Saturday, April 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা- ১১৩ , অতুল প্রসাদ সেন।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

সংগীত-সন্ন্যাসী
অতুল প্রসাদ সেন বিনোদ মন্ডল                                                                                        পিসতুতো ভাই ও মামাতো বোনের মধ্যে বিয়ে। বিশ শতকের শুরুতে। সালটা ১৯০০। সমাজ -সংসার আত্মীয় -পরিজন কেউ পাশে ছিলেন না। আইনজ্ঞ কর্মগুরু সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিংহের পরামর্শে উভয়ে চলে যান স্কটল্যান্ডে। ব্রিটিশ বিবাহ আইন কিংবা সেকালের হিন্দু বিবাহ আইন এই জাতীয় বিবাহ অনুমোদন করেনা। তবে স্কটল্যান্ডের আইনে তা বৈধ। গ্রেটনাগ্রীন গ্রামের গির্জায় তাদের বিবাহ হয়েছিল। এই অসাধ্যসাধন কর্মের হোতা ছিলেন অতুল প্রসাদ সেন (২০.১০.১৮৭১ — ২৬.০৮.১৯৭৪)।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

বাংলা সংগীতের সমসাময়িক কিংবদন্তী গীতিকার ও সুরকার তখন রবীন্দ্রনাথ ,দ্বিজেন্দ্রলাল এবং রজনীকান্ত! তিন দশক পরে এসেছেন নজরুল। এঁদের মধ্যে গান রচনার সংখ্যায় তিনি অনেক পিছিয়ে। মাত্র ২০৮ খানি। কিন্তু ধারে – ভারে, অপরূপ সুর বিন্যাসে অতুলন সে গান বাঙালির চিরায়ত সম্পদ হয়ে আছে। হাস্যোচ্ছল মানুষটির জীবন ছিল বিষাদখিন্ন। তাই তাঁর গান গুলিও বেদনামণ্ডিত। প্রেমে -অপ্রেমে, সুখে -দুখে, যন্ত্রণায় হৃদয় মথিত করা সম্ভার।

ব্যক্তি জীবনের বিপর্যয় ছায়া ফেলেছে তাঁর সৃষ্টিতে। কৈশোরে বাবা রামপ্রসাদ সেন প্রয়াত হয়েছেন। বাবা ছিলেন সংগীতজ্ঞ। ৪৩ বছরের বিধবা মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জ্যাঠামশাই দুর্গামোহন দাশকে। মাতামহ কালীমোহন গুপ্ত ছিলেন ভাওয়ালের জমিদার। তিনিই প্রতিপালন করেন অতুলপ্রসাদকে। সংগীত সাধনায় যাবতীয় উৎসাহ ও প্রেরণা দেন। অতুলের জন্মস্থান ঢাকা ছেড়ে প্রথমে ভাওয়াল, পরে কলকাতায় নিয়ে আসেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের পাঠ শেষে মায়ের আকস্মিক সিদ্ধান্তে ব্যথিত অতুলপ্রসাদ ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেতে রওনা দেন। বিপিতা দুর্গামোহন অর্থ সরবরাহ করেন হাসিমুখে ।

প্রবাসে, ভেনিসের গন্ডোলা -চালকের কাছে সেদেশের এক লোকগানের সুরে উদ্বুদ্ধ হয়ে রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত দেশপ্রেমের গান ‘ওঠো গো ভারতলক্ষ্মী’ । বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগের ফসল ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’ গানটি। এছাড়াও তাঁর জনপ্রিয় স্বদেশ রচনা মূলক গান হল -‘হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর’ কিম্বা ‘বলো বলো বলো সবে’ ,গান গুলি। চিরায়ত বিরহবেদনায় মন্দ্রিত ‘একা মোর গানের তরী’ গানটি বাংলা ভাষায় রচিত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সংগীত গুলির একটি।

