Saturday, April 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-১০৮।। বিনয় মুখোপাধ্যায় ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

বরেণ্য সাহিত্যিক
বিনয় মুখোপাধ্যায় বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

১৬ আগস্ট ১৯৪৭। স্বাধীনতা- প্রাপ্তির তুরীয় লগ্নে এক তরুণ সাংবাদিক অফিসের দায়িত্ব পেয়ে জাতির পিতার বাণী সংগ্রহ করতে সোদপুরে গেলেন। কিন্তু কলকাতায় অবস্থানরত ব্যথিত মহাত্মা সেদিন তাঁকে ফিরিয়ে দেন। আশাহত তরুণকে সেদিন বলেন — বাণী দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মন ভেঙে গেছে। সেদিন এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হন যে তরুণ সাংবাদিক, তাঁর নাম বিনয় মুখোপাধ্যায় (জন্ম ১০.০১.১৯০৮ / মতান্তরে ১০.০১.১৯০৯ ; মৃত্যু ২২.১০.২০০২)।

তাঁর জন্মস্থান ত্রিপুরার চাঁদপুর। কোনো কোনো জীবনীকার মনে করেন বিনয় জন্মেছেন ঢাকার ফেগুনামার গ্রামে। তাঁর লেখা থেকে জানা যায়, শৈশব কেটেছে পদ্মা -মেঘনা – ডাকাতিয়া নদীর ঢেউ গুনে গুনে। বাবা — ফণিভূষণ। মা — মনোরমা দেবী। বাবা ছিলেন চাঁদপুরের একটি জুটমিলের বড়বাবু।

সমকালীন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করতেন। ছিলেন অন্ধ রবীন্দ্রভক্ত। উত্তরাধিকার সূত্রে সাংবাদিক বিনয় সাহিত্য চর্চায় মগ্ন হন।

বাল্য শিক্ষা হাসান আলি জুবিলি স্কুলে। সেন্ট পলস্ কলেজ থেকে আই. এ. পাশ করেন। বঙ্গবাসী কলেজে লাভ করেন বি. এ. ডিগ্রি। ছাত্র জীবনে চুটিয়ে ক্রিকেট খেলেছেন। প্রথম জীবনে মুদ্রণ শিল্প সংক্রান্ত ব্যবসায় চলে আসেন। বৌবাজার এলাকায় নিজেই শুরু করেন ছাপাখানা। ব্যবসার পাশাপাশি ‘আর্থিক জগৎ’ নামে একটি পত্রিকায় ‘শ্রীপথচারী’ ছদ্মনামে রাজনৈতিক নিবন্ধ লিখতেন নিয়মিত। তবে পাশাপাশি সাংবাদিক – জীবন শুরু যুগান্তরে। একই ছদ্মনামে লিখেছেন। সেখান থেকে পরে যোগ দেন সেকালের বিখ্যাত অমৃতবাজার পত্রিকায়।

কলকাতায় অবস্থানকালে প্রিয় ব্ন্ধু ও সহপাঠী সুরসাগর হিমাংশু কুমার দত্তের (১৯০৮ – ১৯৪৪) জন্য নিয়মিত গান লিখতেন। কলকাতার সংগীত মহলে রীতিমতো জনপ্রিয় গীতিকার জুটি ছিল অজয় কুমার ভট্টাচার্য ও বিনয় মুখোপাধ্যায়। তাঁর লেখা গান নিয়ে রেকর্ড করেছেন শচীন দেব বর্মনও। প্রাক্ স্বাধীনতা পর্বে বিনয়ের লেখা ‘নতুন ফাগুনের দিনে’ গানটি শচীন কর্তার গলায় অসাধারণ জনপ্রিয় হয়েছিল। একই ভাবে উমা বসুর কণ্ঠে ‘ঝরানো পাতার পথে’ গানটি ব্যাপক খ্যাতি লাভ করে। তবে ব্ন্ধু হিমাংশুর অকাল প্রয়াণে বিনয় গান লেখা ছেড়ে দেন।

