Sunday, April 14, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৮৭ ।। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ
বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

যখন বিলেতে পড়তে গেলেন, জাহাজে তুলে দিতে জাহাজ ঘাটায় পিতার সঙ্গে এসেছিলেন পিতৃবন্ধু মাইকেল মধুসূদন দত্ত। যখন পড়ে দেশে ফিরলেন – ( বোম্বেতে জাহাজ থেকে নেমে রেলপথে হাওড়া এসেছিলেন ) স্বাগত জানাতে হাজির সেকালের অন্যতম দিকপাল কেশবচন্দ্র সেন। তিনি ডেভিড হেয়ারের চোখের মণি
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১০.১১.১৮৪৮ — ০৬.০৮.১৯২৫)।

শুধু তাঁর সমকালের নন, ভারতবর্ষের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাগ্মীদের একজন ছিলেন তিনি। ভারতবাসী সম্ভ্রমের সাথে তাঁর নামের পাশে যোগ করেছেন মুকুটহীন রাজা উপাধি। তাঁর অন্য এক নাম রাষ্ট্রগুরু। কোনো কোনো গবেষক তাঁর নামের আগে ‘স্যারেন্ডার নট্’ শব্দবন্ধ বসানোর যুক্তিতে অটল।

পিতা দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক। বাবার সযত্ন প্রয়াসে তাঁর ছাত্রাবস্থায় শিক্ষার ভিত মজবুত হয়ে ওঠে।
প্যারেন্টাল অ্যাক্যাডেমিক ইনস্টিটিউশনস এবং পরবর্তীকালে হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ পাস করেন। ইংল্যান্ডে যান আই সি এস হতে। বয়স সংক্রান্ত জটিলতায় ১৮৬৯ সালে পাশ করলেও স্বীকৃতি পেতে কেটে যায় দু’দুটো বছর। আদালতের শরণাপন্ন হন সুরেন্দ্রনাথ। তারপর নিষ্পত্তি ঘটে।

১৮৭১ সালে দেশে ফিরে সিলেটের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদে যোগদান করেন, কিন্তু ষড়যন্ত্রের কারণে কাজে অনীহার অভিযোগে তাঁকে বরখাস্ত করে গোরা শাসকের দল। বর্ণ বৈষম্যের প্রতিবাদ করে গর্জে ওঠেন তিনি। ইংল্যান্ডে গিয়ে ফের মামলা লড়েন কিন্তু এবার মামলার রায় তাঁর বিরুদ্ধে যায়। ১৮৭৫ এর জুন মাসে ফিরে এলেন দেশে। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁকে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে ইংরেজির অধ্যাপনায় জুড়ে দিলেন। ২০০ টাকা মাস মাইনে। ১৯১২ সাল পর্যন্ত টানা শিক্ষকতা করেছেন তিনি। ফ্রি চার্চ কলেজ এবং পরে রিপন কলেজে। এই রিপন কলেজেরই পূর্ব নাম ছিল প্রেসিডেন্সি ইনস্টিটিউশন। যা শিক্ষক থাকবার সময় তাঁরই উদ্যোগে রিপন কলেজে রূপান্তরিত হয়। যার বর্তমান নাম সুরেন্দ্রনাথ কলেজ।

তাঁকে বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে রামমোহন রায়ের যোগ্য উত্তর সাধক বলা হয়। বলা হয় সামুদ্রিক ঝড়ের পাখি। সমাজ-ধর্ম বিষয়ক পুনর্জাগরণের যে বিশাল কর্ম যজ্ঞের সূচনা রামমোহনের হাতে: তাকে অনেকখানি গতি দিয়েছেন সুরেন্দ্রনাথ। শুধু তাই নয় তিনি অনুভব করেছেন রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রসার না ঘটাতে পারলে শিক্ষা সংস্কৃতি ধর্ম ও অর্থনীতির মূলভিত্তির পরিবর্তন সম্ভব নয়। বার্ক, মাৎসিনির দর্শন নিয়ে গভীর পড়াশুনা ছিল তাঁর। তিনিই প্রথম সামাজিক সংস্কার আন্দোলনকে রাজনৈতিক নবজাগরণের আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে সচেষ্ট হন।
দ্বিতীয় দফায় দেশে ফিরবার পর যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় শিক্ষিত ছাত্র-যুবদের মধ্যে তা অকল্পনীয়। হাজার হাজার ছাত্র মগ্ন বিস্ময়ে তাঁর বক্তৃতা শুনতেন। প্রিয় বিষয় ছিল বক্তৃতার — ভারতীয় ঐক্য, মাৎসিনির জীবন, শিবাজী ও শিখদের ইতিহাস। তরুণ সমাজের এই হৃৎস্পন্দনকে মর্যাদা দিতে কলকাতা টাউন হলে যথাযথ মর্যাদায় সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। যার মূল তিন উদ্যোক্তা ছিলেন — কেশবচন্দ্র সেন, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ।

তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ভারত সভা গঠন। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই কলকাতার টাউন হলে আয়োজিত সভায় আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতবর্ষের মুক্তি আন্দোলনের এই গুরুত্বপূর্ণ সোপান রচিত হয়। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন আচার্য্য কেশবচন্দ্র সেন। প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিশেষ অতিথি ছিলেন  দ্বারকানাথ মিত্র। সভা থেকে সম্পাদক ও সহসম্পাদক পদে নির্বাচিত হন যথাক্রমে আনন্দমোহন বসু ও অক্ষয়কুমার সরকার।
এই অ্যাসোসিয়েশনের নাম করণের প্রশ্নে ঈশ্বরচন্দ্রের পরামর্শ ছিল ‘বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন’ রাখবার।কিন্তু সুরেন্দ্রনাথ আসমুদ্র হিমাচলকে এক সূত্রে গ্রথিত করতে এই নাম দেন। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে বার্ষিক অধিবেশন শুরু হয় এই সংগঠনের। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেস গঠিত হয়। নানা আলাপ আলোচনার পর ১৮৮৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে জাতীয় আন্দোলনের ধারাকে পুষ্ট করতে সুরেন্দ্রনাথ তাঁর লড়াকু সহযোদ্ধাদের নিয়ে জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন। দুটি সংগঠন একীভূত হয় ।
উনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুতে প্রায় দুই দশক জুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নেতৃত্ব দান করেছেন তিনি। ১৮৯৫ এবং ১৯০৭ এই দুটি সালে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ চক্রান্তের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলনের জটিল আবর্তময় সময়ে যোগ্য নেতৃত্ব দান করেন।

১৯১৮ সালে জাতীয় কংগ্রেস থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নেন। বিপ্লবপন্থী ধারা ও অহিংস ধারার মাঝখানে মধ্যপন্থী হিসেবে ভেসে থেকেছেন কিছুদিন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী হয়েছেন। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত মন্ত্রী হিসেবে দেশ সেবায় যুক্ত থেকেছেন। ভারতীয় বিধান সভার সদস্য হয়েছেন আগেই। যৌবনে কলকাতা কর্পোরেশনের সদস্য থেকেছেন সুদীর্ঘ সময় (১৮৭৬ — ১৮৯৯)।

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু বক্তৃতা দিয়ে জনমত গঠনের স্থায়ী প্রচেষ্টায় সাফল্য আসেনা। চাই প্রিন্ট মিডিয়ার সহযোগিতা। ১৮৭৮ সালে ‘দি বেঙ্গলি’ সম্পাদনা শুরু করেন। এই কাগজে দেশপ্রেমের ফুলকি ছড়াতে গিয়ে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হন সুরেন্দ্রনাথ। কারারুদ্ধ হন।তাঁর মুক্তির দাবিতে বাংলার ছাত্র সমাজ তীব্র আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে। সেই মহামিছিলের এক উজ্জ্বল মুখ ‘বাংলার বাঘ’ আশুতোষ। তাঁর মুক্তির দাবিতে যে হরতাল ডাকা হয় আধুনিক বাংলার ইতিহাসে সেটাই প্রথম স্বত:স্ফুর্ত হরতাল। স্তব্ধ হয়ে যায় কলকাতা। স্তব্ধ হয়ে যায় বাংলার জনজীবন।
এহেন মানুষটিও একবার ভোটে হেরেছেন (১৯২৩)। নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অবিচল নিষ্ঠায় কাটিয়ে দিয়েছেন সারাজীবন। বিধবা বিবাহ প্রচলন, মেয়েদের বাল্য বিবাহ রদ প্রভৃতি মহান কার্যে সদর্থক ভূমিকা ছিল তাঁর। ছেলের অকাল মৃত্যুর দিনটিতেও মৃতদেহ সৎকারের পর পূর্বনির্ধারিত কর্মীসূচিতে যোগ দিয়েছেন সুরেন্দ্রনাথ। স্বাধীনদেশে তাঁর প্রতি যোগ্য মর্যাদা প্রদানের আরব্ধ কাজ কবে সম্পূর্ণ হবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে ।★

- Advertisement -
Latest news
Related news