Monday, May 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা- ৬২ : রাজশেখর বসু।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

খাঁটি খনিজ সোনা                                                  রাজশেখর বসু                                              বিনোদ মন্ডল                 প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী একবার তাঁকে বলেছিলেন, “আপনার সমস্ত পাণ্ডুলিপি যদি হারিয়ে যায় আমাকে বলবেন , আমি স্মৃতি থেকে সব লিখে দোব”। যাঁকে উদ্দেশ্য করে এই আশ্বাস বাণী , তিনি রাজশেখর বসু (১৬.০৩. ১৮৮০ — ২৭.০৪. ১৯৬০)।                              মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখালেখি শুরু করেন আঠাশ বছর বয়সে। রাজশেখরের ইনিংস শুরু আরো পরে – বিয়াল্লিশে। কিন্তু এসেই বাঙালী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, জনপ্রিয়তার উত্তুঙ্গ শিখরে করেন আরোহণ। যদিও স্বনামে নয়, ছদ্মনামে। পরশুরাম।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

তাঁর এই পরশুরাম ছদ্মনাম ধারণের সিদ্ধি নিয়ে বহু গবেষক নানা যুক্তিজাল বিস্তার করেছেন। সামাজিক নানা সমস্যা , কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, অপবিজ্ঞান, অনাচার ভন্ডামি ও ধড়িবাজির কাহিনী চিত্রণে পরশুরামের কুঠার কতখানি শাণিত হয়েছে তা নিয়ে চুল চেরা বিশ্লেষণ হয়েছে শতবর্ষ জুড়ে। উৎসমূলে রয়েছে অন্য প্রতিভাস। তৎকালীন অনন্য পত্রিকা ‘ভারতবর্ষ’ এর সম্পাদক জলধর সেন তাঁর কাছে একটি গল্প প্রত্যাশা করেন। স্বনামে লিখতে কিছুতেই রাজি হননি রাজশেখর। গল্প খাম বন্দি হওয়ার সময় বাড়িতে হাজির ছিলেন তারাচাঁদ পরশুরাম স্যাকরা। রাজশেখর বসু অকস্মাৎ তারই ছদ্মনাম বসিয়ে দেন লেখকের স্বনামের পরিবর্তে ।

তীক্ষ্ণধী রাজশেখরের জন্ম অধুনা পূর্ব বর্ধমান জেলার বামুনপাড়া গ্রামে। মামার বাড়িতে। পৈত্রিক ভিটে ছিল নদীয়া জেলার বীরনগরে (উলা)। তাঁর বাবা দার্শনিক ও পণ্ডিত চন্দ্রশেখর বসু ছিলেন দ্বারভাঙা রাজ এস্টেটের ম্যানেজার। মা – লক্ষ্মীমণি দেবী। কৈশোর ও তারুণ্যের কয়েকটা বছর দ্বারভাঙায় কাটিয়েছেন। তাই হিন্দিতে ছিলেন চোস্ত। বারো বছর বয়স-তক বাংলা বলতেও পারতেন না স্বচ্ছন্দে।     দ্বারভাঙার রাজ স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (১৮৯৫) এবং পাটনা কলেজ থেকে এফ. এ. (১৮৯৭) পাশ করার পর কলকাতায় এসে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। রসায়ন ও পদার্থ বিদ্যায় অনার্সসহ বি. এ. পাশ করেন ১৮৯৯তে । এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এ. পাশ করেন রসায়নে (১৯০০)।প্রথম স্থান অর্জন করেন। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। রিপন কলেজ থেকে বি এল ডিগ্রি (১৯০২) অর্জন করেন। যদিও ওকালতির মেয়াদ ছিল তিন দিনের আদালত যাত্রা।

জীবনের মোড় ঘুরে যায় যশস্বী বিজ্ঞানী আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সংগে সাক্ষাতের পর। ১৯০১এ স্থাপিত হয়েছে বেঙ্গল কেমিক্যাল। ১৯০৩এ সামান্য বেতনে কেমিস্ট হিসেবে যোগদান করেন তিনি। ১৯০৪এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালকমন্ডলীতে অন্তর্ভুক্ত হন । তারপর আর পেছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। সংস্থার সর্বাধিনায়ক হয়ে ওঠেন। ১৯৩২এ অবসর গ্রহণ করেন এখান থেকেই। তাঁর অসামান্য দক্ষতায় বেঙ্গল কেমিক্যাল পরাধীন ভারতে সুনামের সাথে দশ দিগন্তে প্রসারিত হয়। নিরন্তর নানা গবেষণা এবং পণ্যের ব্যবসায় অচিরে পল্লবিত হয় বেঙ্গল কেমিক্যাল । আজীবন প্রতিষ্ঠানের উপদেশক হিসেবে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন শ্রী বসু ।