বিলেতে থাকবার সমসময়ে সেখানে সপরিবারে বাস করতে গেলেন বড়মামা কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্ত। নতুন পরিবেশে কাছে পেলেন সুগায়িকা, অপরূপ সুন্দরী মামাতো বোন হেমকুসুমকে। কাছে এলেন দুজনে। সংসার হলো। কিন্তু বিলেতে আইন পাশ করে প্র্যাকটিস শুরু করে জমাতে পারলেন না। চরম দারিদ্র্য দাম্পত্য জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলল। ফিরে এলেন কলকাতায়। একযোগে রংপুর ও কলকাতায় ওকালতি শুরু করলেন। এখানেও পসার নেই। পয়সা নেই। এক বন্ধুর পরামর্শে চলে যান লক্ষ্ণৌ শহরে। ইতিমধ্যে বিপিতা দুর্গামোহনের মৃত্যু হয়। মা ফিরে এলো অতুলের ঘরে ।

শাশুড়ি – বধূর দ্বৈরথে অতুলপ্রসাদের মতো হাসিখুশি দিলদার সংগীতজ্ঞ মানুষটি আবার মনোবেদনায় ক্ষয়ে যেতে থাকলেন। মায়ের মৃত্যুর পর লক্ষ্ণৌ এর কেশরবাগের বিশাল বাড়িতে শাশুড়ির কোনো ছবি রাখতে দেবেন না হেমকুসুম। জেদ ধরলেন। অতুল ততদিনে লক্ষ্ণৌ এর এক নম্বর ব্যারিস্টার। বিশাল পসার। ব্যাপক রমরমা। তেত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে বানানো বাড়িতে মায়ের ছবি রাখা যাবেনা ,তা কখনো হয় ?অনড় থাকলেন । অগত্যা হেমকুসুম বাড়ি ছেড়ে উঠে গেলেন ভাড়া বাড়িতে, একই শহরে। সেই সব বেদনার পদাবলি তাঁর প্রতিটি গান –চোখের জলে ভেজা ।

সংগীতপাগল অতুলপ্রসাদ সেন সম্পর্কে অমল সোম যে বিশেষণ ব্যবহার করেছেন তা প্রণিধানযোগ্য –‘অক্লান্তকণ্ঠ’।বাস্তবে গানের জন্য অবারিত দ্বার ছিলেন তিনি। কি ভবনে কি মননে।
রামপুর ,গোয়ালিয়র ,ইন্দোর ,মথুরা ,কাশী ,হায়দ্রাবাদ থেকে কলকাতার তাবড় শিল্পীরা এসে উঠতেন সেন বাড়িতে।বেহাগ ,সিন্ধু ,কাফি ,পিলু ,ভৈরবী ,সাহানা ,হাম্বীর ,আশাবরী প্রভৃতি হিন্দুস্থানী রাগের আধারে বুঁদ হয়েছেন, সংগীত সৃষ্টি করেছেন। আবদুল খলিফ খাঁ ,বরকত আলী খাঁ, আবদুল করিম প্রমুখ সুর সাধকের সান্নিধ্য পেয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য অতুলপ্রসাদ ছিলেন তাঁর খামখেয়ালি সভার (প্রতিষ্ঠা ১৮৯৬) সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় , মহারাজা জগদীন্দ্র নারায়ণ রায় , অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে লোকেন পালিত! কে ছিলেন না এই সভার সভ্য?

রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে তাঁর প্রথম গ্রন্থ মুদ্রিত হয় — ‘কয়েকটি গান’ শিরোনামে (১৯২৫)। এছাড়াও তাঁর দুটি গীতিসংগ্রহ গ্রন্থ হল গীতিগুঞ্জ (১৯৩১) ও স্বরলিপি সহ প্রকাশিত গ্রন্থ ‘কাকলী’। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পরিশোধ গ্রন্থখানি অতুলপ্রসাদকে উৎসর্গ করেছেন।