ইতোপূর্বে দুজন সাংবাদিক প্রবাসে বাংলা সাহিত্যের চর্চা করেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও রবীন্দ্রসুহৃদ রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। মাইকেল ছিলেন মাদ্রাজে। রামানন্দ এলাহাবাদে। সমসময়ের রাজনৈতিক আন্দোলন ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সাহসের সাথে উপস্থাপিত করে রামানন্দের প্রবাসী পত্রিকা। এদিকে বিনয় চলে যান দিল্লীতে (১৯৪২)। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রস্থলে রাজনীতির অরাজনৈতিক ভাষ্যকার হয়ে ওঠেন ‘যাযাবর’ ছদ্মনামে।

দিল্লীতে গিয়ে ব্রিটিশ প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরোয় চাকরি নেন। পদোন্নতির পর ঐ ব্যুরোর ডেপুটি সেক্রেটারি হন। অবসর গ্রহণের প্রাক্কালে পাঁচবছর ঐ ব্যুরোর তিনিই ছিলেন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি। পদাধিকারবলে যুক্ত ছিলেন আকাশবাণীর সঙ্গেও । স্বাধীনতার পর কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ডিরেক্টরেট অফ অ্যাডভাটাইজ়িং এন্ড ভিজুয়াল পাবলিসিটি’ এবং ‘রেজিস্ট্রার অব নিউজ পেপারস’ সংস্থা দুটির প্রধান পদে নিযুক্ত হন। স্বভাবতই স্বাধীনতার আগে-পরে বহু বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে আসেন তিনি।

পেশাদার সাংবাদিক তথা তথ্য ও সংবাদ বিভাগের উচ্চ পদে আসীন থাকবার সুবাদে মহাত্মা গান্ধীর নানা কর্মকাণ্ড চাক্ষুষ করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল, জহর লাল নেহরু ,ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখকে দেখেছেন কাছ থেকে। নানা সময়ে এঁদের সফরসংগী হয়েছেন। এঁদের কর্মকাণ্ডের ভাবনায় সংরক্ত হয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে তাঁর লেখায়। মাসিক বসুমতী পত্রিকায় ১৯৪৫ সাল থেকে যাযাবর ছদ্মনামে প্রকাশিত হয় ‘দৃষ্টিপাত’ রচনা। যা ১৯৪৭ সালে গ্রন্থাকারে পাঠকের দরবারে উপস্থাপিত হলে জনপ্রিয়তার চূড়ায় আরোহণ করেন বিনয় মুখোপাধ্যায়। ‘দৃষ্টিপাত’এমন একটি উপন্যাস যা ভাষার ঔজ্জ্বল্যে, কাহিনীর নাটকীয়তায় এবং শৈলীর অভিনবত্বে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছে। দিল্লী শহরের বর্ণনাটিও উপন্যাসের উপভোগ্য বিষয়। ৩৮ বছরের সাহিত্য জীবনে মোট গ্রন্থ সংখ্যা মাত্র আটটি। জনান্তিক (১৯৫২), ঝিলম নদীর তীর (১৯৫৪), লঘুকরণ (১৯৬৪), হ্রস্ব ও দীর্ঘ (১৯৭৩) এবং যখন বৃষ্টি নামল (১৯৮৩)। শিশু কিশোর দের জন্য রচিত ঝিলম নদীর তীর সুধীর চন্দ্র সরকার সম্পাদিত সেকালের বিখ্যাত ‘মৌচাক’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়।

সাংবাদিক হওয়ার কারণে শাসনযন্ত্রের তাপ – উত্তাপ উপলব্ধি করেছেন বিনয়। তা তাঁর অননুকরণীয় ভাষায় ব্যক্ত করেছেন সহজেই। বহু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান , বিবরণ, দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ পাঠের সুযোগ, পুরাতন দলিল দস্তাবেজ, গোপন নির্দেশনামা ও মুদ্রিত অমুদ্রিত সরকারী বিবরণী পাঠের সুযোগ হয়েছে তাঁর। সেই অভিজ্ঞতা যাযাবর ছদ্মনামের আড়ালে সাহিত্যরূপ লাভ করেছে। তাঁর লেখা হিন্দি সহ নানা ভাষায় অনূদিত হয়ে বহু চর্চিত হয়েছে। হিন্দি সাহিত্যিক মন্মথনাথ গুপ্ত ঝিলম নদীর তীর গ্রন্থটি অনুবাদ করে প্রকাশ (১৯৬০) করেন। পাকিস্তান সরকার গ্রন্থটিকে তাদের দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

