Wednesday, May 22, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৬৪।। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

বহুমাত্রিক শিল্পী
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরবিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

কোলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবার উনিশ শতক ও বিশ শতকের প্রথমার্ধ জুড়ে বঙ্গ সংস্কৃতির অঙ্গনে সার্বভৌম ভূমিকা পালন করেছে। মধ্যমণি রবীন্দ্রনাথের সর্বব্যাপ্ত অবদান। তিনি ছাড়াও বেশ কয়েকজন নানাভাবে নবজাগরণের পথে স্বীয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। যাঁদের অন্যতম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (০৭-০৮- ১৮৭১ — ০৫-১২ -১৯৫১)।
গুণেন্দ্রনাথ এবং সৌদামিনী দেবীর সন্তান অবনীন্দ্রনাথ সংস্কৃত কলেজের ছাত্র ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির ছকে বাঁধা পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। মাতৃভাষা বাংলার পাশাপাশি তখনকার রাজভাষা ইংরেজি ছাড়াও ফারসী এবং সংস্কৃতে অনায়াস দখল ছিল তাঁর। তবে সহজাত প্রতিভা খেলা করেছে রং ও রেখা নিয়ে সবচেয়ে বেশি। বাল্য ও কৈশোরে দামালপনার জন্য বাড়ির বড়রা আদর করে ‘বোম্বেটে’ নামে ডাকতেন। পরে তিনি অবন নামেই অভিহিত হতেন। ১৮৮৯ সালে সাহানা দেবীর সংগে তাঁর বিবাহ হয়।

নব্যবঙ্গীয় চিত্রকলার জনক ছিলেন তিনি। আর্ট স্কুলের ইতালীয় শিক্ষক গিলবার্ট এর প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ ছিলেন অবন। তিনিই তাঁর প্রথম শিক্ষাগুরু — চিত্রশিল্পের। জল রং ও প্যাস্টেল ড্রইং এর প্রশিক্ষণ পেয়েছেন তাঁর কাছে। পরে ইংরেজ শিল্পী ও শিক্ষক পার্সারের কাছে (মতান্তরে পামার) তৈলচিত্র ও লাইফ স্টাডির প্রশিক্ষণ নেন। জাপ চিত্র শিল্পী তাই কান সে সময়ে বিশ্ববন্দিত ছিলেন। তাঁর কাছে জাপানী শিল্পরীতির অনন্য ঘরানা রপ্ত করেন। চিত্রশিল্পে অসাধারণ অবদানের জন্য ইংরেজ সরকার তাঁকে CIE উপাধি দেয়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদান করে ডি. লিট. সম্মান।

আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ হ্যাভেলের আশীর্বাদ ও সহায়তায় তাঁর শিল্পী সত্তা পূর্ণ বিকশিত হয়েছে। তাঁর ইচ্ছেতেই ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে আর্ট স্কুলের প্রথম ভারতীয় সহকারী অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন অবনীন্দ্রনাথ। ভারতীয় চিত্রকলার স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে শিল্প চর্চায় তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেন হ্যাভেল সাহেব। তাঁর অনুপ্রেরণায় আঁকা ঋতুসংহার (১৯০১), বুদ্ধ ও সুজাতা (১৯০১) এবং বজ্রমুকুট চিত্রসমূহ তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে উন্নীত করে। হ্যাভেলের উদ্যোগেই লর্ড কার্জনের দিল্লী দরবারে দুটি একক প্রদর্শনীতে অংশ নেন অবনীন্দ্রনাথ।
যদিও ভারতীয় রীতিতে আঁকা কৃষ্ণলীলা সংক্রান্ত চিত্রটিতেই নতুন ধারার পূর্বাভাস পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীকালে চতুর্ভুজা ভারতমাতা (১৯০৫), কচ দেবযানী (১৯০৬), শেষযাত্রা (১৯১৪), ওমর খৈয়াম চিত্রাবলী (১৯৩০) প্রভৃতি চিত্র তাঁকে প্রসিদ্ধি দিয়েছে। তাঁর “কুটুম কাটাম” আকারনিষ্ঠ বিমূর্ত রূপসৃষ্টির জন্য যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আবার প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভাবধারার মিশ্রণে অঙ্কিত শুক্লাভিসার (১৮৯৭) চিত্রটিও তথ্যভিজ্ঞ মহলের কাছে বিশেষ আদরের ।

ভারতবর্ষের সমস্ত বড় বড় শহর ছাড়াও লন্ডন ও প্যারিস শহরে ১৯১৩ সাল থেকে শুরু করে একাধিকবার চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে অবন ঠাকুরের। ১৯১৯ সালে টোকিও শহরে একক প্রদশর্নীতে তাঁর শিল্পকীর্তি চিত্ররসিকদের কাছে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছে। নতুন প্রতিভা লালনে তাঁর উৎসাহের অন্ত ছিলনা । ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ এবং রানি মেরী ভারত ভ্রমণে আসেন। তখন আর্ট গ্যালারিতে তাঁদের গাইডের ভূমিকা পালন করেন অবনীন্দ্রনাথ। চিত্রশিল্প চর্চা সাধারণতঃ নিভৃতে একক সাধনার দাবি করে। তিনি বিদেশের অনুসরণে সব শিল্পীকে ঐক্যবদ্ধ করতে প্রয়াসী হন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন অধ্যক্ষ হ্যাভেল ও শ্বেতাঙ্গিনী নিবেদিতা। স্থাপন করেন জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি — ওরিয়েন্টাল আর্ট সোসাইটি ।