এই প্রতিষ্ঠানের টানেই গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সপ্রশংস সর্বক্ষণের সাহিত্যসেবী হওয়ার হাতছানিও সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন। লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতাল যখন স্বতন্ত্র একটি মানসিক হাসপাতাল হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য মাথা গোজার ঠাঁই খুঁজছে, প্রায় দিশেহারা, ভ্রাম্যমান, তখন নিজের তিলজলায় কিনে রাখা জমি তিনি দান করেছেন অকাতরে। ১৯৪০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যার পথ চলা শুরু।                          পরশুরামের গল্পগ্রন্থের সংখ্যা নয়টি। গড্ডলি, কজ্জলী, হনুমানের স্বপ্ন, গল্পকলা, ধুস্তরীমায়া, কৃষ্ণকলি, নীলতারা, আনন্দী বাঈ, এবং চমৎকুমারী। তাঁর প্রয়াণের পর প্রকাশিত হয় কবিতার বই – পরশুরামের কবিতা। পরবর্তীকালে স্বনামে নির্মাণ করেছেন অসাধারণ সব অনুবাদ গ্রন্থ – বাল্মীকি রামায়ণ, ব্যাসকৃত মহাভারত, কালিদাসের মেঘদূত , শ্রীমদ্ভগবতগীতা। শেষোক্ত গ্রন্থটি তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত। প্রকাশিত হয় দুটি প্রবন্ধ গ্রন্থ – লঘুগুরু ও বিচিন্তা শিরোনামে। চলচ্চিন্তা ছাড়াও অনান্য গ্রন্থগুলি হল – কুটির শিল্প, ভারতের খনিজ এবং ছোটদের জন্য – হিতোপদেশের গল্প ।

তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে তাঁর উজ্জ্বল অবদান ৩০০০০ শব্দ সমন্বয়ে অসাধারণ বাংলা অভিধান – চলন্তিকা। রবীন্দ্রনাথ, সুনীতি চট্টোপাধ্যায় সহ সেকালের তাবড় ভাষাবিদগণ যে গ্রন্থের সোচ্চারে তারিফ করেছেন । এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, ১৯৩৫ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত বানান সংস্কার সমিতি এবং ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিভাষা সংসদের সভাপতিত্ব করেন তিনি । স্বীকৃতি সম্মান ও পুরস্কারে নানা সময়ে নন্দিত হয়েছেন রাজশেখর। পেয়েছেন জগত্তারিণী পদক (১৯৪০), সরোজিনী পদক (১৯৫৫), রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৫৫), সাহিত্য অকাডেমি পুরস্কার (১৯৫৬)। ভারত সরকার প্রদত্ত পদ্মভূষণ (১৯৫৬), কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন উপলক্ষ্যে ডি. লিট. সম্মানে ভূষিত হয়েছেন (১৯৫৭-১৯৫৮)। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁকে ডি. লিট. প্রদান করে আপন গরিমা বৃদ্ধি করেছে।

রাজকীয় গাম্ভীর্য এবং রাজসভাতুল্য মজলিসি এই মানুষটির ১৪ নং পার্শিবাগানস্থিত বাড়িতে প্রায়ই নক্ষত্র সমাবেশ ঘটত। যদুনাথ সরকার, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়! মজলিসের চরিত্র ফুটে ওঠে তার নামে – ‘উৎকেন্দ্র সমিতি`।সাধে কি সুনীতি চট্টোপাধ্যায় তাঁকে ‘সুবুদ্ধি বিলাস’ অভিধায় অভিষিক্ত করেছেন! আর তাঁর পরম শ্রদ্ধাভাজন প্রফুল্লচন্দ্রের প্রতিক্রিয়া – ‘এই বুড়া বয়সে তোমার গল্প পড়িয়া choked হইয়াছি’। এদিকে স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষটি ১৯৬০ এর ১০ জানুয়ারী এক সংবর্ধনা সভায় সংবর্ধিত হওয়ার পর ভাষণে আত্মবিশ্লেষণ করে বলেছেন – ‘আসলে আমি আধা মিস্ত্রী আধা কেরানী। অভিধান তৈরি আর পরিভাষা নিয়ে নাড়াচাড়া মিস্ত্রীর কাজ, রামায়ণ মহাভারত অনুবাদ কেরাণীর কাজ।’                                                            ‘নেশা’ মুক্ত মানুষটি রসায়নে আর সাহিত্যের নবরস পরিবেশনেই বুঁদ থেকেছেন আজীবন। মাত্র আট বছর বয়সে আমীষ ত্যাগ করেছেন, আশি বছর বয়স পর্যন্ত অবিচল থেকেছেন। যা নিয়ে নানা মজার স্মৃতি ছড়িয়ে দিয়েছেন গল্পের পাতায়, আড্ডার আলোচনায়। সদ্য একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে প্রচারে — মানিকতলা বোমা মামলায় যে বোমার কথা আলোচিত হয়েছে, তার ফরমুলা ও ব্যবহৃত মালমশলার সরবরাহকারী ছিলেন দেশপ্রেমিক রাজশেখর বসু যা তখন প্রকাশ্যে এলে দ্বীপান্তর বা ফাঁসি অবধারিত ছিল। স্বাধীনতার পরেও আত্মপ্রচারবিমুখ মানুষটি এবিষয়ে নীরব থেকেছেন । ১৯৫৯ সালে একবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের জন্য খুব অসুস্থ হন,তার মধ্যেও সৃষ্টিধারা অব্যাহত ছিল। ১৯৬০-এ দ্বিতীয় দফা রক্তক্ষরণে ঘুমের মধ্যেই চলে যান চিরঘুমের দেশে।

- Advertisement -
Latest news
Related news