Wednesday, May 22, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা- ৫৩ ।। বিপিনচন্দ্র পাল; বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

স্বরাজ-সন্ধানী
বিপিনচন্দ্র পাল                      বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

সাল১৯০৭। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী উত্তাল আন্দোলনে বাংলা তথা দেশ অগ্নিগর্ভ। অরবিন্দ ঘোষের বিরুদ্ধে “বন্দেমাতরম বিদ্রোহ মামলায়” সাক্ষ্য প্রদানের জন্য ব্রিটিশদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন ‘বন্দেমাতরম ‘ পত্রিকা সম্পাদক। আদালত অবমাননার দায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল মানুষটিকে। মজার বিষয়, জেল থেকে ছাড়া পেয়ে পাড়ি দিলেন ইংল্যান্ডে।সেখানে গিয়ে স্বমূর্তি ধারণ করলেন পুনর্বার। প্রকাশ করলেন একটি ইংরেজি জার্নাল-‘ স্বরাজ’। গঙ্গার ঢেউ আছড়ে পড়ল টেমসের তটভূমিতে। তিনি, বিপিন চন্দ্র পাল (৭-১১-১৮৫৮ — ২৫ -০৫ – ১৯৩২)।

এটা প্রথম বিলেত সফর নয়। এর আগে ১৮৯৯ সালে সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ডের ম্যাঞ্চেস্টার কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা করতে যান। ঘুরে আসেন ইউরোপ – আমেরিকা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটির জন্ম শ্রীহট্ট জেলার পইল গ্রামে। পড়াশুনা সিলেট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে। প্রেসিডেন্সি কলেজে। বাবার নাম রামচন্দ্র, মা – নারায়ণী দেবী। বাবা মুন্সেফ ছিলেন। ছিলেন ছোট তালুকের জমিদারও। মা ছিলেন উদারমনা। কলকাতায় পড়তে এসে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর সংস্পর্শে আসেন তিনি। তৈরী হয়ে যায় আগামী জীবনের রূপরেখা।
ছাত্রাবস্থায় ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হন। সমাজের কাজে সারা বাংলা ছুটে বেড়াতেন তিনি। তার ফাঁকে ফাঁকে ভদ্রস্থ জীবিকার জন্য শিক্ষকতা করেছেন কটকে। শ্রীহট্টে। কলকাতায়। বাঙ্গালোরে। কোথাও থিতু হতে পারেননি।

কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরিতে কাজ করেছেন সম্পাদক হিসেবে। এমনকি কলকাতা পৌর কর্পোরেশনে লাইসেন্স ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব ও সামলেছেন। কলকাতায় তখন শ্রীহট্টের প্রচুর মানুষ বসবাস করতেন। তাদের নিজস্ব সংগঠন ছিল কলকাতায়”শ্রীহট্ট সম্মিলনী”। তাদের নির্দেশে বন্ধুবর রাজেন্দ্র চৌধুরীর সাথে শ্রীহট্টে গিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি স্কুল পুনরায় চালু করলেন। নাম দিলেন – শ্রীহট্ট জাতীয় বিদ্যালয়। নিজে হলেন তার প্রধান শিক্ষক (১৮৮০)।
শুধু ব্রাহ্ম উপাসক নন , এই ধর্মের তাত্ত্বিক দিক নিয়ে পৃথিবীর যে প্রান্তে যখন কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন, বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রিত হয়েছেন, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিজের মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর ধর্ম সংক্রান্ত বাণী গুলি তাঁর আধুনিক মনস্কতার পরিচায়ক। তিনি বলেছেন-
১। সত্য এবং কল্যাণ যে আকারেই প্রকাশিত হউক না কেন,মূলে এক। সত্যে সত্যে এবং প্রকৃত কল্যাণের পথে কোন ও ভেদ বিরোধ নেই ।
২। আমি যাহা নই,তাহার সম্মুখীন হইয়া,আমি যে কী ইহা প্রথমে বুঝিতে পারি।
৩। নির্মল চিত্ত ব্যতীত কোনো বিষয়েই সত্য দেখিবার অধিকার জন্মে না।
এমনই এক নির্মল চিত্তের পরোপকারী মানুষকে ব্যক্তিজীবনে নানা টানা পোড়েনের মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়। ছাত্র জীবন থেকেই রামমোহন – বিদ্যাসাগরের উত্তরাধিকার বহন করেছেন চিন্তায় ও কর্মে।

বিধবা বিবাহ প্রচলনের কট্টর সমর্থক ছিলেন নিজে। বিয়েও করেন এক বিধবা রমণীকে। পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর পালিত কন্যা বাল বিধবা নৃত্যকালী দেবীকে। এখবর শ্রীহট্টে পৌঁছানোর পর তাঁর পিতা তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। তাতেও দমে যাননি তিনি । দুই পুত্র ও দুই কন্যাকে নিয়ে তাঁদের দাম্পত্য জীবন ব্রাহ্ম সমাজের ছত্রছায়ায় চলেই যাচ্ছিল। এমন সময় নিজের বিবাহিতা কন্যা একদিন বিধবা হয়ে ফিরে এল। যোগাযোগ করে অগ্নি যুগের বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের সাথে দ্বিতীয়বার বিয়ে দেন তার। কোথাও নির্দিষ্ট কোনো আর্থিক নিশ্চয়তা না থাকায় ,শেষ জীবনে অনটনে কাটাতে হয়। তবে হাসিমুখে তা মেনে নিয়েছেন।

