। এই যাত্রার পর রবীন্দ্রনাথ লেখেন রাশিয়ার চিঠি। অমিয় লেখেন ‘মস্কৌ এর চিঠি’। এটি প্রকাশিত হয় ১৩৩৮এর মাঘ ও ফাল্গুন সংখ্যা বিচিত্রায়। কবিগুরুর সাথে পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্যও ভ্রমণ করেছেন অমিয়।

হেয়ার স্কুলে পড়বার সময়েই অধ্যাপক মামার সৌজন্যে পরিচয় হয় প্রমথ চৌধুরী, ইন্দিরা দেবী ,অতুল গুপ্তের সাথে। বাস্তবে ,এই প্রমথ চৌধুরীর বাড়িতেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় তাঁর। পরে প্রমথের সাথে দু’দিনের জন্য প্রথম শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়ে রবীন্দ্র সান্নিধ্য নিবিড় হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময় চল্লিশের উত্তাল বামপন্থায় সংরক্ত হয়েছেন। ১৯৪২-এ ঢাকায় সোমেন চন্দ খুন হলে কলকাতায় গঠিত হয় ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ। যোগ দেন তিনি। কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ইউনিটের সাহিত্য বিভাগে যুক্ত ছিলেন কিছুদিন। ছাত্র ফেডারেশন প্রকাশিত ‘প্রাচীর’ পত্রিকায় (১৯৪২) ‘ভূমিকা’ নামে একটি কবিতাও প্রকাশিত হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সমকালীন ভারতের অগ্রগণ্য নেতা মহাত্মা গান্ধীর প্রতি অনুরক্ত হয় তাঁর মন।

১৯২০-এ এই মানুষটিই গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের পথকে যুক্তিযুক্ত মানতে পারেননি। কিন্তু ১৯৩০এ লবণ-আইন অমান্য আন্দোলনের জোরালো আবেদনে মুগ্ধ হয়েছেন ,যুক্ত হয়েছেন ।১৯৩২এ গান্ধীর অস্পৃশ্যতা-বিরোধী ভূমিকায় আকৃষ্ট হয়েছেন। ১৯৪৬-৪৭এ তিনবার তিনি গান্ধীজীর সাথে বিহার ও নোয়াখালির দাঙ্গা- বিধ্বস্ত এলাকায় গিয়ে শান্তির আবেদন করেছেন।গান্ধীজীর সম্পর্কে মূল্যবান গ্রন্থ লিখেছেন -‘Mahatma Gandhi and Modern World.’

কবি অমিয় চক্রবর্তীর প্রধান পরিচয় তিনি কবি। পরিচয় ও কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাবলিতে আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল হয়েছেন তিনি। খসড়া (১৯৩৮) এবং একমুঠো (১৯৩৯)-এ তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। পর পর লিখেছেন মাটির দেয়াল, অভিজ্ঞান বসন্ত, দূরযানী ,পারাপার , পালাবদল , ঘরে ফেরার দিন , ইত্যাদি কাব্য। সর্বশেষ কবিতা সংকলন -নতুন কবিতা (১৯৮৭)। তাঁর কবিতায় সামগ্রিক জীবন চেতনা, বিজ্ঞা নবোধ, দার্শনিকতা, আন্তর্জাতিক ভাবনা, যুদ্ধ বেকারি এবং সকলের ঊর্ধ্বে নির্মোহ প্রসন্নতা উদ্ভাসিত ।

আন্তর্জাতিক জ্ঞান চর্চার নানা প্রতিষ্ঠান ও সংঘের সভ্য হয়েছেন। লাভ করেছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি. লিট., বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশিকোত্তম(১৯৬৩), ভারত সরকারের পদ্মভূষণ (১৯৭০) সম্মান। সাহিত্যের জন্য পেয়েছেন ইউনেস্কো ও অকাদেমি পুরস্কার। আমেরিকার বিশিষ্ট শিক্ষাব্রতী রূপে ১৯৭২ সালে নির্বাচিত হয়েছেন।

সবার ঊর্ধ্বে সাধারণ মানুষকে মর্যাদায় মণ্ডিত করেছেন অমিয়। পিঁপড়ে থেকে গুরুচরণ কামাররা উঠে এসেছে কবিতার শিরোনামে। লিখেছেন -তোমার আমার নানা সংগ্রাম/ দেশের দশের সাধনা, সুনাম /ক্ষুধা ও ক্ষুধার যত পরিণাম /মেলাবেন/ জীবন , জীবন-মোহ/ভাষাহারা বুকে স্বপ্নের বিদ্রোহ / মেলাবেন ,তিনি মেলাবেন।

- Advertisement -
Latest news
Related news