Monday, April 15, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-১১২ ।। আশাপূর্ণা দেবী ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

অপ্রতিম প্রতিভাময়ী
আশাপূর্ণা দেবী বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

আদ্যোপান্ত এক বাঙালী গৃহবধূ ছিলেন তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সাত -সতেরো দায়িত্ব সামলে অবসর সময়ে কলম ধরেছেন। তাতেই তিল থেকে তিলোত্তম সাহিত্যসম্ভার পূর্ণতা পেয়েছে। লিখেছেন আস্ত উপন্যাস ২৪২টি। তিন হাজার ছোটগল্প। এছাড়াও শিশু কিশোরদের জন্য অনুপম রচনাবলি। অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। আত্মসমীক্ষা করতে গিয়ে বলেছেন – “আমি মা সরস্বতীর স্টেনোগ্রাফার।” তিনি আশাপূর্ণা দেবী (০৮.০১.১৯০৯ — ১৩.০৭. ১৯৯৫)।

জন্মেছিলেন উত্তর কলকাতার পটল ডাঙায়। মামার বাড়িতে। বাবা হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত ছিলেন পেশাদার চিত্রশিল্পী। জীবিকা ছিল বাংলা দৈনিক পত্র- পত্রিকায় ছবি আঁকা। মা সরলাসুন্দরী ছিলেন একান্নবর্তী সংসারের গৃহবধূ। গোগ্রাসে গিলতেন বাড়িতে আসা নানা সাহিত্য পত্র। যাতায়াত করতেন লাইব্রেরিতে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় না দীক্ষিত হয়েও বাবা – মা’র শিল্পী সত্তার উত্তরাধিকার বহন করেছেন আশাপূর্ণা। ঠাকুরমা নিস্তারিণী দেবীর কঠোর অনুশাসন সত্ত্বেও দাদার বর্ণপরিচয় দেখে দেখে অক্ষর জ্ঞান হয়েছিল তাঁর। বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা না জেনে, না শিখেই সাহিত্য সাধনায় বিশ্বজয় করেছেন তিনি।

কিশোরী আশাপূর্ণা বোন সম্পূর্ণাসহ একবার চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথকে। আবদার করেন ‘নিজের হাতে আমাদের নাম লিখে একটি উত্তর দেবেন।’ অচিরেই মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। উত্তর আসে — “আশাপূর্ণা তুমি সম্পূর্ণা” । কিশোর মনে অভূতপূর্ব আন্দোলন সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় পরম তৃপ্তি ও আনন্দ পান আশাপূর্ণা।

১৯২৪ সালে মাত্র পনেরো বছর আট মাস বয়সে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা কালিদাস সেনগুপ্তের সঙ্গে। আজীবন এই মানুষটির প্রশ্রয় ও সাহচর্যে আশাপূর্ণার স্বপ্ন পূরণে সঙ্গ দিয়েছেন। প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় শিশুসাথী পত্রিকায়। ‘বাইরের ডাক’ কবিতা। তবে ৩৮ বছর বয়সের আগে পত্র পত্রিকায় লেখা পাঠালেও কোনো সভা সমিতিতে যোগ দেননি তিনি। বাইরের ডাকে যখন সাড়া দিলেন, তখন মুখোমুখি দেখা হলো সেকালের সব দিকপালের সঙ্গে। তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ,সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের সান্নিধ্যে আসেন তিনি ।

নানা সময়ে সাধনা, প্রবাসী, ভারতবর্ষ , সবুজপত্র , বঙ্গদর্শন , বসুমতী , সাহিত্য , বালক সন্দেশ , মৌচাক , রংমশাল , খোকাখুকু সহ নানা দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা পড়ে নিজেকে তৈরি করেছেন , পরে লেখা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর সাহিত্যিক রূপে প্রতিষ্ঠা ও জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ বোধ হয় ,তাঁর রচনার সহজ সরল বিষয় ও পরিবেশন। মধ্যবিত্ত জীবনের আটপৌরে নানা দিক উপস্থাপিত হয়েছে তাঁর রচনায়। তাঁর গল্প উপন্যাসে কাহিনীতে চমক আছে , আছে নাটকীয় মোচড়ও, তবু কখনো তাঁর কল্পনা গজদন্ত মিনার সদৃশ ভাবালুতায় আপ্লুত হয়নি।

এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল আশাপূর্ণার। ফলে সহজাত ভাবেই ঘরের কথা হয়ে উঠেছে সমকালের ‘সময়ের কথা’। পাঠকের হৃদয়ের কথা। ‘মিত্তির বাড়ি’ উপন্যাসের নায়িকা সুরেখা তাই তার শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে জানিয়েছে – ‘সেখানে মানুষের কোনো দাম নেই, জীবনের ওপর শ্রদ্ধা নেই, .. .. অসহিষ্ণু , অসন্তুষ্ট কতগুলো জীব যেন দৈবক্রমে জট পাকিয়ে এক জায়গায় পড়ে আছে. .. .. মর্যাদাবোধ নেই, আছে আস্ফালন। ক্ষমা নয়, আছে শুধু বিচার’।