লক্ষ্ণৌতে রবীন্দ্রনাথকে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন অতুলপ্রসাদ। কবিগুরুর নোবেল প্রাপ্তির পর গুরুবন্দনা করে লিখেছিলেন অসাধারণ পংক্তিমালা -‘বাজিয়ে রবি তোমার বীণে/আনল মালা জগৎ জিনে’। বহু সুখস্মৃতি রয়েছে উভয়ের। কুমায়ুনের রামগড়ে হিমালয়কে সামনে রেখে কবি প্রথম উচ্চারণ করেন ‘এই লভিনু সঙ্গ তব’ সংগীতের বাণীগুলি। পাশে ছিলেন অতুলপ্রসাদ। রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানাতে দু ‘খানি গান সৃষ্টি করেছেন অতুলপ্রসাদ -১। প্রভাতে যারে নন্দে পাখি এবং ২। জয়তু জয়তু কবি ।

প্রকাশ্য রাজনীতিতে কখনো অংশ নেননি। তবে ছাত্রাবস্থা থেকেই রাজনীতির মানুষজনের উষ্ণতা পেয়েছেন। বিলেতে পড়তে গিয়ে সঙ্গ পেয়েছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, অরবিন্দ ঘোষ, সরোজিনী নাইডুর। দ্বিজেন্দ্রলালকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন ,অপেরায় ,গানের মজলিসে। বিশ্বসাহিত্য মন্থন করেছেন। ছিলেন কংগ্রেসের দরদি সমর্থক। লোকমান্য তিলক কারারুদ্ধ হলে আলোড়িত হয়েছেন। লক্ষ্ণৌতে তখন কংগ্রেসের কর্মসূচিতে এসে তাঁরই বাড়িতে উঠেছিলেন বিপিনচন্দ্র পাল ও শিবনাথ শাস্ত্রী । তাঁদের আতিথ্যে রচনা করেন -‘কঠিন শাসনে করো মা শাসিত’ সংগীত।

ব্রাহ্ম ধর্মের উপাসক ছিলেন তিনি। তবে ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামি মুক্ত ছিলেন। নানা সামাজিক কাজে অগ্রগণ্য হয়ে ওঠেন লক্ষ্ণৌতে। জনপ্রিয়তা এমন ছিল তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর বাড়ির পাশের রাস্তা উৎসর্গিত হয় তাঁকেই। কখনো হরিজন উন্নয়নে, কখনো কাশীতে বিধবা আশ্রম নির্মাণে, কখনো গোমতীর বন্যায় বিদ্ধস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। গান গেয়ে দল বেঁধে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। নিজে দান করেছেন। এমনকি নিজের বাড়ি ও গ্রন্থস্বত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দান করে গেছেন অতুলপ্রসাদ সেন।

হৃদয়বান এই মানুষটি সবসময় হাসিতে মেতে থাকতেন। ঢেকে রাখতেন বুকের তীব্র প্রদাহজ্বালা। প্রিয় বন্ধুকে বলেছিলেন – ‘আমি কি প্রার্থনা করি ভগবানের কাছে জান ? শ্মশানে যেদিন আমাকে নিয়ে যাবে সেদিন চিতায় শুয়ে হঠাত্‍ যেন সকলের দিকে চেয়ে একবার হেসে তবে চোখ মুদি। ‘এমনই প্রাণবন্ত মানুষটি তাঁর প্রিয় শহর লক্ষ্ণৌতে প্রয়াত হন। শ্রাদ্ধবাসরে উপস্থিত ছিলেন আচার্য্য ক্ষিতিমোহন সেন ।রবীন্দ্রদূত হয়ে। শোকসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বলেছিলেন – ‘তিনি এক সুরলোক থেকে অন্য সুরলোকে গমন করেছেন ‘। অতুলপ্রসাদ আজও তাঁর গানের তরী নিয়ে আমাদের সেই সুরলোকে নিয়ে যান এবং গানে গানে বলে যান অহরহ — “সবারে বাস রে ভালো, নইলে মনের কালো ঘুচবে না রে ”।★

- Advertisement -
Latest news
Related news