Sunday, April 14, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৯৮।। হরিনাথ দে।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

বহু ভাষাবিদ
হরিনাথ দে বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

১৮৯৬। ল্যাটিন এবং ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অনার্সসহ প্রথম শ্রেণিতে বি. এ. পাশ করেন এক তরুণ বাঙালি। ঐ একই বছরে এম. এ পরীক্ষায় ল্যাটিন ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হলেন তিনি। ঘটনা পরম্পরায় ভ্যাটিকান সিটিতে পোপ দশম লিউসের মুখোমুখি হলেন মানুষটি। পোপকে অভিবাদন জানালেন চোস্ত লাতিন ভাষায়। তাঁর শুদ্ধ স্বর ক্ষেপনে মুগ্ধ হলেন পোপ। পরামর্শ দিলেন এবার ইতালি ভাষাটাও শিখে নিন। সাথে সাথে আলাপচারিতা শুরু ইতালি ভাষায়। তিনি অসামান্য ভাষাবিদ হরিনাথ দে (১২.০৮.১৮৭৭ — ৩০.০৮. ১৯১১)।

বাবা ছিলেন রায়বাহাদুর ভূতনাথ দে। বহু ভাষাবিদ ও সুপণ্ডিত। আইনজ্ঞ। কর্মস্থল ছিল রায়পুর। মা এলোকেশীও ছিলেন যথার্থ ভাষা অনুরাগিনী। মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও আগ্রহের সংগে শিখেছিলেন হিন্দি, মারাঠী এবং অবশ্যই ইংরেজি। ফলে তাঁর নিখাদ ভাষাপ্রেম ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্রের সম্পর্কে প্রচলিত তথ্য হলো – তিনি বাবার সাথে কলকাতা যাওয়ার পথে মাইল ফলকের ক্রম অনুসরণ করে ইংরেজি সংখ্যা পড়তে শিখে ফেলেছিলেন। হরিনাথ দে’র কৃতিত্ব আরো অভিনব এবং বিস্ময়কর! রান্নাঘরে মা এলোকেশী একদিন আনাজের খোসাগুলো দিয়ে অক্ষর সাজিয়ে ছেলেকে উচ্চারণ বলে যান, ব্যাস্! তাতেই কেল্লা ফতে। চেনা হয়ে যায় বাংলা বর্ণমালা।

অনন্য মেধা ও অনুকরণীয় পরিশ্রমের ফসল হরিনাথের ভাষাসিদ্ধি লাভ। মাত্র চৌত্রিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে সর্বমোট ১৪ টি ভাষায় তিনি এম. এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। রপ্ত করেন ২০টি ইউরোপীয় ভাষা এবং ১৪টি ভারতীয় ভাষা। শুধু তাই নয়, এই ভাষা গুলির বিবর্তনের ইতিহাস, প্রাচীন রূপ এবং আধুনিক রূপান্তর ছিল তাঁর অধীত অধ্যায়। প্রতিটি ভাষার ব্যুৎপত্তি থেকে প্রয়োগশৈলী আয়ত্ত করেই তিনি ক্ষান্ত হননি। প্রতিটি ভাষার প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য পাঠ করেছেন। এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় ভাবানুবাদ করেছেন। সেই সেকালে ভাষা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিশ্বায়ন ঘটিয়েছেন আপন বৈদগ্ধ্যে। অচলায়তন ভেঙে ভাষা ও সাহিত্য চর্চার জগতে মুক্তধারা প্রবাহিত করেছেন অদম্য উৎসাহে।

মায়ের কাছে প্রাথমিক পাঠের পরে রায়পুরে সরকারি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। চলে আসেন কলকাতায়। ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। সেখান থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজ হয়ে কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ে। এবার সরকারি বৃত্তি নিয়ে বিলেত যাত্রা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন। এরই ফাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট ছাত্র হিসেবে গ্রিক ভাষা ও সাহিত্যে এম. এ. পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করেন ।

ইউরোপে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও প্যারিসের সরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানীর মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা চর্চার নানা দিগন্তে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেন হরিনাথ দে। গ্রিক, ল্যাটিন, হিব্রু, ইংরেজি, আরবি ভাষা চর্চার সাথে সাথে তার লোকায়ত উপভাষা বিভাষা গাথা কথিকার সন্ধানে ঘুরে বেরিয়েছেন ফ্রান্স, জার্মানী, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল প্রভৃতি দেশের গ্রাম-শহরে। নগরে। রুশ, চীনা, জাপানি ভাষাও আয়ত্ত করেছেন।

এশীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম মাত্র ২২ বছর বয়সে ভারতীয় শিক্ষা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপত্র পান। যোগ দেন ঢাকা সরকারি কলেজে। চার বছর পর ১৯০৫এ চলে আসেন কলকাতায়। যোগ দেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। পরের বছর আবার ইউরোপ যাত্রা। ইউরোপের প্রাচ্যতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ভাষাবেত্তাগণের সংস্পর্শে আসেন। বিভিন্ন স্বনামখ্যাত প্রতিষ্ঠানে ভারততত্ত্ব বিষয়ক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। সমসময়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন।

