Sunday, April 14, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা- ৯০।। রাসবিহারী বসু।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

ক্রান্তিবীর
রাসবিহারী বসু বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

“ভারতবর্ষ! কার প্রতীক্ষা করো
কান পেতে কার শুনছ পদধ্বনি?”
সুকান্ত

বেলেঘাটায় নাকা চেকিং চলছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমসময়ে। এক দুর্ধর্ষ বিপ্লবী এই এলাকায় এসেছেন, পাকা খবর আছে। স্বয়ং পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট অপারেশনের দায়িত্বে। চিরুনি তল্লাশি করেও সন্দেহজনক কাউকে পাওয়া গেলনা। শুধু এক বৃদ্ধ আ্যংলো-ইন্ডিয়ান করুণ সুরে বেহালা বাজাচ্ছিলেন। চোখ বন্ধ করে বুঁদ হয়ে। টেগার্টের মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন তাঁকে ব্যঙ্গ করছেন। দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। চলে গেলেন।
পরে টেগার্ট লিখেছেন — “….Expart in make up. Rashbehari Bose could dress up himself either as a Punjabi or as an old Maharastrian in such a perfect manner that it was impossible to suspect him as one him disguise. He would have been a great stage actor instead of a revolutionary if he so desired.” রাসবিহারী বসু আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য ক্রান্তিবীর (২৫.০৫.১৮৮৬ — ২১.০১.১৯৪৫)। তাঁর অনুপম চরিত্রের আলোয় শরৎচন্দ্র রচনা করেন কালজয়ী উপন্যাস পথের দাবী (১৯২৬)।

রাসবিহারীর কর্মমুখর জীবন যেকোনো রোমাঞ্চকর থ্রিলারকে হার মানায়। পুলিশের চোখে ধুলো দিতে ওস্তাদ ছিলেন তিনি। যেমন তুখোড় ছদ্মবেশ ধারণ করতে, তেমনি ক্ষিপ্রগতিতে আত্মগোপন করতে পারতেন। ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে তাঁর নানা ছদ্মনাম প্রচলিত। ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা অনেকেই তাঁর আসল নামের হদিশ পাননি। পাঞ্জাবে তিনি দরবারা সিং। উত্তরপ্রদেশে সতীশচন্দ্র।
সৃজনশীল ও মেধাবী মানুষটি মাতৃভাষা ছাড়াও হিন্দি, গুরুমুখি, মারাঠি, গুজরাটি, উর্দু ভাষায় চোস্ত ছিলেন। জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় জাপানে কাটিয়েছেন। শিখে ফেলেছেন কঠিনতর জাপানী ভাষা। এই ভাষায় পাঁচখানি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর গুণমুগ্ধ জাপান সরকার ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে বিরল সম্মানে ভূষিত করেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক খেতাব — ‘সেকেন্ড অর্ডার অব দি মেরিট অব দি রাইজিং সান।’

বর্তমান পূর্ব বর্ধমানের সুবলদহ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন রাসবিহারী। বাবা বিনোদ বিহারী বসু, মা -ভুবনেশ্বরী দেবী। যে গ্রাম্য পাঠশালায় জীবনের প্রথম পাঠ নিয়েছেন, বর্তমানে তা রাসবিহারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। গ্রামের সবার নয়নের মণি ছিলেন তিনি। শিক্ষকদের কাছে জাতীয়তাবাদী গল্প শুনতেন। আখড়ায় গিয়ে লাঠি খেলতেন, ঐ কৈশোরেই। ডাংগুলি ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। প্রথমে মর্টন স্কুল এবং পরে ডুপ্লে কলেজে পড়াশুনা করেন রাসবিহারী।
চন্দন নগরে থাকার সময়ে প্রখ্যাত বিপ্লবী চারু রায়ের সংস্পর্শে আসেন তিনি। দীক্ষিত হন অগ্নিমন্ত্রে। এমন সময় তাঁর বাবা চন্দন নগর থেকে সুদূর হিমাচল প্রদেশের সিমলায় বদলি হয়ে যান। ফলে অধ্যাপক চারু রায় ছাড়াও এই সময়ে বিপ্লবী ব্ন্ধু কানাই দত্ত ,শ্রীশ্র ঘোষ, মতিলাল রায়েদের ছেড়ে যেতে হয় তাঁকে। পরে ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিতে মাঝে মাঝে জন্মভূমিতে এসে আত্মগোপন করতেন।

