Tuesday, June 25, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা- ৫৬, আবদুল ওদুদ ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

চিন্তাবিদ
আবদুল ওদুদ
বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

‘ একদিনের খাওয়ায় যেমন অন্য দিনের চলতে চায় না, এক যুগের চিন্তায়ও তেমনি অন্য যুগের চলেনা।’ শিক্ষার সংকট শীর্ষক প্রবন্ধে এই মননশীল মূল্যায়ণ করেছেন যে প্রাবন্ধিক, তিনি কাজী আবদুল ওদুদ (২৬ এপ্রিল ১৮৯৪ — ১৯ মে ১৯৭০)।
বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী ওদুদ ছিলেন পেশায় অধ্যাপক, নেশায় লেখক এবং ভাবনায় চিন্তাবিদ। বাস্তবে তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি অগ্রগণ্য বাঙালী চিন্তক। ১৯২৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত “বুদ্ধির মুক্তি ” আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ ‘এর শীর্ষস্থানীয় সংগঠক ছিলেন ওদুদ। বেশ কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদনায় নিরলস ভূমিকা পালন করেছেন। ‘সংকল্প,’ ‘তরুণপত্র’ (নব পর্যায়) ‘অভিযান ‘ ও ‘শিখা’ পত্রিকা সম্পাদনা- প্রকাশনার সাথে প্রাণের যোগ ছিল তাঁর।
ওদুদ মামা বাড়িতে জন্মেছিলেন – তখনকার নদীয়া জেলায়; বর্তমানে তা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত। জগন্নাথপুরে। তবে বাবার জন্মভূমি ছিল ফরিদপুর জেলায়, পাংশা থানার বাগমারা গ্রামে। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১৭ সালে বি. এ. এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৯ সালে পলিটিক্যাল ইকনমিতে এম. এ. পাশ করেন। সেকালের রেওয়াজ মতো বি. এ. পাশের আগেই বিয়ে হয়ে যায় তাঁরও। ১৯১৬ সালে মামাতো বোন জামিলা খাতুনের সংগে ।

সাংসারিক খরচ খরচা চালানোর জন্য চাকরির দরকার হয় খুব। শুরুতে একটি মুসলিম সওদাগরি অফিসে কিছুদিন যাতায়াত করেন। ১৯২০ নাগাদ ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে যোগদান করেন বাংলার লেকচারার পদে। পলিটিক্যাল ইকনমির ডিগ্রি হলেও ততদিনে বাংলায় লেখালেখি সাড়া ফেলে দিয়েছে যে। স্বয়ং দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর প্রবন্ধ পড়ে মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত বাংলা অধ্যাপকের পদে তাঁকে যোগ দিতে আহ্বান করেন। ১৯৪০ সালে টেক্সটবুক বোর্ডের সেক্রেটারি রূপে কলকাতা এলেন এবং কিছুদিন পর দায়িত্ব নিলেন রেজিস্ট্রার অব পাবলিকেশনস এর। ঢাকা রাজশাহী থেকে কলকাতা নানা স্থানে নানা চাকরির শেষে ১৯৫১ সালের জুলাই মাসে অবসর গ্রহণ করেন।

শুদ্ধ জ্ঞান চর্চা নয়, নিবিড় সমাজ ভাবনায় আন্দোলিত মানুষটি সারা দেশে অসংখ্য বক্তৃতা দিয়েছেন। যা তাঁর মুক্ত চিন্তার বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে। ভাবিয়েছে আমাদের। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য — ।ক। ১৯৩৫ সালে’ হিন্দু মুসলমানের বিরোধ’ শীর্ষক নিজাম -বক্তৃতা বিশ্বভারতীতে যা রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে প্রদান করেন তিনবার। । খ। ১৯৫৬ সালে বিশ্বভারতীতে ‘বাংলা জাগরণ’ শীর্ষক ছয়টি বক্তৃতা। যার আহ্বায়ক ছিলেন প্রবোধ চন্দ্র বাগচী। ।গ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শরৎচন্দ্র ও তারপর’ শীর্ষক শরৎস্মৃতি বক্তৃতামালা (১৯৫৭)। ।ঘ। গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে প্রদত্ত বক্তৃতা –‘ Tagore’s Role in the Reconstruction of Indian thought’ (1961).