বাংলা রসসাহিত্যে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছেন বিনয়। প্রমথ চৌধুরী, সুকুমার রায় ছিলেন যে ঘরানার পূর্বসূরী। অন্নদাশঙ্কর রায় , গৌর কিশোর ঘোষ, অমিতাভ চৌধুরী, তারাপদ রায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ সাহিত্যিক সে ধারার উত্তর সাধক হিসেবে সার্থকতা অর্জন করেছেন। শত দুখে জর্জরিত বাঙালির মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছেন তিনি। দেশের অন্যান্য রাজ্যের মানুষজনের দুঃখজয়ী সহাস্য মুখের গোপন রসহ্য ফাঁস করতে চেয়ে তিনি লিখেছেন — “তাদের হাস্য পরিহাস (উত্তর ভারতের মজুর মেয়েদের ) এবং সম্মিলিত সংগীতে পথ ঘাট আলোড়িত বললেই চলে। তাদের একটি সন্ধ্যার কাকলিকলরব দেখে বাঙালী পথিকের মুখব্যাদান দীর্ঘ হয়। বাজি রেখে বলা যায়, বল্লাল সেনের রাজত্বকাল থেকে প্রফুল্ল সেনের আমল পর্যন্ত বাংলা দেশের মুটে মজুরেরা একযোগে এতখানি হাসেনি।”

বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যের জনক বলা হয় তাঁকে। খেলার রাজা ক্রিকেট এবং মজার খেলা ক্রিকেট (দুটোই ১৯৫৩) এ বিষয়ে দিশারী গ্রন্থ হয়ে আছে। তাঁর স্ত্রী দুর্গাদেবী ছিলেন যামিনী রায় ঘরানার চিত্রশিল্পী। ‘পুষ্পপট’ নামক একটি গ্রন্থের লেখিকা। ফুল সাজানো বিষয়ে এই গ্রন্থটিও বাংলা ভাষায় প্রথম সংযোজন যা বিষয় বৈচিত্র্যে অভিনব। দুর্গাদেবী প্যারিসে ছাত্র জীবন কাটিয়ে ছিলেন। বিনয় মুখোপাধ্যায় কর্মসূত্রে ও অবসর গ্রহণের পর সস্ত্রীক ইউরোপ ও আমেরিকা ভ্রমণ করেছেন বহুবার। দিল্লীর নরসিংহ দাস স্মৃতি পুরস্কার (১৯৫০) এবং বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৮) অর্জন করেছেন ।

রবীন্দ্রভক্ত বিনয় মুখোপাধ্যায় ছাত্রাবস্থায় কবিগুরুকে চোখের দেখা দেখার জন্য আকুল ছিলেন। সালটা ১৯৩০। খবর কাগজে পড়েছেন – রবীন্দ্রনাথ রেল পথে মাদ্রাজ রওনা দেবেন। ব্যাস! সটান হাজির হন হাওড়া স্টেশনে। মনোবসনা পূরণ হয় তাঁর। সেদিন কোনো কথা বলার সুযোগ হয়নি। শুধু দুচোখ ভরে দেখেছেন বিশ্বকবিকে। পরে কর্ম সূত্রে কয়েকবার গুরুদেবের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সারাজীবন পৃথিবীর দেশে দেশে এবং স্বদেশে অগণিত ব্যক্তিত্বের সংগসুধা পান করেছেন তিনি। তবু রবীন্দ্র সান্নিধ্যকে আজীবন সুখ স্মৃতি হিসেবে বরণীয় করে রেখেছিলেন বিনয় মুখোপাধ্যায় ।★

- Advertisement -
Latest news
Related news