Tuesday, April 16, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-১০৯।। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

প্রগতি পথিক
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

“ফুলগুলো সরিয়ে নাও
আমার লাগছে ।
মালা জমে জমে পাহাড় হয়
ফুল জমে জমে পাথর ।
পাথরটা সরিয়ে নাও, আমার লাগছে ।”

নিমতলা শ্মশানে ক্রান্তিকালের এক কথা সাহিত্যিককে চিতায় তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরে শোকসন্তপ্ত হৃদয়ে কলম ধরলেন সেই ক্রান্তিকালের আরেক কবি। চিতায় পুড়ছেন মানিক আর সেই অবিনশ্বর মানুষটির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ওই অবিনাশী অনুভবমালা। মাত্র আটচল্লিশটি বসন্ত কিন্তু সৃষ্টির অনন্ত সম্ভাবনায় মূর্ত ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (২৯.০৫.১৯০৮ — ০৩.১২.১৯৫৬ )।

জন্মেছিলেন সাঁওতাল পরগনার রাজধানী শহর দুমকায় (অধুনা ঝাড়খন্ড রাজ্যে)। বাবা -হরিহর। মা নিরদা সুন্দরী দেবী। বাবা সেটেলমেন্ট বিভাগে কানুনগো পদে চাকরি করতেন। পৈত্রিক নিবাস ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের মালজপিয়া গ্রামে। বাবার ছিল বদলির চাকরি। সেই সুবাদে চোদ্দটি সন্তানকে পরিযায়ী শৈশব যাপন করতে হয়েছে। আট ছেলে, ছয় মেয়ে। মানিক ছিলেন অষ্টম সন্তান। হরিহর নানা সময়ে আরা ,সাসারাম ,দুমকা, কলকাতা, শালবনী , মহিষাদল ,বাঁকুড়া , তমলুক, নন্দীগ্রাম ,টাঙ্গাইল ,ব্রাহ্মণবেড়িয়ায় বদলি হয়েছেন। সেই কারণে মানিকের স্কুল জীবন কেটেছে কিছুদিন কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনে। প্রবেশিকা পাশ করেছেন মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকে ১৯২৬ সালে। বর্তমানে যা কলেজিয়েট নামে বিখ্যাত। এখানে থাকতেন বড়দির বাড়িতে।

১৯২৮ সালে বাঁকুড়া ওয়েসলিয়ন মিশন কলেজ থেকে আই এসসি পাশ করে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হন গণিতে অনার্স নিয়ে। এখানেই পাঠবিপর্যয় নামে জীবনে। বন্ধুর সাথে বাজি ধরে হঠাত্‍ লিখে ফেললেন জীবনের প্রথম গল্প ‘অতসীমামী’। বিচিত্রা পত্রিকার অফিসে গিয়ে দিয়ে আসেন নিজে। ছাপা হয় গল্পটি। সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় নিজে মানিকের বাসায় গিয়ে ২০ টাকা সম্মান দক্ষিণা দিয়ে আসেন হাতে। সেই শুরু।

জন্মপত্রিকায় নাম ছিল অধরচন্দ্র। পিতৃদত্ত নাম প্রবোধকুমার। ঘুটঘুটো কালো গাত্র বর্ণের কারণে কালো মানিক ডাক নাম প্রচলিত হয়। সেই সূত্রে মানিক নামেই সাহিত্যসাধনা শুরু করেন বাংলা সাহিত্যের এই অরূপ রতন। পড়াশুনা ছেড়ে লেখালেখিতে মশগুল হতে দেখে দাদারা কলকাতায় থাকবার খরচ পাঠানো বন্ধ করে দেন। জেদি মানিককে তাতেও রোখা যায়নি। কথা দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ – শরৎ চন্দ্রের মতো তিনিও একদিন পাঠকনন্দিত সাহিত্যিক হবেন। হয়েছেনও । ১৩খণ্ডে বিধৃত তাঁর সম্পূর্ণ রচনাবলী ।উপন্যাসের সংখ্যা ৩৫ টি। ছোটগল্প লিখেছেন ২৫০ মতো । গ্রন্থ সংখ্যা -৫৭।
জীবিকার প্রয়োজনে নবারুণ পত্রিকায় সম্পাদকের (১৯৩৪) চাকরি নিয়েছেন।পরে ,বঙ্গশ্রী পত্রিকায় সাপ্তাহিক বিভাগে সহকারী সম্পাদকের কাজ করেছেন কিছুদিন (১৯৩৭- ৩৮)। ১৯৪৩ সাল নাগাদ সরকারি অফিসে কাজ করেছেন কিছুদিন। ফুলটাইম লেখক হয়েছেন। অক্লান্ত পরিশ্রমে লিখে গেছেন।
যৌবনে কুস্তির আখড়ায় নিয়মিত মুগুর ভাঁজতেন। গুন্ডার দলের সাথে পাঙ্গা নিতেন অকুতোভয়ে। দুরন্ত এই তরুণ আড়বাঁশিতে মুগ্ধ করতেন সকলকে। সুকণ্ঠে পরিবেশন করতেন অতুলপ্রসাদ ও রবীন্দ্রনাথের গান।