আলিপুর বোমা বিস্ফোরণ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তাঁর লেখা দুটো চিঠি পুলিশের হাতে আসে। ১৯০৮ সালে তিনি প্রথম গ্রেপ্তার হন। তবে প্রমাণ না থাকায় মুক্তি পান তিনি। তবে সারাটা সময় পুলিশের নজরদারি অসহ্য লাগছিল। চলে গেলেন দেরাদুনে। প্রথম চাকরি ছেড়ে দ্বিতীয় বার ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে হেড ক্লার্কের পদে যোগ দেন। এখানে পল্টন বাজারের কাছে ঘোষি গলিতে থেকেই গড়ে তোলেন দেশব্যাপী আন্দোলনের চমকপ্রদ নেটওয়ার্ক।
ক্ষুরধার মস্তিষ্ক ছিল তাঁর। অচিরেই আলাপ ঘটে বাংলা, উত্তরপ্রদেশ ও পাঞ্জাবের বীর বিপ্লবীদের সংগে। কত সব নক্ষত্রের নাম। আমীরচাঁদ, দীননাথ চট্টোপাধ্যায়, অবোধবিহারী, বালমুকুন্দ, হরদয়াল, কর্তার সিং, হররাম সিং,বিষ্ণু গণেশ পিংলে ,শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ,নরেন ভট্টাচার্য। যুগান্তর গোষ্ঠীর অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সম্পর্ক রচিত হয় বীর বিপ্লবী বাঘা যতীনের সাথে ।
১৯১২ সালে কলকাতা থেকে দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। ২৩ ডিসেম্বর জমকালো শোভাযাত্রার মাধ্যমে তখনকার ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জকে স্বাগত জানানোর আয়োজন করা হয়। রাসবিহারীর নির্দেশে চাঁদনি চকের এক বাড়ি থেকে স্ত্রীলোকের ছদ্মবেশে ১৬ বছরের কিশোর বসন্ত বিশ্বাস হাতিতে বসে থাকা হার্ডিঞ্জকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করে। ভাইসরয় আহত হন। বিস্ফোরণের পর দেরাদুনে চলে যান রাসবিহারী। স্বাভাবিক ভাবে অফিস করেন এবং হার্ডিঞ্জ এর উপর আক্রমণের ঘৃণ্য চক্রান্তের প্রতিবাদে দেরাদুনে পথ সভা করেন। পুলিশ লক্ষ টাকা ইনাম ঘোষণা করেও তাঁর টিকির হদিশ পায়নি।

১৯১৩ সালে তাঁর পরিকল্পনা মতো লাহোরের পুলিশ ক্লাবে ‘বিষিন দাস’ নামক শ্রমিকের ছদ্মবেশে বোমা নিক্ষেপ করেন বসন্ত দাস। এবারের লক্ষ্য ছিল পাঞ্জাবের এসিস্টেন্ট পুলিশ কমিশনার গর্ডন। এই হামলায় গর্ডন প্রাণে বেঁচে যান। মৃত্যু হয় এক নিরীহ চাপরাশির। জুলাই মাসে দামোদর নদের বন্যায় বর্ধমান বানভাসী হয়। তখন তিনি গ্রামে গিয়ে ত্রাণ সংগ্রহ ও বিলি বণ্টনে আত্ম নিয়োগ করেন। সংগে ছিলেন বাঘা যতীন। এই সময়েই আন্দোলনের রূপরেখা প্রস্তুত করেন দুজনে। গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে বিপ্লবীরা যতীনকে তাঁদের মিলিত ফ্রন্টের সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করেন।

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। জার্মানিতে ভারতীয় ছাত্ররা স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রচারে গড়ে তোলেন ‘বার্লিন কমিটি’। তখন রাসবিহারী বসু কাশীতে। যতীনের সাহায্যে গদর কর্মীদের সংগে যোগাযোগ হয় তাঁর। ভারতে বিপ্লবের জন্য অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থের যোগান দেবেন খোদ কাইজার, জানতে পারেন তিনি। বিশাল পরিকল্পনা রচিত হয়। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করা হবে। ২০ হাজার সৈন্য সরাসরি অংশ নেবে সশস্ত্র বিপ্লবে। দেশ বিদেশ থেকে বিপ্লবী গদর পার্টির হাজার হাজার সৈন্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। সংগৃহীত ও মজুত করা হয় বিপুল গোলা বারুদ।