যে কোনো ছবির ব্যাপারে অসম্ভব খুঁতখুঁতে এবং স্পর্শকাতর ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। তাঁর প্রিয় ছাত্র নন্দলাল বসু শান্তিনিকেতনে ‘উমার তপস্যা’ চিত্রটি সম্পূর্ণ করবার পর তাঁকে দেখাতে যান। প্রথমে পছন্দ হয়নি তাঁর। প্রশ্ন করেন – ‘এত রং কম কেন?’ নন্দলাল সায় দেন গুরুবাক্যে। এদিকে সারারাত ঘুমোতে পারেন না অবনীন্দ্রনাথ। ভেবে দেখেন, তাপসী উমার অবস্থাকে বাঙ্ময় করতে কম রংই অনেক বেশি ব্যঞ্জনাময় হতে পারে। ভোরে ছুটে যান নন্দলালের কাছে। তিনি তখন ছবির সামনে তুলি নিয়ে সবে বসেছেন। অকপটে ভুল স্বীকার করেন গুরু। শোনা যায় সমকালীন আর এক বিস্ময় প্রতিভা রবি বর্মাও তাঁর প্রতিভার প্রশংসা করতেন। লর্ড কার্জন তো তাঁর ছবি ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখার জন্য কিনতে চেয়েছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে রানি বাগেশ্বরী অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত করেন।

এখানেই অবনীন্দ্রনাথের অন্য একটি গুণ প্রতিভাত হয়। অধ্যাপনা করার সময় (১৯২১ — ১৯২৯) তিনি যে ২৯টি বক্তৃতা দেন, সবগুলো একই মলাটের মধ্যে সংকলিত করা হয়। বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী নামে (১৯৪১) তা প্রকাশিত হয়। ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের বাংলা আকর গ্রন্থ রূপে যা অভিহিত হয়। সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর খ্যাতিও ছিল ঈর্ষণীয়। নানা যাত্রাপালা ও পুথি রচয়িতা ছিলেন তিনি। অরণ্যকাণ্ড পালা, কঞ্জুশের পালা, কাক ও পানির পালা, ঋষিযাত্রা, মারুতির পুথি, চাই বুড়োর পুথি, তাঁর অনন্য সৃষ্টি। এছাড়াও শকুন্তলা (১৮৯৫), ক্ষীরের পুতুল ( ১৮৯৬), রাজকাহিনী (১৯০৯), বুড়ো অাংলা( ১৯৪১) প্রভৃতি গ্রন্থ সমান জনপ্রিয়।
লেখক হিসেবে ছাব্বিশখানি গ্রন্থ রয়েছে অবনীন্দ্রনাথের। পাশাপাশি তিনি ছিলেন সমকালীন কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এসরাজ বাদক। ঠাকুরবাড়ির মঞ্চাভিনয়ে সংগতের পাশাপাশি অভিনয়ে অংশ নিয়েছেন, দর্শকদের সপ্রশংস করতালিতে অভিনন্দিত হয়েছেন। রবীন্দ্রসান্নিধ্যে কাটিয়েছেন জীবনের অনেকটা সময় ।

পারিবারিক নানা শরিকি জটিলতায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অভ্যন্তরে সম্পর্কের বহু পটপরিবর্তন হয়েছে। তবে অবনীন্দ্রনাথের সাথে যোগাযোগ অটুট ছিল রবীন্দ্রনাথের। যৌবনে যখন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশ উত্তাল তখন রবিকার সাথে রাখিবন্ধন সহ স্বদেশী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। ১৯৪১ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত কঠিন সময়ে শান্তিনিকেতনে আচার্য্য এর পদে আসীন থেকেছেন ।

কলকাতায় প্লেগ মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাঁর।রবিকাকা ও ভগিনী নিবেদিতার সাথে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাঁদা তুলে হাসপাতাল খুলেছেন। এই প্লেগ কেড়ে নিয়েছে তাঁর ছোট মেয়ের প্রাণ। চৌরঙ্গীর বাড়িতে বসে শোকস্তব্ধ বাবা এঁকেছেন ‘শাজাহানের মৃত্যু’ নামাঙ্কিত বিখ্যাত ছবিটি। বলেছেন ‘মেয়ের মৃত্যুর যত বেদনা বুকে ছিল, সব ঢেলে দিয়ে সেই ছবি আঁকলুম ।’

নিজের ৭০ তম জন্মদিনে রবিকাকা প্রয়াত হলেন। ৫ নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় সেই অন্তিম যাত্রার ছবি আঁকলেন শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ। অসংখ্য ঊর্ধ্ব হাতের সারি । শোকবিহ্বল সেই ছবি প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকায়। তারপর থেকে ২২ শ্রাবণ আপামর বাঙালী ‘যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ণ এই বাটে’ নিয়েই মুহ্যমান থাকি । অবন ঠাকুরের জন্মদিন উদযাপন করবার মন ও মেজাজ, রুচি ও অভিরুচি থাকেনা সেভাবে।

- Advertisement -
Latest news
Related news