স্বাস্থ্যসচেতন প্রাণবন্ত মানিকের মৃগীরোগ ধরা পড়ে ১৯৩৫ সালে। মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে যেতেন। পরে এই অসুখ কালান্তক হয়ে তাঁর জীবনে সংকট ঘনীভূত করে। ড. বিধানচন্দ্র রায় আজীবন মানিকের পাশে থেকেছেন। তাঁরই পরামর্শে ১৯৩৮ সালে (কমলা দেবীর সাথে )বিয়ে দেওয়া হয় মানিকের। বিয়ের পর প্রিয়জনের সান্নিধ্যে অসুখ সেরে যাবে, আশা করেছিলেন। তবে, তা হয়নি।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫)। এছাড়াও পদ্মানদীর মাঝি ও পুতুল নাচের ইতিকথা তাঁর মহত্তম সৃষ্টি। মাঝি জীবনের দীর্ঘ সান্নিধ্যে পদ্মানদীর মাঝি লিখতে প্রাণিত হয়েছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হলো অমৃতস্য পুত্রা:, শহরতলী, জননী, প্রতিবিম্ব ,অহিংসা, চতুষ্কোণ ইত্যাদি। তাঁর গল্পগ্রন্থ গুলি যথাক্রমে অতসীমামী, প্রাগৈ তিহাসিক , সরীসৃপ ,মাটির মাশুল, হলুদপোড়া ,আজ কাল পরশুর গল্প, ছোট বকুলপুরের যাত্রী, ইত্যাদি। লিখেছেন প্রবন্ধ নিবন্ধ। কবিতাও। একমাত্র নাটক ভিটেমাটি (১৯৪৬)।

তবে রূঢ় বাস্তব হল ,দু’ তিনটি উপন্যাস এবং দশ পনেরোটি বহু পঠিত ছোট গল্পের বাইরে অন্যান্য লেখালেখি বাঙালি সাধারণ পাঠকের দরবারে সেভাবে প্রচারিত হয়নি। একাডেমিক পঠন পাঠনের ঊর্ধ্বে শতবর্ষ উত্তর এই আধুনিক বাঙালি সাহিত্যিক সেভাবে আলোচিত হন না। কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হওয়ার পর বিভূতি ভূষণের নবজন্ম হয়েছিল। মানিকের ক্ষেত্রে সেজাতীয় ম্যাজিক ঘটেনি। অথচ ইংরেজি হিন্দি ছাড়াও বহু আঞ্চলিক ও বিদেশি ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে। সেসব নিয়ে বুদ্ধিজীবী সমাজ তর্কে বিতর্কে যথারীতি মেতে ওঠেন।

