Saturday, April 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৯৩ ।। যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

দেশপ্রিয়
যতীন্দ্রমোহন বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

বাবা ছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের নেতা। তিনিও ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীনতা আন্দোলনে। বীরপ্রসূ চট্টগ্রামের মানুষ তাঁকে আদর করে বলতেন — মুকুটহীন রাজা। কলকাতা কর্পোরেশনের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা বেশি দিন মেয়র ছিলেন তিনি। পাঁচবার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত (২১.০২.১৮৮৫ — ২৩.০৭. ১৯৩৩)।
জেদি, অসমসাহসী ,লড়াকু এই মানুষটি জন্মেছিলেন চট্টগ্রামের রহমত গঞ্জে। তখনকার অবিভক্ত বাংলার চন্দমাইশ উপজেলার বরমা গ্রামে। বাবা — যাত্রামোহন, মা — বিনোদিনী দেবী। ১৯০২ সালে কলকাতায় হেয়ার স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাশ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।তাঁর সহপাঠী ছিলেন ডক্টর রাজেন্দ্র প্রসাদ। ১৯০৮ এ কেমব্রিজ থেকে বি. এ. পাশ করেন। ১৯০৯ সালে আইনের ডিগ্রি অর্জন করেন। এখানে থাকতেই প্রথম আলাপ জওহরলালের সাথে।
ইংল্যান্ডে কাটানোর সময়ই তাঁর প্রতিভা, বুদ্ধিমত্তা ও সাংগঠনিক শক্তির বিকাশ লক্ষ করা যায়। টেমস এর বুকে নৌকা চালনা, টেনিস ও ক্রিকেটে দল বেঁধে মেতে থাকার সাথে সাথে ভারতীয় বন্ধুদের ঐক্যবদ্ধ করবার ব্রতে নিরলস ছিলেন যতীন্দ্রমোহন। আড্ডার আড়ালে গড়ে তোলেন -‘ ইন্ডিয়ান মজলিশ’ যা আসলে পরাধীন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে ব্রিটিশ রাজধানীতে দাবি দাওয়া আদায়ে মঞ্চের প্রয়োজনে গড়ে তোলেন ‘ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট সোসাইটি’। এখানে ব্রিটিশ বন্ধুরাও সদস্য হন। তিনি ছিলেন এই সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এখানে সহযোদ্ধা হিসেবে পান ব্রতচারী আন্দোলনের হোতা গুরু সদয় দত্তকে।
এই সময় বাবার অমতে বিয়ে করেন নেলী গ্রে নামের ব্রিটিশ তরুণীকে। পরে এই দেশে এসে ১৯২১ সালে যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। কংগ্রেসের শীর্ষ পদে কাজ করেছেন এই বিখ্যাত মহিলা — নেলী সেনগুপ্তা। স্বামীর যোগ্য সহকর্মিনী ছিলেন তিনি।

১৯১০ সাল নাগাদ দেশে ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন।প্রথমদিকে পসার না হওয়ায় অর্থাভাবে শুরু করেন আইনের অধ্যাপনা। রিপন কলেজে তখন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সহকর্মী হিসেবে পান। যাঁর নামে রিপন কলেজ সুরেন্দ্রনাথ কলেজে রূপান্তরিত হয়। পরে ব্যারিস্টার হিসেবে বাংলায় তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে যায়। অধ্যাপনা ছাড়তে হয় সময়ের অভাবে।

১৯১১ সালে দেশবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেন যতীন্দ্রমোহন। কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক হয়ে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার ফলে কারারুদ্ধ হন। চিত্তরঞ্জন দাশের ‘ফরোয়ার্ড’ পত্রিকার সক্রিয় কর্মী ও সংগঠক ছিলেন তিনি। নিজে সম্পাদনা করেছেন ‘অ্যাডভান্স’ নামে একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা।

মহাত্মা গান্ধী জাতীয় আন্দোলনের নির্ণায়ক হওয়ার পর ওকালতি ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন যতীন্দ্রমোহন। বর্মা অয়েল কম্পানি ও আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ধর্মঘট পরিচালনার নেতৃত্ব দেন। ভারতবর্ষের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে সেকালের সর্ববৃহৎ ও সর্বাত্মক এই আন্দোলন ব্রিটিশ রাজশক্তি ভালো চোখে দেখেনি। ধর্মঘটকারী শ্রমিক পরিবারগুলির পাশে দাঁড়াতে চল্লিশ হাজার টাকা ঋণ প্রদান করেন তিনি। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে সস্ত্রীক কারারুদ্ধ হন এই বিপ্লবী দম্পতি।

১৯২২-২৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। চিত্তরঞ্জনের স্বরাজ পার্টি গঠন প্রক্রিয়ায় পাশে দাঁড়ান। পরে দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর কংগ্রেসে ফিরে যান। নানা সামাজিক কর্ম কাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়তেন সব সময়। ১৯২৬ সালে কলকাতার দাঙ্গা, ১৯৩১ সালে চট্টগ্রামে ভয়ংকর বন্যা, চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক হানাহানি — প্রতিটি ক্ষেত্রেই ত্রাণকার্য তদারকিতে নিয়োজিত থেকেছেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন।

