Wednesday, June 19, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১৫৪।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
চিন্ময় দাশরাধাগোবিন্দ মন্দির, রাউতমণি               (খড়গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর)

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

পূর্ব আর পশ্চিম– বিভাজিত দুই মেদিনীপুরের কিছু দূর সীমানা নির্মিত হয়েছে কেলেঘাই নদীর জলরেখা দিয়ে। কপালেশ্বরী হোল সেই কেলেঘাইর একটি উপনদী।
সেকালের খান্দার পরগণায় (বর্তমান খড়গপুর থানা) কপালেশ্বরী নদীর তীরে বহু প্রাচীন কাল থেকে এক দেবী বিরাজিত আছেন। তিনি ‘রাউতান চণ্ডী’। বিস্তৃত প্রভাব মণ্ডল এই দেবীর। দেবীকে কেন্দ্র করে কালে কালে একটি জনপদ গড়ে উঠেছিল নদীর পূর্বকূলে। দেবীর প্রভাবে, ‘রাউতমণি’ নাম হয়েছিল গ্রামটির।মোগল আমলে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত স্থানীয় রাজা-রাজড়াদের মধ্যে। সেকারণে, খান্দার পরগণার এই সকল এলাকা কখনও থেকেছে কাশীজোড়া পরগণার রাজাদের অধীনে। নারায়ণগড়ের বিখ্যাত ‘মাঢ়-ই-সুলতান’ ‘শ্রীচন্দন পাল’ রাজাদের অধিকারে গিয়েছে কখনও বা।
যে রাজাদের হাতেই যাক না কেন, ইংরেজ শাসনকালে একটি জমিদারবংশের বসবাস ছিল রাউতমণি গ্রামে।মহাপাত্র পদবীর সেই বংশটি কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা জানা যায় না। তিনটি প্রাচীন মন্দির এবং একটি রাসমঞ্চ আছে রাউতমণি গ্রামে। তার ইতিহাস থেকে জানা যায়, জমিদার বংশের জনৈক ভগবান মহাপাত্রের কীর্তি সেগুলি।
তবে, মহাপাত্রবংশের শেষ জমিদারের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি রাধাশ্যাম মহাপাত্র। দোর্দণ্ড প্রতাপ রাধাশ্যামের নাম আজও এলাকার প্রবীনদের মুখে শোনা যায়। এও জানা যায়, তাঁর নিজের পত্নী গুপ্তঘাতক দিয়ে স্বামীকে হত্যা করিয়েছিলেন। যাইহোক, রাধাশ্যাম ছিলেন অপুত্রক। তাঁর মৃত্যুর পর, দেব মন্দির সহ স্থাবর-অস্থাবর সবই তাঁর দৌহিত্রদের হাতে চলে গিয়েছিল। তখন থেকেই দেবতার সেবাপুজায় অচলাবস্থার সূচনা। ক্ষয়রোগ বাসা বেঁধেছিল মন্দিরে।
জমিদার বংশের তিনটি মন্দিরের মধ্যে গায়ে গা-লাগানো দুটি মন্দির ছিল মহাদেব শিবের। অন্যটি ছিল কুলদেবতার। রাধাগোবিন্দ নামের শ্রীকৃষ্ণ প্রতিষ্ঠিত ছিলেন মন্দিরে। সাথে একটি রাধিকা মূর্তি। সেগুলি এখন মহাপাত্র বংশের এক শরিক পরিবারে পূজিত হচ্ছেন।
রাধাগোবিন্দের পরিত্যক্ত মন্দিরটি ইটের তৈরি। পূর্বমুখী মন্দিরটি পঞ্চরত্ন রীতিতে নির্মিত হয়েছিল। ভিত্তিবেদীটি ফুট দুয়েক উঁচু। প্রদক্ষিণ-পথও আছে একটি।
সামনে খিলানের তিন-দুয়ারী অলিন্দ। তার সিলিং হয়েছে টানা-খিলান রীতিতে। গর্ভগৃহে একটিই খিলানের দ্বারপথ। সিলিং হয়েছে দুই স্তর খিলানের মাথায় গম্বুজ রচনা করে।
মন্দিরের পাঁচটি রত্নেই রথ-ভাগ এবং পীঢ়-রীতিতে থাক কাটা। শীর্ষক অংশগুলি অবলুপ্ত। একটি মাত্র আমলক দেখা যায়। ভারি দৃষ্টিনন্দন সেটির কারুকাজ। পঙ্খের সামান্য কারুকাজ ছাড়া, মন্দিরের অন্য কোনও অলঙ্করণ ছিল বলে মনে হয় না।
একটি এঁদো পুকুরের পাড়ে, বাঁশবাগানের স্যাঁতসেঁতে ছায়ায় ঢাকা মন্দিরসৌধটি দ্রুত বিনষ্টির পথে এগিয়ে চলেছে।
একটি রাসমঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছিল রাধাগোবিন্দের জন্য। ফুট চারেক উঁচু বেদীর উপর, নব-রত্ন রীতির সৌধ। চুড়াগুলি ‘বেহারি-রসুন’ রীতির। এক সময় মেদিনীপুর জেলায় এই রীতির বহু রাসমঞ্চ নির্মিত হয়েছিল।
টেরাকোটার মূর্তিবিন্যাস করে, সাজানো হয়েছিল মঞ্চটিকে। কার্ণিশগুলির নীচ বরাবর দুটি করে সারিতে, আটটি দ্বরপথের দু’দিকে দুটি খাড়া সারিতে ছোট ছোট খোপে এবং ভিত্তিবেদীর আট কোণে একটি করে পূর্ণাবয়ব মূর্তিবিন্যাস করে। তবে, কালের আঘাতে সেগুলির ভারি জীর্ণ দশা। এছাড়া, বারংবার রঙের পোঁচ পড়ে, অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে ফলকগুলি।
আটটি খিলানের মাথায় বড় প্রস্থে পঙ্খের উৎকৃষ্ট কারুকাজ করা হয়েছিল, তার চিহ্নও দেখা যায়।
সাক্ষাৎকারঃ সর্বশ্রী ফণীভূষণ ভট্ট, অজিত মহাপাত্র—রাউতমণি।
সমীক্ষাসঙ্গীঃ শ্রী সুব্রত দাস—দুজিপুর, খড়গপুর।
পথনির্দেশঃ খড়গপুর থেকে দক্ষিণে বেলদাগামী রাস্তায় বেনাপুর থেকে পূর্বমুখী পথে রাউতমণি যাওয়া যাবে।

- Advertisement -
Latest news
Related news