সমকালীন রাজনৈতিক টানাপড়েন, বিশ্বযুদ্ধ উত্তর উথালপাথাল পৃথিবীর অবক্ষয়িত মূল্যবোধ , আর্থিক মন্দা , বেকারি, দারিদ্র , ছিন্নমূল মানুষের যন্ত্রণা, তিনি উপলব্ধি করেছেন। স্নেহ, সহানুভূতি, মমত্ববোধ ও ভালোবাসায় চরিত্রগুলোকে সংরক্ত করেছেন। তা বলে নিষ্ঠুর পাশবিক প্রবৃত্তিমাখা অন্ধকার দিকগুলোকে কখনো অবহেলা করেননি। যৌথ পরিবারগুলির ক্রমাগত ভেঙে যাওয়া তাঁর উপন্যাসে নানা রঙে উন্মোচিত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন অসাধারণ ট্রিলজি ‘প্রথম প্রতিশ্রতি,’ ‘সুবর্ণ লতা’ এবং ‘বকুল কথা’র জন্য। নবনীতা দেবসেন এই ট্রিলজির মূল্যায়ণ করতে গিয়ে লিখেছেন -‘ বিশ্ব সাহিত্যে আর কোন মহিলা সাহিত্যিক তো নেই , হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন পুরুষ ঔপন্যাসিক আছেন যারা এতখানি এলেম রাখেন’। ১০০ বছর পুরনো একটি গ্রামীণ বিত্তবান পরিবারের পটভূমিকায় পরিকল্পিত প্রথম প্রতিশ্রুতি। কেন্দ্রীয় চরিত্র সত্যবতীর দৃষ্টিতে লেখিকা জীবন পর্যবেক্ষণ ও সময়ের ভাঙাগড়া অনুসন্ধান করেছেন। কিশোর বয়সে কলকাতা শহরে একান্নবর্তী পরিবারে অবরুদ্ধ মহিলাদের জীবনের যে শ্বাসরুদ্ধ দুঃসহ ছবি অভিজ্ঞতায় অর্জন করেছেন – তার ধারাভাষ্য দিয়েছেন সুবর্ণলতা উপন্যাসে । এই সুবর্ণলতা সত্যবতীর কন্যা। এইভাবে বকুল কথার বকুলও সুবর্ণলতার কন্যা। শেষোক্ত উপন্যাসে তখনকার আধুনিক সমাজ ও আধুনিক জীবনকে মূল্যবোধের কষ্টিপাথরে যাচাই করেছেন আশাপূর্ণা

আশাপূর্ণা লিখেছেন -“অধিকারহীন অবলাদের কথা বলেছি বৈকি! কিন্তু আজকের স্বাধিকারমত্তা সবলাদের দেখেও খুব একটা আনন্দ পাচ্ছিনা ! লিখেছেন -নারী ছলনাময়ী, নারী জন্ম অভিনেত্রী। কিন্তু সেকি শুধু পুরুষজাতিকে মুগ্ধ করবার জন্য ? বাঁচাবার জন্য নয় ? আশ্রয় দেবার জন্য নয় ?নিজের লেখার প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন ,ছোট গল্প তাঁর প্রেম, কিন্তু উপন্যাস লেখা তাঁর কাজ। অসংখ্য ছোট গল্পে জীবন ও জগতের নানা প্রসঙ্গ চিত্রায়িত করেছেন তিনি।

পাঠক -পাঠিকার সাড়া তাঁর সাহিত্যে স্পন্দন হয়ে ফিরে এসেছে। তাই তাঁর বাড়ির বৈঠকখানায় অজস্র স্মারক, পুরস্কার , ট্রফি ও ছবি সুশোভিত। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হাত থেকে গ্রহণ করেছেন ‘পদ্মশ্রী'(১৯৭৬)। রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডির কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৭৬)। আর এক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন বিশ্বভারতী প্রদত্ত দেশিকোত্তম সম্মান (১৯৮৯) ।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদান করেছে লীলা পুরস্কার(১৯৫৪), ভুবন মোহিনী দাসী স্বর্ণপদক (১৯৬৬), জগত্তারিণী পদক (১৯৬৩)। পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদান করেছে রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার (১৯৬৬)। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ হরনাথ ঘোষ পদক (১৯৮৮) অর্পণ করেছে।জব্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮৩), রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮৭), বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮৮)এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯০) প্রদান করেছে সাম্মানিক ডি. লিট. । তাঁর অফুরান সৃষ্টি সম্ভার নতুন প্রজন্মের লেখক লেখিকাগণকে অবিরাম সৃষ্টি সুখের আনন্দে উদ্বুদ্ধ করে। যেকোনো বই মেলায় এখনো তাঁর রচনাবলির সন্ধানে স্টল থেকে স্টলে ঘুরে বেড়ান গ্রন্থকীট বাঙালী ।

- Advertisement -
Latest news
Related news