দ্বিতীয় দফায় প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরেন ১৯১১ সালে। বোম্বাই বিমান বন্দরে। দেশের মাটিতে পা দিতে না দিতেই রাজদ্রোহের অভিযোগে ফের কারাগারে যেতে হয় তাঁকে। তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতায় তখন আগুন ছুটছে যে। স্বরাজের দাবীতে সতত সোচ্চার এই মানুষটি বছর খানেক পরে ছাড়া পান। কলকাতার মানুষ জড়ো হন তাঁকে প্রদত্ত গণসংবর্ধনা সভায়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তাঁর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানাতে লিখে, সুরারোপ করে পরিবেশন করলেন তাঁর কালজয়ী স্বদেশী গান।- গণসংবর্ধনা সভা ভিন্নতর মাত্রায় দেশপ্রেমের রোমাঞ্চকর আবেগে মথিত হল। কবি পরিবেশন করেন – ‘বঙ্গ আমার জননী আমার ‘ অভ্যর্থনা সংগীতটি ।
যে উদাত্ত ওজস্বী ভাষা তাঁর অস্ত্র ছিল, লক্ষ লক্ষ মানুষকে যে বাগ্মিতায় মুগ্ধ করতেন তিনি, সেই ভাষাই ছিল তাঁর শত্রুও।

কংগ্রেসের অভ্যন্তরে তখন নরমপন্থা, মধ্যপন্থা এবং চরমপন্থার টানাপোড়েন চরমে। যে দেশব্ন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁকে গুরুদেব বলে সম্বোধন করতেন, তাঁর সংগেও মতান্তর মনান্তরের দিকে যাচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল প্রমুখ ব্যক্তিত্বের সাথে সখ্য ছিল বিপিন চন্দ্রের। তিনিও অনুভব করেছিলেন, মতিলাল নেহেরু এবং মহাত্মা গান্ধীও তাঁর মতামতকে মর্যাদা দিচ্ছেন না।দূরত্ব তৈরী হল। প্রথমে স্বরাজ দল গঠন, পরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন তিনি ১৯২৫ সালে।
জাতীয় কংগেসের জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতা হিসেবে, আপসহীন নেতা হিসেবে লড়াই করেছেন বিপিন চন্দ্র পাল। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন তিনি।১৯১৯ সালে বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে হোমরুল লীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে তৃতীয় দফায় ইংল্যান্ড যান । বহুবার প্রাদেশিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন। অসহযোগ আন্দোলনে গান্ধীজীর সাথে মতের অমিল এবং চিত্তরঞ্জনের বেঙ্গল প্যাক্টের সমালোচনা (১৯২৩) দলের অনেকে ভালোভাবে নেননি।

তিনিও নিজেকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরিয়ে নেন। কিন্তু ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশন গঠন করা হল। তিনিও যখন দেখলেন সেই কমিশনে কোনো ভারতীয় সদস্য নেই তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারলেন না। প্রতিবাদে কমিশন বর্জনের আহ্বানে তীব্র আন্দোলন সংগঠিত করেন ।
সাংবাদিক হিসেবে তিনি ক্ষুরধার যুক্তির অবতারণা করতেন। ১৯২১এ তিনি গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে লেখেন- “You wanted magic, I tried to give you logic. But logic is in bad odour when the papular mind is excited. I have naver spoken a half true when I know the true……I have never tried to lead people in faith blind folded.

১৮৮০ সালে সিলেটে প্রথম বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশ হয় তাঁর হাতে, নাম -‘ পরিদর্শন’। জীবন-ভর নানা পত্র পত্রিকায় সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। বেঙ্গল পাবলিক অপিনিয়ন (১৮৮৩), নিউ ইন্ডিয়া (১৯০১), বন্দেমাতরম (১৯০৬), স্বরাজ(১৯০৮), হিন্দু রিভিউ (১৯১২), আলোচনা (১৯১৩), ট্রিবিউন, সোনার বাংলা (১৯২৪), জনশক্তি (১৯১৯) হল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে সাহিত্য চর্চায় ডুবে যান বিপিনচন্দ্র। যৌবনে কথা সাহিত্য দিয়ে পথ চলা শুরু। পরে বেশি লিখেছেন প্রবন্ধ। ১৮৮৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার জীবনী লেখেন বাংলায়। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “সত্তর বছর” সেকালের সমাজ ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে। তাঁর লেখার উপযুক্ত মূল্যায়ণ আজ ও বাঙালি করে উঠতে পারেনি,এ চরম লজ্জার। যে মানুষটা স্বরাজের দাবীতে সোচ্চার হন, স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিপথ বিশ্লেষণে দূরদর্শী হন, তিনি ইতিহাসে একঘরে থেকে গেছেন। অথচ তিনিই তো বলেন -” ভিতরে যে, দাস বাইরে সে স্বাধীন হইতে পারেনা”।

নারী সমাজের দাসত্ব শৃঙ্খল মোচনে তাঁর উৎকণ্ঠা ও মনোযোগ ছিল সর্বাগ্রে। আজীবন তাঁদের সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষার পরিবেশ, মর্যাদা ও সম্মানের জন্য লড়াই করে গেছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘শোভনা’র প্রারম্ভিক আখ্যাপত্রে ঘোষিত হয়েছে —
জীবন সংগ্রামে ভারতের নামে
যত রক্তবিন্দু ঝরিবে এবার,
শত পুত্র হবে বীর অবতার,
ভারত আধার ভারতের ভাব
ঘুচায় তারা
না জাগিলে সব ভারত ললনা
এ ভারত আর জাগে না জা গে না ।

- Advertisement -
Latest news
Related news