মানিকের প্রতিভা নিয়ে মূল্যায়ণ করতে গিয়ে একটি স্বাভাবিক বার্তা কোনো কোনো মহলের থেকে প্রচার করা হয় যে, তিনি প্রথম জীবনে ফ্রয়েড দ্বারা এবং পরবর্তীকালে ১৯৪৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণের পর মার্কস দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উদ্দেশ্যমূলক সাহিত্য রচনা করেছেন। এই জাতীয় সরলীকরণ ঠিক নয়। সমাজ ও মানুষের কাছে দায়বদ্ধ মানিকের লেখায় পারম্পর্য আছে। মার্কসবাদের অালোকেই তিনি ভাববাদ ও বস্তুবাদের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। তা ব্যক্তি জীবনে এবং সাহিত্যেও। মানিকের ভাষ্যে – “ভাববাদ যদি একেবারেই বর্জন করতে পারতাম – তবে আর সংঘাত থাকতো কিসের !”
তাঁর প্রতিভার মূল্যায়ণ করতে গিয়ে নির্মাল্য আচার্য চমৎকার লিখেছেন -“যে সমাজ ও মানুষকে তিনি দেখেছেন ও সাহিত্যে রূপ দিয়েছেন তার মৌলিক কোনো পরিবর্তন আজও ঘটেনি। তাই তাঁর আশা, হতাশা , আহ্বান ও লড়াই সাধারণ মানুষের ও সমাজের কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি আজকের সমাজ সচেতন লেখকদের উপর বর্তেছে। “(ভূমিকা – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাছাই গল্প /মণ্ডল বুক হাউস) ।

দারিদ্র্য- লাঞ্ছিত জীবনে লংক্লথের মলিন পাঞ্জাবি, ধুতি আর চটি ছিল নিত্য সংগী। বাড়ি ও বাসায় পরতেন লুঙি ও খড়ম। রোগের ছোবল থেকে সাময়িক আরামের জন্য মদ্যপান শুরু করেন। যে সময়ে তিনি কলকাতায় বসবাস করছেন, সামাজিক ,রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবেশ তখন টালমাটাল। ফলে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের ছাত্র মানিক প্রগতি সংস্কৃতি আবহে টাটকা শ্বাসের সন্ধান করেছেন ।

১৯৩৭ সালে প্রগতি সংকলন প্রকাশিত হল। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন। সেখানে বিভূতি ভূষণ ,সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ,বিষ্ণু দে ,বুদ্ধদের বসু ,অরুণ মিত্রদের সাথে লিখেছেন মানিকও। ১৯৪৬ -এ কমিউনিস্ট প্রার্থী কল্পনা দত্তের ভোট প্রচারে কলকাতা থেকে পার্টি নেতাদের সাথে চট্টগ্রামে গিয়ে বক্তৃতা করেছেন মানিক। ১৯৪৩এর গোড়াতেই ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘে যুক্ত হয়ে যান। দপ্তরে যেতেন প্রতি বুধবার , প্রায়। গল্প পড়তেন। এরকম এক সাহিত্যের আড্ডায় পাঠ করেন – হারানের নাতজামাই।

ছেচল্লিশের দাঙ্গা কাতর মানুষটি শান্তি আন্দোলনের অক্লান্ত পথিক। তখন তিনি প্রগতি লেখক সংঘের যুগ্ম সম্পাদক । ১৯৫৩ সালে আয়োজিত সংঘের প্রথম সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছেন। দারিদ্র্য সত্ত্বেও পৈত্রিক বাড়ি বিক্রির আট হাজার টাকা (সে সময় সামান্য নয় ) তুলে দিয়েছেন বিপন্ন পার্টির তহবিলে।

তাঁর অসুস্থতা বাড়লে চিন্তিত বন্ধুরা ১৯৫৪ সালের এক সন্ধ্যায় অতুলচন্দ্র গুপ্তের বাড়িতে মিলিত হন। পথ সন্ধানী সভায় উপস্থিত ছিলেন তারাশঙ্কর, দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় , সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ব্ন্ধু। তাঁরা আর্থিক সাহায্যের আবেদন রাখেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে মাসিক ১০০ টাকা পেনশন ভাতা দেওয়া শুরু হয় লেখককে। এককালীন ১২০০ টাকাও ।নেপথ্যে মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র।

১৯৫৫ সালের ২০ আগস্ট লুম্বিনী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফিরে আসার পরও মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে যেতেন। মৃত্যুর আগে যখন প্রায় চৈতন্যরহিত তখনও ডান হাত শূন্যে সঞ্চালিত করে যেতেন মানিক। অবশেষে ৩০ নভেম্বর (১৯৫৮) জ্ঞান হারান। ২ ডিসেম্বর সম্পূর্ণ অচেতন মানিককে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয়। ৩ ডিসেম্বর ভোররাতে প্রয়াত হন বিশ্বমানের শক্তিমান গল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

- Advertisement -
Latest news
Related news