অগ্নিযুগের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন, অনন্ত সিংহ, অম্বিকা চক্রবর্তীদের হয়ে সওয়াল করতে ওকালতনামা নিয়ে হাজির হন যতীন্দ্রমোহন। যুক্তিজালে পরাস্ত করে বহু বিপ্লবীকে ফাঁসির দড়ি থেকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। ১৯২৩ এ দ্বিতীয় আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় সাতজন বিপ্লবীকে অভিযোগমুক্ত করেন এই মানুষটি। নাগরখানা খণ্ডযুদ্ধ ও সরকারী টাকা লুঠের মামলা এ ক্ষেত্রে স্মরণীয়। আর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হল পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রফুল্ল রায় হত্যা মামলায় বিপ্লবী প্রেমানন্দ দত্তকে নির্দোষ সাব্যস্ত করতে তিনি সক্ষম হন।

নিজের বাসভবনটি কংগ্রেসের পার্টি অফিসে কার্যতঃ পরিণত হয়। এখানে কখনো ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ বিপ্লবীরা আত্মগোপন করে নিশ্চিন্তে থেকেছেন। কখনো গোপন শলা পরামর্শে অংশ নিয়েছেন। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ণীত হয় যতীন্দ্রমোহনের চট্টগ্রামের বাড়িতে। বিভিন্ন সময়ে এই বাড়িতে রাত্রিবাস করেছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎ চন্দ্র বসু, মোহাম্মদ আলী, শওকত আলী প্রমুখ নেতৃত্ব।

জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি ত্যাগ করলেন। দ্বিধাগ্রস্ত কংগ্রেস নেতৃত্ব যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় তখন আপসহীন বাগ্মী যতীন্দ্রমোহন প্রকাশ্যে এই নৃশংস হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করে আগুন ঝরা ভাষণ দিয়ে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেন। পরিণাম মেলে হাতে হাতে। পুনরায় গ্রেপ্তার হন। মুক্তি লাভের পর ইংল্যান্ডে যাত্রা করেন। ব্রিটিশ রাজকর্মচারীরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

কিন্তু দেশপ্রেম যাঁর রক্তে তুফান তুলেছে, বিলেতে গিয়ে কি তিনি হাত পা গুটিয়ে বিশ্রাম নিতে পারেন ? লন্ডনে ছবি ও নথিপত্রসহ চট্টগ্রামে পুলিশি অত্যাচার ও সন্ত্রাসের প্রতিবাদ শুরু করেন। এর ফলে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার নেলসন সাহেবকে অপসারিত করে সরকার। এই ঘটনার অভিঘাতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ক্রেগ অবসর নিতে বাধ্য হন। হান্টার সাহেব বিলেতে পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করেন। পুলিশ সুপার স্যুটার আত্মহত্যা করেন। বিষয়টি নিয়ে ইংল্যান্ডে তীব্র শোরগোল পড়ে যায়।

গোলটেবিল বৈঠকে গান্ধিজীর সাথে তিনিও অংশ নেন। কমিশনার টেগার্ট তখন বিলাতে ছিলেন। তিনি প্রাথমিক ভাবে যতীন্দ্রমোহনের কার্যকলাপে কিছুটা আবিষ্ট হলেও পরে সুনির্দিষ্টভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে নানা গুরুতর অভিযোগ পেশ করেন। যতীন্দ্রমোহন কে (গান্ধিজীর সাথে বিলেতে থাকলেও) আসলে সহিংস স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সক্রিয় মদতদাতা হিসেবে পরিগণিত করেন। ফলস্বরূপ দেশে ফিরে যাওয়ার সময় ১৯৩২ সালে জাহাজেই গ্রেপ্তার হন তিনি।
রাজনীতি এবং ওকালতি ছাড়াও সংস্কৃতিপ্রেমি মানুষটি সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। রচনা করেছেন –গৌরী, দুর্ব্বাদল, অশ্রুময়, বিল্বদল গ্রন্থ। তাঁর রচিত নন্দনপাহাড় নামক উপন্যাস এবং বিদ্যাপতি নাটক সেকালে জনপ্রিয় হয়েছিল।

শেষজীবনে কারাগারের অন্ধকারে প্রায় বিনা চিকিৎসায় চলে যেতে হয়েছে তাঁকে। প্রথমে যারবেদা জেলে অবরুদ্ধ হন তিনি। সেখান থেকে চালান করা হয় দার্জিলিং এ। শুরু হয় অন্তরীণ জীবন। অসুস্থতা বাড়লেও ব্রিটিশদের অবহেলায় ক্রমাগত স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে তাঁর। এবার স্থানান্তরিত হন রাঁচিতে। এখানেই জীবনদীপ নির্বাপিত হয় ডাকসাইটে কংগ্রেসনেতার ।
জাতির জনক মহাত্মাগান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তাঁর ‘ইয়ংবেঙ্গল’ পত্রিকায় তরুণ নেতা যতীন্দ্রমোহনের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। দেশবন্ধু র প্রয়াণের পর সুভাষচন্দ্রকে কোণঠাসা করতে তাঁর কপালে পরিয়ে দেন একসাথে তিনটি মুকুট। বঙ্গীয় প্রাদেশিক সভাপতি, স্বরাজ পার্টির সভাপতি এবং কলকাতা করপোরেশনের মেয়রের পদ। তবে তাঁর রোগভোগে অকাল মৃত্যুর পর মহাত্মা গান্ধীর প্রতিক্রিয়া কী ছিল তা আজ সাধারণ ইতিহাস গ্রন্থে খুঁজে পাওয়া যায় না । ★

- Advertisement -
Latest news
Related news