রাসবিহারী বসু বেনারস সমিতি পুনর্গঠন করেন। লাহোর থেকে কলকাতা পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে জাতীয় অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি কর্মে আত্মনিয়োগ করেন। শেষ লগ্নে রামশরণ দাসের বিশ্বাসঘাতকতায় খবর ফাঁস হয়ে যায়। ফিরোজপুরের যুদ্ধে ৫০ জন শহিদ হন। লাহোরে ডায়ারের নেতৃত্বে প্রতিটি বাড়ি তল্লাশি করা হয়। চারটি প্রধান দপ্তর থেকে ১৩ জন আটক হন। এবারও পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে উধাও হন পিংলে ও রাসবিহারী বসু।
লাহোর ষড়যন্ত্রের ব্যাপকতা দেখে ব্রিটিশ বাহিনী মরিয়া হয়ে তাঁর সন্ধান শুরু করে। মাথার দাম ঘোষিত হয় এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকা। অভাবনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি। ১৯১৫ সালের ১ মে খিদিরপুর বন্দর থেকে ‘সনুকি-মারু’ জাহাজে চেপে জাপান যাত্রা করেন। পাসপোর্টের ব্যবস্থা করেন সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের সেক্রেটারি ‘প্রিয়নাথ ঠাকুর’ ছদ্মবেশে জাপান যাত্রা করেন তিনি। এবারের পাকা খবর পেয়ে জাহাজে তল্লাশি করেন টেগার্ট সাহেব। কিন্তু প্রিয়নাথ তখন প্রথম শ্রেণির কেবিনে বসে খোশমেজাজে সিগারেট সেবনে ব্যস্ত ছিলেন। তাকে ঘাঁটাতে সাহস পাননি টেগার্ট!

জীবনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় রাসবিহারীর। তরুণ চীনা নেতা সান ইয়াৎ সেনের সাথে আলাপ হয়। টোকিয়োতে সভায় মিলিত হন লালা লাজপত রায়ের সংগে। ব্রিটিশ সরকারের চাপে জাপান তাঁকে নির্বাসনের আদেশ দেয়। প্রভাবশালী নেতা মিত্সুরু তোয়ামার প্রশ্রয়ে টোকিয়োর বাণিজ্য অঞ্চল শিনজুকুতে একটি বেকারির বেসমেন্টে আত্মগোপন করেন তিনি।
১৯১৮ সালের ৯ জুলাই এই নাকামুরায়া বেকারির মালিকের মেয়ে তোশিকো সোমাকে বিয়ে করেন তিনি। পরে নির্বাসন উঠে যায়। ১৯২৩ সালে জাপানের নাগরিকত্ব লাভ করেন। সাংবাদিক ও লেখক পরিচয় নিয়ে নতুন উদ্যোগে কাজ শুরু করেন। তীব্র ভূমিকম্পে যথা সর্বস্ব শেষ হয়ে যায় তাঁর। রবীন্দ্রনাথ আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ১৯২৪ সালে জাপানে এসে বিশ্বকবি এই বাড়িতে রাসবিহারীর সাথে দেখা করে যান।

১৯৪২ সালের ২৮-২৯ মার্চ টোকিয়োতে তাঁর আহ্বানে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একটি সেনাবাহিনী গঠনে উদ্যোগী হন তিনি। ২২ জুন এই লিগের দ্বিতীয় সম্মেলনে সুভাষচন্দ্র বসুকে লিগে যোগদান ও সভাপতির পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেন তিনি। নিজের হাতে গড়া আজাদ হিন্দ ফৌজ এর সর্বাধিনায়ক পদে অভিষিক্ত করেন সুভাষচন্দ্রকে।এভাবেই শুরু হয় ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বাপেক্ষা বর্ণময় ও গৌরবময় মহা অধ্যায়ের ।

- Advertisement -
Latest news
Related news