কিছুদিন প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার পর হুগলী কলেজের অধ্যক্ষ পদে আসীন হন। ১৯০৭ সালে অধ্যাপনার ব্রত থেকে সরে এসে যোগ দেন ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক পদে। বর্তমানে যা ন্যাশানাল লাইব্রেরি। এক্ষেত্রেও প্রথম বাঙালি, হরিনাথ দে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ের স্নাতকোত্তর বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, ভালোবেসে। সিলেবাস রচনার রূপরেখা থেকে প্রশ্নপত্র প্রস্তুতির কাজে যুক্ত থেকেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড থেকে জানা যায়, গ্রিক, লাটিন, জার্মান, ফরাসি , হিব্রু, আর্মেনিয়া, বৈদিক সংস্কৃত, সংস্কৃত, পালি, আরবি, ফারসি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে পরামর্শ দাতা ছিলেন তিনি।

অসামান্য দূরদর্শিতার সাথে ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরির আধুনিকীকরণ ঘটিয়েছিলেন হরিনাথ দে। প্রাচীন ও দুষ্প্রাপ্য পুঁথি, নথি, পুস্তক সম্ভার ক্রয় করেছেন, সংগ্রহ করেছেন, আধুনিক পদ্ধতিতে সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছেন। তাই বলে সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থরাজির প্রতি উদাসীন থাকেননি, তাও ক্রয় ও সংগ্রহ করেছেন সযত্নে। তিনিই প্রথম গ্রন্থাগারের জন্য বিষয়ানুগ সুবিন্যস্ত সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। গবেষক ও পাঠকদের জন্য অবাধ জ্ঞান চর্চার পরিসর উন্মুক্ত করেছিলেন।

তাঁর মেধাবৃত্তির উজ্জ্বল প্রকাশ পরিলক্ষিত হয় — তাঁর সৃষ্টি সম্ভারে। গবেষণামূলক প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত বিপুল রচনা ভাণ্ডার, বিচিত্র বিষয়ে সম্পাদিত গ্রন্থ, অভিধান রচনা এক জীবনে এত কাজ করে ওঠা — প্রায় অসম্ভব ও দুরূহ ভাবা যেত, যদি না তিনি এসব রূপায়ণের নজির সৃষ্টি করতেন। কখনো বৌদ্ধদর্শন সম্পাদনা করেছেন। কখনো চীনা ভাষা থেকে নাগার্জুনের লজিক ইংরেজিতে তরজমা করেছেন। কখনো বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণকান্তের উইল ফরাসিতে অনুবাদ করেছেন। কখনো অভিজ্ঞান শকুন্তলমের কাব্যানুবাদ করেছেন ইংরেজিতে। ইবন বতুতার বঙ্গদেশ ভ্রমণ , মহম্মদ হাফিজ কৃত সুলতান গিয়াসুদ্দিনের আরবি ও ফারসি পুঁথির অনুবাদ করেছেন। আরবি ভাষায় তাম্র শাসন অনুবাদ করেছেন। লর্ড কার্জনকে আরবি ও পার্সি থেকে অনুবাদ করে একটি বই উপহার দেন হরিনাথ। কার্জন মলাট উলটে দেখেন উৎসর্গ পত্র লাতিন ভাষায় রচিত। তিনি ঢাকা সফরকালে হরিনাথ দে’কে আমন্ত্রণ জানান এবং সাক্ষাৎ করে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন।

বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরবার লক্ষ্যে বিদ্যাপতির পদাবলী , গিরিশচন্দ্রের সিরাজদৌল্লা নাটক, অমৃতলাল বসুর বাবু ও রাজাবাহাদুর ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ছাত্র স্বার্থে মেকলের ‘এসে অন মিল্টন’ এবং ‘প্যালগ্রেভস গোল্ডেন ট্রেজারি’ চতুর্থ খণ্ড বই দুটির সটীক সম্পাদনা করেন শ্রী দে। স্বভাবতই ১৯০১ সালে রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি অব গ্রেট ব্রিটেন এন্ড আয়ারল্যান্ড-এর এবং ১৯০৩ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন। কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউটের সাম্মানিক সদস্য (১৯০৫) , জার্মান ওরিয়েন্টাল সোসাইটির সদস্য (১৯০৬) এবং কলকাতার হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির কাউন্সিল সদস্য (১৯০৭) নির্বাচিত হন তিনি।

দুষ্প্রাপ্য বই সংগ্রহ ছিল তাঁর নেশা। পার্সিতে সুপণ্ডিত স্যার যদুনাথ সরকার এবং ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের গবেষণা কর্মে তাঁর ভূমিকা ইতিহাস হয়ে আছে। আক্ষেপের বিষয় অকালে চলে যেতে হয় তাঁকে। টাইফয়েডে সংজ্ঞাহীন ছিলেন তিন চারদিন। প্রখ্যাত চিকিৎসক নীলরতন সরকার, ডা.হরিনাথ ঘোষ, ডা. প্রাণধন বসুরা এই মানুষটির সংজ্ঞা ফেরাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।

বাগদাদের সেকেন্দ্রিয়া গবেষণাগার আগুনের লেলিহান শিখায় ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফলে মানবসম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়। তাঁর প্রয়াণে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত আক্ষেপ ভরা শোকলিপি রচনা করেন —

” যাচ্ছে পুড়ে দেশের গর্ব
শ্মশান শুধুই হচ্ছে আলা,
যাচ্ছে পুড়ে নতুন করে
সেকেন্দ্রিয়ার গ্রন্থশালা!”

- Advertisement -
Latest news
Related news