ঢাকার বাংলা একাডেমী প্রকাশিত ও আবদুল হক সম্পাদিত ‘কাজী আবদুল ওদুদ রচনাবলী’ (জুন ১৯৮৮) প্রদত্ত সূত্র অনুযায়ী তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা পঁচিশ। প্রবন্ধ গ্রন্থ বিশ এবং উপন্যাস গল্প নাটক মিলিয়ে পাঁচ। বিষয় বৈচিত্র্য অসাধারণ। রবীন্দ্রনাথ ,গ্যেটে, হজরত মোহাম্মদ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, পবিত্র কোরান, শাশ্বত বঙ্গ থেকে সমকালীন সমাজ ও সংস্কৃতিতে নিবিড় অনুধ্যান করেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ খেদোক্তি করেছিলেন — শক্তিমান মুসলমান লেখকেরা বাংলা সাহিত্যে মুসলমান জীবনযাত্রার বর্ণনা যথেষ্ট পরিমাণে করেননি , এ অভাব সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমস্ত সাহিত্যের অভাব। …… চাঁদের এক পৃষ্ঠে আলো পড়েনা সে আমাদের অগোচর, তেমনি দুর্দৈবক্রমে বাংলাদেশের আধখানায় সাহিত্যের আলো যদি না পড়ে তাহলে বাংলাদেশকে চিনতে পারব না, না পারলে তার সংগে ব্যবহারের ভুল ঘটতে পারে।(রবীন্দ্র প্রসঙ্গ/ আবুল ফজল)। প্রায় অর্ধশতাধিক মুসলমান লেখক- কবি-সাহিত্যিককে নানা ভাবে সংস্কৃতি চর্চায় অনুপ্রাণিত করেছেন, লালন করেছেন ওদুদ। শুধু চিঠিতেই অনেকের সাথে বৌদ্ধিক সাহচর্য্য রক্ষা করেছেন তিনি।

কথাশিল্পী হিসেবে বড় মাপের না হয়েও মুসলমান কৃষিজীবী প্রান্তিক মানুষজনের সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনের নিপুণ ছবি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন ওদুদ। তাঁর ‘নদী বক্ষে` উপন্যাস পড়ে বিশেষ আনন্দ লাভ করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, যা পত্র মারফত ওদুদকে জানিয়েছেনও। বাঙালী মুসলমান সমাজ ছিল তাঁর সাহিত্য সাধনার উপজীব্য। চিন্তানেতা রূপে বাংলার মুসলমান সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশের ইতিহাসে তাঁর সময়ে মধ্যমণি ছিলেন তিনি। পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির আলোকে কলকাতাকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় যে জাগৃতি সূচিত হয়,তা মুসলমান সমাজকে সেভাবে স্পর্শ করতে পারেনি। এক্ষেত্রে যারা মুসলিম সমাজের একাংশের প্রত্যাখানধর্মী- সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে দায়ী করেন, তা একদেশদর্শিতা। রামমোহন, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর প্রমুখ সংস্কারকগণ তাঁদের কর্মকাণ্ডে সম্প্রদায় নির্বিশেষে বিশুদ্ধ মানবতার আদর্শই তুলে ধরেছিলেন ।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পটভূমির পরিবর্তন সূচিত হয়। আবদুল লতিফ প্রতিষ্ঠিত ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি’ (১৮৬৩), এবং মীর মোশারফ হোসেনের সৃষ্টি সম্ভার বাংলার মুসলাম সমাজকে জাগরণের প্রভাত সংগীতে আন্দোলিত করে। সেদিনের সে জাগরণ ছিল দ্বিমুখী। একদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতিফলন —আধুনিকতার, অন্যদিকে ইসলামিক ঐতিহ্যবাদ। নানা সভা সমিতিতে আলোচনার নির্যাসে, পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত রচনাবলির অন্তরে সাজানো রয়েছে সেই টানাপড়েনের দীর্ঘ ইতিহাস।

কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখদের নেতৃত্বে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ কেন্দ্রিক ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন প্রথম দিশা দিল। আধুনিক গবেষকগণ প্রতিষ্ঠা করেছেন, বাংলার রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দুটি নিয়তি – বিন্দু ছিল। একটি মুসলিম লীগ (১৯০৬) পুনর্জাগরণপন্থী ইসলামিক ঐতিহ্যের ধারা, অন্যটি ১৯২৬ — ১৯৩৬ এর মধ্যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন। ১৯৪৭এ পূর্ব পাকিস্তানের জন্মে জয়ী হয় যে ধারা তার ভরকেন্দ্র ছিল আরব দুনিয়া। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত নিবিড় সাংস্কৃতিক অনুধ্যান বাঙালি মুসলমান সমাজকে তার ঘরে ফেরানোর ঠিকানা খুঁজে দেয়। যার ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ । এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামী সেনানীদের চেতনায় যে মুক্ত চিন্তার স্রোত প্রবাহিত হয় — তা নির্মাণের কাজে আত্মনিয়োগ করেন ওদুদ সহ অন্যান্য মনীষীগণ ।

বাংলার মুসলমান সমাজের জাগরণের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এবং কাজী আবদুল ওদুদের নাম একই সংগে উচ্চারণের যোগ্য। দুজনকেই সমাজ আস্ত কাফের বলে নানা সমালোচনায় বিদ্ধ করেছে। তবু অবিচলিত ছিলেন উভয়ে। সে দীর্ঘ প্রসঙ্গ ; ব্যাপ্ত আলোচনার দাবি করে।ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় অক্লান্ত ওদুদ — নির্ভীক নজরুলকে ১৯২৭ সালে ঢাকা শহরে এক অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেন। সেখানে নজরুল বলেন –” আজ আমি এই মজলিসে আমার আনন্দ বার্তা ঘোষণা করছি বহুকাল পরে কাল রাতে আমার ঘুম হয়েছে। আজ আমি দেখছি এখানে মুসলমানের নতুন অভিযান শুরু হয়েছে। আমি এই বার্তা চতুর্দিকে ঘোষণা করে বেড়াবো।” কথা রেখেছিলেন নজরুল। ‘মুসলমান সাহিত্য সমাজ’ এর মুখপত্র স্বরূপ ‘শিখা ‘পত্রিকার পাতায় ‘নূতনের গান’ কবিতাটি ছাপতে দিয়েছেন —
‘ ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত
আমরা আনিব রাঙা প্রভাত
আমরা টুটাব তিমির রাত
বাধার বিন্ধ্যাচল

  • নজরুলের প্রয়াণালেখ্য সর্বজনবিদিত। কিন্তু ওদুদের মহাপ্রয়াণের ইতিহাস ততটা প্রচলিত নয়। ১৯৪৭এ দেশ ভাগের পর আত্মীয়স্বজন অনুরাগীদের শত অনুরোধে ও আদর্শগত এবং রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশে কখনো যাননি উদার মানবতাবাদী এই মানুষটি। ১৯৭০এর ১৯ মে, মঙ্গলবার কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। স্ত্রীবিয়োগ পূর্বেই ( ১৯৫৫) ঘটেছিল। ছেলে মেয়েরা বিদেশে। ঢাকা থেকে তাঁর কন্যা জেবুন্নেসা উপস্থিত হয়েছিলেন আধ ঘন্টা পরে। গবেষক লিখেছেন “একদল ধর্মপ্রাণ লোক কলকাতার রাস্তায় তাকে দেরী করিয়ে দিয়েছিল কালীপূজার চাঁদার জন্যে।”
- Advertisement -
Latest news
Related news